খোদাপ্রেমের অনন্য মাস রমজান (পর্ব-২৭)
আর কয়েক দিন পরই শেষ হয়ে যাবে রহমত, বরকত ও মাগফিরাতসহ অজস্র খোদায়ী নেয়ামতে ভরপুর মাস রমজান।
অশেষ কল্যাণময় এই মাস থেকে আমরা কতোটা খোদায়ী নেয়ামত নিতে পেরেছি? খোদাপ্রেমের এই মেলায় আল্লাহ যখন প্রায় বিনামূল্যে আমাদের দিতে চাচ্ছেন অশেষ হিরা-জহরত, সোনা ও মনি-মুক্তো তখন আমরা যেন এই মাসেও পার্থিব সম্পদের প্রতারণাময় চাকচিক্যের মোহে কেবল কাঁচ ও কিছু রূপার মুদ্রা নিয়ে মহান আল্লাহর দানশীলতাকে উপেক্ষা করে মূর্খতার পরিচয় না দেই। খোদাপ্রেম-বিরোধী নানা অন্ধকার ও হৃদয়ের অন্ধত্বকে দূর করার জন্য এই মাসে আমাদের বার বার আশ্রয় নিতে হবে কুরআন ও হাদিসের গভীর অর্থের দিকে এবং আল্লাহর প্রিয়পাত্রদের রেখে-যাওয়া প্রেমময় মুনাজাতের দিকে।
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (সা:) বলেছেন,“কিয়ামতের দিন মানুষকে চারটি প্রশ্নের জবাব দানের আগে কোথাও যেতে দেয়া হবে না। এ চারটি প্রশ্ন হলো: (১) তার জীবনকে কোন্ পথে ব্যয় করেছে? (২) তার দেহকে কোন্ কাজে নিয়োজিত রেখেছে? (৩) অর্থকে কোন্ পথে ব্যয় করেছে অর্থাৎ কোথা হতে আয় করেছে ও কোথায় ব্যয় করেছে? এবং (৪) আমার আহলে বাইতের প্রতি কিরূপ ভালবাসা পোষণ করেছে? (তাবরানী,সুয়ূতী ও নাবাহানী)
পবিত্র রমজানের প্রাণ বা হৃদয় হলো শবে কদর। আরবিতে 'কাদর' শব্দটির অর্থ হচ্ছে পরিমাপ। এই রাতে কি পরিমাপ করা হয়? এর উত্তর হল: কতটা সৌভাগ্য বা বরকত বণ্টন করা হবে সারা বছরের জন্য- তাই পরিমাপ করা হয় সৌভাগ্যের এই রাতে। কতটা সৌভাগ্য বা বরকত বরাদ্দ করা হয়? এর উত্তর হল: আপনি যতটা চান ততটাই বরাদ্দ করা হয়। কারণ,এই রাতে যিনি দান করেন তিনি হলেন অফুরন্ত কল্যাণ ও বরকতের অধিকারী অসীম দয়ালু ও দাতা মহান আল্লাহ। কেউ যদি কম চায় তাহলে তো কেউই তাকে বেশি দেয় না।
কদরের রাতগুলোতে পবিত্র কুরআনের সুরা দুখান, সুরা রুম ও সুরা আনকাবুত পড়ার ওপর খুব জোর দেয়া হয়। বিশ্বনবী (সা.) রমজানের শেষ দশ রাতে মোটেই ঘুমাতেন না।
রমজান মাসে মহান আল্লাহর নানা গুণের রঙ্গে নিজেকে রাঙ্গিয়ে তোলার অনুশীলন করেন খোদাপ্রেমিকরা। মহান আল্লাহ পবিত্র। তাই মু’মিনদেরও আত্মিক ও বাহ্যিক সব দিকেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। মহান আল্লাহ ন্যায়বিচারক তাই তিনি ন্যায়বিচারকেও ভালবাসেন এবং ঘৃণা করেন জালেম ও জালেমের সহযোগীদের। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে মুসলমানদের বলেছেন, শত্রুভাবাপন্ন কাফিরদের প্রতি কঠোর হতে এবং মুসলমান ও মুমিনদের প্রতি দয়ার্দ্র হতে। তিনি আরও বলেছেন, কাফির ও মুশরিকদের বন্ধু বানিও না এবং মুসলমানদের সঙ্গে শত্রুতার ক্ষেত্রে ইহুদিরা সবচেয়ে কঠোর। অথচ বহু মুসলিম সরকার ইসরাইলের সঙ্গে ও ইসরাইলের প্রধান মুরুব্বি ইঙ্গ-মার্কিন সরকারসহ পাশ্চাত্যের সঙ্গে একজোট হয়ে সিরিয়ার মুসলিম সরকার ও জনগণের সঙ্গে শত্রুতা করে দেশটির ওপর চাপিয়ে দিয়েছে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ এবং ধ্বংসযজ্ঞ!
