সূরা আল-কাসাস; আয়াত ২৬-২৮ (পর্ব-৭)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা কাসাসের ২৬ থেকে ২৮ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ২৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
قَالَتْ إِحْدَاهُمَا يَا أَبَتِ اسْتَأْجِرْهُ إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ (26)
“ওদের একজন (তাদের পিতা শোয়াইবকে) বলল- হে পিতা! তুমি ওকে মজুর নিযুক্ত করো, কারণ, তোমার মজুর হিসেবে সে-ই- হবে উত্তম যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত।” (২৮:২৬)
আগের আসরে বলা হয়েছে, হযরত মূসা (আ.) আল্লাহর আরেক নবী হযরত শোয়াইব (আ.)-এর দুই কন্যাকে তাদের মেষগুলোকে পানি খাওয়াতে সাহায্য করেন। এ খবর শুনে হযরত শোয়াইব পুরস্কার দেয়ার জন্য তাকে নিজের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানান। এরপর আজকের এ আয়াতে বলা হচ্ছে: হযরত শোয়াইবের যে মেয়ে হযরত মূসাকে কূপের পাশ থেকে ডেকে আনতে গিয়েছিল সে তার বাবাকে বলল: আপনি এই যুবককে রাখাল হিসেবে নিয়োগ দিন যাতে আমাদের দুই বোনকে আর মেষ চড়ানোর জন্য মাঠে যেতে না হয়।
হযরত শোয়াইবের মেয়ে হযরত মূসাকে রাখাল হিসেবে নিয়োগ দেয়ার যোগ্যতা হিসেবে তার দু’টি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেন। এর একটি হচ্ছে শারীরিক শক্তি এবং দ্বিতীয়টি আমানতদারি বা বিশ্বস্ততা। হযরত মূসার শারীরিক শক্তির প্রমাণ তখনই পাওয়া গিয়েছিল যখন তিনি একাই কূপ থেকে পানি ভর্তি বালতিগুলো তুলে এনে হযরত শোয়াইবের মেয়েদের সব মেষকে পানি খাইয়েছিলেন। এ ছাড়া, তাঁর আমানতদারি বা বিশ্বস্ততার বিষয়টি প্রমাণিত হয় মাঠ থেকে তাঁর বাড়িতে যাওয়ার পথে। তিনি হযরত শোয়াইবের মেয়ের পেছন পেছন না হেঁটে নিজে সামনে হাঁটেন এবং ওই মেয়েকে বলেন পেছন থেকে তাঁকে বাড়ি যাওয়ার পথ বলে দিতে। হযরত মূসা এ কাজ করেছিলেন এজন্য যে, যাতে তার চোখ হযরত শোয়াইবের মেয়ের শরীরের দিকে না পড়ে।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে:
১. পরিবারের সন্তানদের দৃষ্টিতে যেকোনো ভালো পরামর্শ তাদের বাবা-মার সামনে তুলে ধরার অধিকার আছে। এক্ষেত্রে সন্তান ছেলে নাকি মেয়ে সেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।
২. যেকোনো কাজে কর্মী নিয়োগ করার ক্ষেত্রে ওই কাজের উপযোগী সর্বোত্তম লোকদের নিয়োগ দিতে হবে।
৩. কারো হাতে কোনো দায়িত্ব অর্পণের ক্ষেত্রে যে দু’টি বৈশিষ্ট্যের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে তা হচ্ছে তার সামর্থ্য ও বিশ্বস্ততা।
সূরা কাসাসের ২৭ ও ২৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
قَالَ إِنِّي أُرِيدُ أَنْ أُنْكِحَكَ إِحْدَى ابْنَتَيَّ هَاتَيْنِ عَلَى أَنْ تَأْجُرَنِي ثَمَانِيَ حِجَجٍ فَإِنْ أَتْمَمْتَ عَشْرًا فَمِنْ عِنْدِكَ وَمَا أُرِيدُ أَنْ أَشُقَّ عَلَيْكَ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّالِحِينَ (27) قَالَ ذَلِكَ بَيْنِي وَبَيْنَكَ أَيَّمَا الْأَجَلَيْنِ قَضَيْتُ فَلَا عُدْوَانَ عَلَيَّ وَاللَّهُ عَلَى مَا نَقُولُ وَكِيلٌ (28)
“পিতা (হযরত শোয়াইব) মূসাকে বলল- আমি আমার কন্যাদ্বয়ের একজনকে তোমার সাথে বিয়ে দিতে চাই এই শর্তে যে, তুমি আট বছর আমার কাজ করবে, যদি তুমি ১০ বছর পূর্ণ করো সে তোমার ইচ্ছা। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তুমি আমাকে সৎকর্মশীলদের মধ্যে পাবে।” (২৮:২৭)
