আদর্শ জীবনযাপন: মিউজিকের ইতিবাচক প্রভাব পড়ে মনের ওপর
বর্তমান বিশ্বের বেশিরভাগ মনোবিজ্ঞানীই বিশ্বাস করেন যে একটা বিশেষ পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টি করার মাধ্যমে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ মানসিক চাপ ও অস্থিরতা কমিয়ে আনা সম্ভব। তাঁরা এক ধরনের মিউজিকের মাধ্যমে মানিসক অস্থিরতা কমিয়ে আনার বিষয়টি পরীক্ষা করে ইতিবাচক ফল পেয়েছেন।
ওই মিউজিক শোনানোর জন্য মনের ভেতরে একটা কম আলোময় কক্ষ বেছে নেয়ার কথা বলা হয়েছে। সেই কক্ষে আরাম করে বসার মতো একটা চেয়ার রাখতে হবে। কক্ষের ভেতর ওই চেয়ারের সামনে ছোট্ট অথচ চমৎকার একটা ফোয়ারা রয়েছে। সেই ফোয়ারার জলপতনের শব্দের সঙ্গে রিলাক্স করার জন্য ব্যবহৃত মোলায়েম মিউজিক ভেসে আসছে। এই মিউজিককে আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানে নিরাময় মিউজিক বলে অভিহিত করা হয়েছে।
মানসিক অস্থিরতায় যারা ভোগেন যারা অবসাদ ও বিষন্নতায় আক্রান্ত থাকেন সবসময়, মিউজিক তাদেরকে সকল প্রকার মানসিক চাপ ও বিষাদগ্রস্ততা থেকে মুক্তি দিতে পারে। মিউজিকের একটা নেপথ্য ইতিবাচক প্রভাব পড়ে মনের ওপর। যার ফলে মানসিক সকল উত্তেজনা ও অস্থিরতা হ্রাস পায় এবং প্রশান্তিতে ভরে ওঠে মনের অলিগলি। একেক রকমের মিউজিক আমাদের মনের ভেতর একেক ধরনের অনুভূতির জন্ম দেয়। এই অনুভূতি খুবই শক্তিশালী। এগুলো মনোদৈহিক সুস্থতার জন্য খুবই কার্যকরী আবার কোনো কোনোটি মানসিক অস্থিরতার লেলিহান শিখাকে নিভিয়ে দিতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে মানসিক চাপ, অস্থিরতা কিংবা উত্তেজনা কমানোর জন্য তিন চতুর্থাংশ মানুষই মিউজিক শোনে। তাদের শতকরা আশি ভাগই মনে করে মিউজিকের অ্যাকশন খুবই কার্যকর। হার্টবিটের ওপর মিউজিকের শব্দের একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। কেননা হার্ট বা হৃদয় মিউজিকের শব্দের তালের সাথে মেলানোর জন্য দ্রুত অথবা ধীরে কাজ করে।
নিরাময় মিউজিক নিয়ে কথা বলছিলাম। যেহেতু মিউজিক মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে সেজন্য উত্তম মিউজিক নির্বাচন করা উচিত। শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য এগুলো শেখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের উত্তম মিউজিকের সঙ্গে পরিচিত হওয়া খুবই জরুরি। মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়টি সরাসরি পবিত্র কুরআনেরও উপজীব্য। কুরআন নিরাপত্তা ও প্রশান্তিকে মানসিক সুস্থতার উপায় বলে মনে করে। এ ব্যাপারে মানে অস্থিরতাপূর্ণ মানসিকতার রোগীরা কিংবা যাদের দেহে অপারেশান করা হয়েছে সেরকম রোগীদের ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে মনোদৈহিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতার ওপর পবিত্র কুরআনের ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে।
কুরআনের শব্দমালার যে সাঙ্গীতিক সৌন্দর্য , তার যে ছন্দময়তা, চিত্তাকর্ষক ঐশ্বর্য আর সুরময়তা তা মানুষের অর্থাৎ শ্রোতা রোগীর অন্তরে যে অনুভূতি জাগিয়ে দেয় সেই অনুভূতি সহজেই আকৃষ্ট করে।পবিত্র কুরআনের এই প্রতীয়মান সৌন্দর্যের দিকটি বিশ্লেষণ করে ড: আহমাদ কাজি মানসিক রোগীদের ওপর কুরআন ও তিলাওয়াতের প্রভাব সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করেছেন। তিনি কুরআনের সূরা এসরা’র বিরাশি নম্বর আয়াতের উল্লেখ করে ওই আয়াত থেকেই তিনি তাঁর গবেষণার সারবস্তু লাভ করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। ওই আয়াতের অর্থ হলো: “আমি এ কুরআনের অবতরণ প্রক্রিয়ায় এমন সব বিষয় অবতীর্ণ করেছি যা মুমিনদের জন্য নিরাময় ও রহমত এবং জালেমদের জন্য ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করে না”।
