খোদাপ্রেমের অনন্য মাস রমজান (পর্ব-২১)
রমজানের সিয়াম সাধনার দিনগুলো দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। আজ শেষ হতে চলেছে একুশতম রোজা।
এ মাসের শেষের দিনগুলোতে মহান আল্লাহর প্রিয় ব্যক্তিরা খুব কমই বিশ্রাম নিতেন ও খুব কমই ঘুমাতেন। আর ঘুম কমানোর জন্য তাঁরা অন্য সময়ের চেয়ে কম খেতেন। রমজানের আসন্ন বিদায়ে তাঁদের মন বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠতো।
পবিত্র কুরআনের দিক-নির্দেশনার আলোকে আত্মসংশোধন ও আত্ম-উন্নয়নের যে অনুশীলন করা হয় রমজান মাসে তার সাফল্য এবং কল্যাণ ধরে রাখার জন্য রমজানের পরও রাত জেগে ইবাদত করার অভ্যাস বজায় রাখা উচিত। পানাহারসহ দৈহিক সব চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে রমজানের সংযম চর্চার ধারা সারা বছরই অব্যাহত রাখেন বুদ্ধিমান খোদাভীরু ব্যক্তিরা। ফলে আমরা যেমন একদিকে হতে পারব সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, তেমনি নিয়মানুবর্তিতা, সংযম ও খোদাপ্রেমের নুরানি বরকতের ধারাও জীবনে ধরে রাখতে সক্ষম হব। খোদাভীতি ও খোদাপ্রেম মানুষের হৃদয়কে নরম রাখে। ফলে সে দরিদ্র, নিঃস্ব, ইয়াতিম, অসহায়, মজলুম, বিপদগ্রস্ত ও পাপী মানুষের জন্য বেদনা অনুভব করে এবং তাদের জন্য বাড়িয়ে দেয় সাহায্যের হাত।
রমজান মাসে মু’মিনের প্রধান সাধনা হওয়া উচিত ধর্মীয় জ্ঞান বৃদ্ধির চেষ্টা করা এবং এ জন্য মহান আল্লাহর সাহায্য চাওয়া। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের বাণীগুলোর মর্মার্থ হৃদয় দিয়ে উপলব্ধির চেষ্টা শুরু করতে হবে এই মাসে। ইসলামী বিধি-বিধানগুলোকে ভালোভাবে জানা ছাড়া পাপ থেকে দূরে থাকা ও মহান আল্লাহর প্রিয়পাত্র হওয়া কী সম্ভব? মহান আল্লাহ জ্ঞানী ব্যক্তির ইবাদতকে কম জ্ঞানী বান্দার ইবাদতের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। তাই ইসলামী বর্ণনায় বলা হয় জ্ঞানী ব্যক্তির ঘুমও মহান আল্লাহর কাছে অজ্ঞ ব্যক্তির ইবাদতের চেয়ে বেশি প্রিয়। জ্ঞানী ও সচেতন হওয়া ছাড়া খোদাভীরু হওয়া সম্ভব নয়। আর পবিত্র কুরআনের ভাষায় আল্লাহ কেবল খোদাভীরুদের সৎকর্মকেই গ্রহণ করেন। যারা খোদাভীরু নয়, বরং বক-ধার্মিক তাদের সৎকর্মের লক্ষ্য খ্যাতি অর্জন বা মানুষের বাহবা অর্জন। তাই তাদের সৎ কাজের পারলৌকিক কোনো প্রতিদান নেই।
যারা দুর্বল ঈমানদার তারা বেহেশতের লোভে বা দোযখের ভয়ে আল্লাহর ইবাদত করে। কিন্তু যারা কেবল আল্লাহকে ভালবেসে ইবাদত করে তাঁরা পাবেন অনেক বেশি মর্যাদা ও প্রতিদান। আর যে ব্যক্তি তার নব্বুই ভাগ কাজ করে শয়তানের দাস হিসেবে ও কেবল দশ শতাংশ কাজ করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সে একদিন বেহেশত পেলেও তার আগে তাকে হয়তো দোযখের আগুনে জ্বলতে হবে বহু বছর। ইসলামের দৃষ্টিতে ঈমানবিহীন আমলের কোনো মূল্য নেই, আবার আমল-বিহীন ইমানেরও কোনো মূল্য নেই। তাই মু’মিনকে ঈমান ও আমল দুই-ই রক্ষা করে চলতে হবে।
ইসলামী জ্ঞানের এক বড় উৎস হল আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ)’র ভাষণ, সংক্ষিপ্ত বাণী বা উপদেশ ও চিঠি-পত্রের সংকলন নাহজুল বালাগা। আলী (আ) মহান আল্লাহ সম্পর্কে যে কত গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন তার কিছুটা ধারণা পাওয়া যায় এ বই থেকে। যেমন, তিনি বলেছেন, “প্রতিষ্ঠিত প্রশংসা আল্লাহর। তাঁর গুণরাজী কোনো বর্ণনাকারী বর্ণনা করে শেষ করতে পারে না। তাঁর নেয়ামতগুলো গণনাকারীরা গুণে শেষ করতে পারবে না। প্রচেষ্টাকারীরা তাঁর নেয়ামতের হক আদায় করতে সক্ষম নয়। আমাদের সব প্রচেষ্টা ও জ্ঞান দিয়েও আল্লাহর পরিপূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করা সম্ভব নয় এবং সম্ভব নয় আমাদের সমগ্র বোধশক্তি দিয়ে তাঁর মাহাত্ম্য অনুভব করা। ...আল্লাহর পরিচিতি তথা তাঁর মারেফাতই দ্বীনের ভিত্তি।.. আল্লাহর আগমন সৃষ্টি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটেনি। আল্লাহ অস্তিত্বশীল কিন্তু অনস্তিত্ব থেকে তিনি অস্তিত্বে আসেননি। তিনি সব কিছুতেই আছেন কিন্তু কোনো ভৌত বা বস্তুগত নৈকট্যের মাধ্যমে নয়। আবার তিনিই সব কিছু হতে ভিন্ন কিন্তু কোনো বস্তুগত দ্বান্দ্বিকতা ও বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে নয়... তিনি সৃষ্টির সূত্রপাত করলেন একান্তই মৌলিকভাবে- কোনো ধরনের প্রতিরূপ ছাড়া, কোনো ধরনের পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ ছাড়া...
কোনো এক ব্যক্তি তাকে নতুন কোনো জ্ঞান শেখানোর অনুরোধ করেন হযরত আবুজার গিফারিকে (রা)। তিনি তাকে জানান, তুমি যাকে ভালোবাস তার ওপর জুলুম করা থেকে যদি বিরত থাকতে পার তাহলে তা-ই কর। ওই ব্যক্তি বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলেন, কেউ কি তার ভালবাসার পাত্রের ওপর জুলুম করে? আবুজার গিফারি (রা) বললেন, হ্যাঁ, তোমার নিজ সত্ত্বা তোমার সবচেয়ে প্রিয়। কিন্তু যখন তুমি আল্লাহর নাফরমানি কর তখন তুমি নিজেই তার ওপর জুলুম করছ!
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে আল্লাহর পরিচিতিসহ ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের ও তারই আলোকে জীবন পরিচালনার তৌফিক দান করুন। #
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো: আবু সাঈদ/১৬