বিশ্বের বড় বড় কয়েকটি শক্তি ও তাদের সেবাদাস সরকারের জুলুমে মানবতা বিপন্ন হয়ে আছে বহু বছর ধরে। ইয়েমেন, বাহরাইন, ফিলিস্তিন, কাশ্মির ও মিয়ানমারসহ বিশ্বের নানা অঞ্চলের মুসলমানরা আজ নানা ধরনের বঞ্চনা, বৈষম্য, হত্যাযজ্ঞ ও সন্ত্রাসবাদের শিকার। গাজা, পশ্চিম তীর ও ইয়েমেনের মুসলমানরা নানা ধরনের অবরোধ ও হামলার শিকার। ইয়েমেনে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে নির্বিচার সৌদি আগ্রাসন। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের বহু দেশেরই আলেম ও বুদ্ধিজীবিরা এ ব্যাপারে হয় নীরব অথবা জুলুমেরই সমর্থক।
মুসলমানদের প্রথম কিবলা আল-আকসার ওপর ইহুদিবাদী ইসরাইলের দখলদারিত্ব বজায় রয়েছে অর্ধ শতক ধরে। মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও পুরনো ফিলিস্তিন সংকটে জর্ডানি, মিশরিয় ও সৌদি সরকারসহ বহু আরব আর মুসলিম সরকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বর্ণবাদী দখলদার ইসরাইলকেই মদদ দিচ্ছে। অন্যদিকে ইসরাইল-বিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রামে জড়িত হামাস, হিজবুল্লাহ ও তাদের সমর্থক ইসলামী ইরান আর সিরিয়ার সরকারকে সন্ত্রাসী বলে অপবাদ দিচ্ছে! ইসরাইল প্রতিদিনই ফিলিস্তিনিদের জমিজমা ও বাড়ি ধ্বংস করে অবৈধ ইহুদি বসতি বিস্তার করছে। অথচ এই ইসরাইলের সঙ্গে সৌদি সরকারের ঘনিষ্ঠতা ক্রমেই বাড়ছে!
রমজানের শেষ শুক্রবার হচ্ছে বিশ্ব কুদস্ দিবস। মুসলমানদের প্রথম কিবলা আলআকসা মসজিদ ও পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস শহরকে ইহুদিবাদী ইসরাইলের জবরদখল ও পুরো ফিলিস্তিনকে ইসরাইলের নাগপাশ থেকে মুক্ত করার জন্য বিশ্বব্যাপী গণ-সচেতনতা সৃষ্টির দিন হচ্ছে এই দিবস। ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনীর আহ্বানে ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর প্রথম চালু হয় এই দিবস। তাই ন্যায়বিচার ও মুক্তিকামী সবার উচিত কুদস দিবসের মিছিলে অংশ নেয়া এবং ফিলিস্তিনি জাতির অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার জন্য সাম্রাজ্যবাদীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। তা না হলে আমাদের নামাজ-রোজা হবে ত্রুটিপূর্ণ বা মূল্যহীন।#
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবুসাঈদ/২৭