ড: আহমাদ কাজি আরও বলেছেন, মুসলমান এবং অমুসলমানদের একটি দল নির্বাচন করেছিলাম যাদের মানসিক অস্থিরতা ছিল। প্রথমে মুসলমান রোগীদের মানসিক ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে গবেষণা করে দেখলাম। তারপর তাদেরকে একটি কক্ষে পাঠিয়ে দিলাম যেখানে সুনসান নীরবতা বিরাজ করছিল। সেখানে তাদের আত্মিক প্রশান্তির জন্য সব ধরনের পরীক্ষামূলক আয়োজন ছিল। এখানে কিছুক্ষণ রাখার পর তাদের মানসিক পরিস্থিতি আরেকবার পরীক্ষা করে দেখা গেল এই দলের মানসিক রোগীদের আত্মিক কিংবা শারীরিক কোনো পরিবর্তনই হয় নি। এরপর তাদেরকে এমন একটি রুমে পাঠালাম যে রুমে কুরআন তিলাওয়াত হচ্ছিল এবং তা নিয়ে কথা হচ্ছিল। সে সময় অস্থিরতা পরিমাপক যন্ত্রে দেখা গেল রোগীদের মানসিক চাপ অনেক নীচে নেমে গেছে।
ডা: আহমাদ কাজি আরও বলেছেন আমার সহকর্মীদের অনেকেই এর কারণ হিসেবে আরবি ভাষার প্রভাব বলে মত দিয়েছিলেন। বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখার জন্য তাদেরকে এমন একটা কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো যেখানে আরবি ভাষায় কবিতা ও গদ্য আবৃত্তি করা হচ্ছিল। কিন্তু মানসিক চাপ পরিমাপক যন্ত্রে কোনো পরিবর্তনই দেখা গেল না। এ থেকে সবাই মোটামুটি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে যেহেতু যাদের নিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে তাদের সবাই মুসলমান সেহেতু কুরআন তিলাওয়াত তাদের মনের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সেজন্যই তাদের মানসিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটেছে।
ডা: কাজি আরও বলেছেন লক্ষ্য করলাম যে সুর করে কুরআন তিলাওয়াত করা হলে যারা সেই তিলাওয়াত শোনেন অথচ আরবি ভাষা কিংবা কুরআন সম্পর্কে যাদের কোনো ধারণাই নেই,তাদের ওপরও সমানভাবে প্রভাব পড়ে। এ বিষয়টি আরেকটু স্পষ্ট করার জন্য আমরা আরেকটা পরীক্ষা চালালাম। বেশ কিছু মানসিক রোগী বেছে নিলাম যারা মুসলমান নয়। তাদের শারীরিক পরিস্থিতি পরীক্ষা করে দেখার পর একটা নীরব শান্ত কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। তাদের প্রশান্তির জন্য যাকিছু প্রয়োজন সবকিছুরই ব্যবস্থা করা হলো ওই রুমে। কিন্তু তেমন কোনো ফলই এলো না। এরপর তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হলো এমন একটি রুমে যেখানে সুন্দর লাহন বা সুরে কুরআন তিলাওয়াত করা হচ্ছিল। আশ্চর্যরকমভাবে আমরা একটু পরেই দেখলাম মানসিক চাপ পরিমাপক যন্ত্র আমাদের দেখালো ওই রোগীদের মানসিক অস্থিরতা অর্ধেকের মতো নীচে নেমে এলো মানে কমে গেল। এই হার খুবই সন্তোষজনক। মুসলমান রোগীদের ক্ষেত্রে মানসিক এই অস্থিরতা কমে যাওয়ার হার ছিল শতকরা সাতানব্বুই ভাগ।
প্রকৃতপক্ষে ঐশীগ্রন্থ আলকুরআনের তিলাওয়াত বা সুরেলা আবৃত্তি একটি হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া চিত্তাকর্ষক শিল্প বৈ কি। আল্লাহর বাণীর হৃদয়গ্রাহী শক্তি অপরিসীম। সেজন্য তিলাওয়াত মানুষের অন্তরাত্মার ওপর এমনভাবে গেঁথে যায়, এতো বেশি প্রভাব বিস্তার করে যে শোনা মাত্র একজন মানুষ কীভাবে যেন মুহূর্তের মধ্যেই পার্থিব জগতের বিচিত্র জটিল বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যায় এবং মানসিকভাবে খুব হালকা অনুভব করে। যত রকমের শঙ্কা, ভয়ভীতি কিংব উদ্বেগ উৎকণ্ঠা আছে সেসব যেন অন্তর থেকে বিতাড়িত হয়ে যায় এবং তিলাওয়াত শ্রবণকারীর ভেতরে এক ধরনের প্রশান্তি এসে যায়।