“মূসা বলল- আপনার ও আমার মধ্যে এই চুক্তিই থাকল, দু’টি মেয়াদের কোনো একটি পূর্ণ করলে আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকবে না, আমরা যে বিষয়ে কথা বলছি, আল্লাহ তার সাক্ষী।” (২৮:২৮)
হযরত শোয়াইব (আ.) হযরত মূসাকে রাখাল হিসেবে নিয়োগ দেয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করেন। কিন্তু তাঁর নিজের কোনো ছেলে ছিল না এবং ঘরে যুব বয়সি দুই মেয়ে থাকায় তিনি হযরত মূসার মতো একজন যুবককে শুধুমাত্র রাখাল হিসেবে নিয়োগ দিতে পারছিলেন না। এ কারণে তিনি হযরত মূসাকে দুই মেয়ের যেকোনো একজনকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন। সেইসঙ্গে তাকে এ শর্ত বেধে দেন যে, বিয়ের পর অন্তত আট বছর তাঁর ঘরে বসবাস করতে এবং মেষ পালনের দায়িত্ব পালন করতে হবে। হযরত শোয়াইব চাননি বিয়ের পর তার মেয়েকে নিয়ে মূসা নিজের বাড়ি চলে যাক। কারণ, তাতে তার মেষ পালনের কাজে সাহায্য তো হবেই না বরং উল্টো যে দুই মেয়ে এতদিন মেষ পালনের কাজ করছিল তাদের একজনকেও হারাতে হবে।
কাজেই, দু’পক্ষের স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে তিনি হযরত মূসাকে আট বছর তার রাখালের কাজ করার শর্ত দেন। এই শর্ত পূরণ হলে একদিকে হযরত মূসা থাকা-খাওয়া ও সংসারধর্ম পালনের সুযোগ পাবেন; অন্যদিকে হযরত শোয়াইবের মেয়েরা মাঠে মেষ চড়ানোর মতো কষ্টসাধ্য কাজ থেকে রক্ষা পাবে। তবে এখানে মনে রাখতে হবে, বিয়ের মোহরানা হিসেবে হোক কিংবা কাবিনের শর্ত রক্ষা হিসেবে হোক, আট বছরের রাখালের দায়িত্ব পালনের শর্ত দেয়া হয়েছিল হযরত শোয়াইবের মেয়ের পক্ষ থেকে। কারণ, এতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছিল সে, তার বাবা নয়। যে তরুণী মেয়েকে তার বৃদ্ধ বাবার কারণে প্রতিদিন মেষের পালকে মাঠে ঘাস খাওয়াতে নিয়ে যেতে হয় সে স্বাভাবিকভাবেই মনের কল্পনায় এমন একজন সামর্থ্যবান ও সচ্চরিত্র যুবকের আশা করবে যে তাকে বিয়ে করার পাশাপাশি তার কষ্টসাধ্য কাজগুলোর দায়িত্ব গ্রহণ করবে।
এদিকে হযরত শোয়াইব (আ.) মূসাকে এই প্রস্তাব দেয়ার সময় এ বিষয়টির প্রতি জোর দেন যে, আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। তোমার পক্ষ থেকেও যদি কোনো প্রস্তাব থাকে তাহলে সেটাও আমাকে জানাতে পারো। হযরত মূসা এই পরিবারের রাখালের দায়িত্ব পালনের শর্তে হযরত শোয়াইবের মেয়েকে বিয়ে করতে রাজি হন এবং বলেন, শর্ত পালনের জন্য আমি আট বছর এখানে অবস্থান করব। আট বছর পর যদি আমার ইচ্ছা হয় তাহলে আরো দুই বছর থাকব। এই দীর্ঘ সময়ে আমার প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি আপনাদের সংসারেরও চাকা সচল থাকবে।
এই দুই আয়াতের শিক্ষাণীয় দিকগুলো হলো:
১. চরিত্রবান ও বিশ্বস্ত যুবক পাওয়া গেলে কন্যার পিতার পক্ষ থেকে বিবাহের প্রস্তাব দিতে ইসলাম নিষেধ করেনি।
২. কর্মক্ষেত্রে অবিবাহিত নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার সুযোগ সৃষ্টি হলে কাজে নিয়োগ দেয়ার আগে তাদেরকে বিয়ে দিয়ে নিতে হবে।
৩. বিয়ের মোহরানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে পাত্রপক্ষের অর্থনৈতিক সক্ষমতার কথা বিবেচনা করতে হবে। অনর্থক বড় রকমের বোঝা চাপিয়ে দেয়া যাবে না।#