আসলে পবিত্র কুরআনের সূরা,আয়াত,বাক্য ইত্যাদি এমন সুন্দরভাবে সাজানো গোছানো যে একটা প্রবহমানতা যেমন তাতে রয়েছে তেমনি রয়েছে ছন্দময়তা ও তালের চমৎকার গাঁথুনি। একটা শব্দের সাথে আরেকটা শব্দেরও রয়েছে সুন্দর সাযুজ্য। আরবি ভাষা তো আগে থেকেই প্রচলিত ছিল কিন্তু কুরআনের আয়াত সেই আরবি ভাষার মাঝেও একটা নতুন ঢং নতুন মাত্রা নিয়ে এসেছে। শুধু তাই নয় লেখালেখি আর ছন্দের ভুবনে সম্পূর্ন নতুন একটা স্টাইল চলে এসেছে কুরআনের মাধ্যমে যার ফলে সমকালীন কবি সাহিত্যিকরা, বক্তারা বিশ্বাস করতেন: কুরআন কবিতার চেয়ে উন্নত এবং প্রতিটি শব্দই এতো বেশি প্রাঞ্জল সাবলীল ও অর্থবহ যে একেবারেই নজিরবিহীন,সুতরাং এটা খোদারই কালাম। কুরআনের অলৌকিকতার মতোই কুরআনের প্রতিটি শব্দও মুজেযা। শব্দের গাঁথুনি, বর্ণনার সাবলীলতা, অর্থঘন সংক্ষিপ্তি, একটি শব্দের সাথে আরেকটি শব্দের মেলবন্ধন সবমিলিয়ে এতো চমৎকারভাবে বাক্য তৈরি হয়েছে যে মানুষের পক্ষে সেই গাঁথুনি কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
কুরআনের একজন কারী মানে পাঠক যখন তিলাওয়াত করতে শুরু করেন, তখন লক্ষ্য করে দেখবেন যদিও কুরআন কোনো কবিতাগ্রন্থ নয় তবে তিলাওয়াতের মধ্যে কবিতার সকল অলংকার বরং তারচেয়েও বেশি আকর্ষণ রয়েছে। রয়েছে সুর রয়েছে ছন্দ তাল মাত্রা সবকিছুই। কুরআনের ছন্দ সুর অন্য কোনো কবিতার মাঝে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কবিতা তো বেশিরভাগই কল্পনা কিংবা ভাবরাজ্য থেকে উঠে আসা পংক্তিমালার সংকলন। সেখানে আবেগ থাকে, দু:ক বেদনা সংশয় ক্ষোভ দ্রোহ ইত্যাদির প্রকাশ থাকে।সে কারণে অনেক উত্থান পতন থাকে। কিন্তু কুরেআন যুক্তি প্রমাণ সাপেক্ষ পরিপূর্ণ সত্য ও বাস্তবের চমৎকার পরিস্ফুটন ঘটেছে। জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিক নির্দেশনা ও নীতিমালাগুলো বৈজ্ঞানিক চেতনায় তুলে ধরা হয়েছে। এখানে আবেগের কোনো কথা নেই, নেই কোনো অবাস্তব কল্পনার বিন্দুমাত্র ছোঁয়া।
বলাবাহুল্য মক্কার মুশরিকরা পবিত্র কুরআনের বিস্ময়কর সুন্দর মধ্যময় সাঙ্গীতিক সুরের তিলাওয়াতে এত বেশি আকৃষ্ট হয়েছিল যে তাদের অনেকেই চুপে চুপে নবীজীর ঘরের পাশে গিয়ে কান পেতে তিলাওয়াত শুনতো। বিখ্যাত আরব কবি অলিদ বিন মুগিরা বলেন, মুহাম্মাদের কাছ থেকে এমন এক বক্তব্য শুনেছি যে যেগুলো না কোনো মানুষের বক্তব্য আর না কোনো জিনের বক্তব্য। সেজন্যই কুরআনের ওই বক্তব্য এতো সতেজ এতো সাবলীল আর মাধুর্যঘেরা অনিন্দ্যসুন্দর। তিলাওয়াতের উত্থানে যেন মেওয়া ফলে আর যখন নীচে নেমে আসে তখন মনে হয় বৃষ্টি ঝরছে। সবকিছুরই উর্ধ্বে অন্য কিছু রয়েছে কিন্তু কুরআন তিলাওয়াতের উপরে অন্য কিছুই নেই। কুরআন তিলাওয়াতই তাই শ্রেষ্ঠ।
সুতরাং এই মুহূর্ত থেকেই প্রশান্তির উৎস এবং মনোজগতে পরিবর্তনের ঝড় বয়ে দেওয়া এই কুরআন শেখার ক্ষেত্রে সচেষ্ট হয়ে উঠুন। কেননা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন: “হে লোকেরা! তোমাদের কাছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে নসীহত এসে গেছে। এটি এমন জিনিস যা অন্তরের রোগের নিরাময় এবং যারা ইমান এনেছে তাদের জন্য পথনির্দেশনা ও রহমত”#
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/৮/৭