খোদাপ্রেমের অনন্য মাস রমজান (পর্ব-২৯)
প্রত্যেক বিষয়েরই রয়েছে বিশেষ আদব-কায়দা। মহান আল্লাহর কাছে মুনাজাতও এর ব্যতিক্রম নয়। মহান আল্লাহ ভগ্ন ও আকুল হৃদয়ের দোয়াই বেশি কবুল করেন।
নবী-রাসুলসহ শীর্ষস্থানীয় মহাপুরুষদের দোয়ার ভাষা লক্ষ্য করুন। তারা সৎকাজে সবচেয়ে অগ্রগামী হওয়া সত্ত্বেও এমনভাবে আল্লাহর দরবারে বিনম্র হয়ে ও কেঁদে কেঁদে দোয়া করতেন যে, মনে হত যে তাঁদের মত বড় পাপী আর কেউই ছিল না। হযরত মুসা আ. মহান আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতে তথা কথোপকথনের সময় আল্লাহকে তাঁর প্রশংসাসূচক নানা নামে যখনই ডাকতেন তখন মহান আল্লাহও একটি ইতিবাচক প্রত্যুত্তর দিতেন। কিন্তু মুসা নবী যখনই বলেছিলেন, হে পাপীদের খোদা!- তখন মহান আল্লাহ তিন বার ইতিবাচক জবাব দেন! অর্থাৎ এই ডাকটি আল্লাহর কাছে খুব বেশি প্রিয় ও পছন্দের। মহান আল্লাহ কুরআনেও বলেছেন, তিনি তওবাকারীদের ভালবাসেন। অনুতপ্ত পাপী ব্যক্তির দোয়াতে বিনম্রতা স্বাভাবিকভাবেই বেশি থাকে। কারণ, পাপী মনে করে আমি তো নামাজ, রোজা বা অন্য কোনো ইবাদতই করিনি, বরং সব সময় বহু ধরনের পাপই করেছি, আর আজ যখন আল্লাহর দরবারে তওবা করছি, তখন আল্লাহর রহমত ও দয়ার আশা করা ছাড়া আমার তো কোনো সম্বলই নেই। এ অবস্থায় সে হয়ে পড়ে শতভাগ আল্লাহর দয়ার ওপর নির্ভরশীল।
তাই গভীরভাবে অনুতপ্ত বা লজ্জিত পাপীর তওবা ও কান্নায় যখন অন্তরের সব আকুলতা এবং সবচেয়ে অসহায় ব্যক্তির আর্তি ফুটে ওঠে তখন সর্বোচ্চ দয়ার আঁধার মহান আল্লাহর রহমতের দরিয়াও উথলে উঠে এবং মহান আল্লাহ যে সবচেয়ে বেশি ক্ষমাশীল ও দয়ালু তা তখন প্রকাশ না করার আর কোনো উপায় থাকে না। এ জন্যই বলা হয়, কান্না হচ্ছে আল্লাহর দরবারে মু’মিনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র!
মোট কথা আল্লাহর দরবারে দোয়া কবুল করাতে চাইলে যে ব্যক্তি সব সময়ই নামাজ-রোজাসহ সব ইবাদত ও সব ধরনের ভালো কাজে অগ্রগামী তাঁকেও খুবই ভগ্ন হৃদয়ে আল্লাহর কাছে মুনাজাত করতে হবে। কুল-কিনারাহীন নির্জন সমুদ্রে ডুবন্ত ব্যক্তির মতোই কেবল আল্লাহর অশেষ দয়ার ওপরই মুক্তির ভরসা রেখে মুনাজাত করতে হবে এবং মুনাজাতের সময় এ ভাব রাখতে হবে যে আমি যদি অশেষ ত্রুটিযুক্ত ও অতি অপর্যাপ্ত মাত্রায় কিছু ভালো কাজ করেও থাকি তা তো আমার কৃতিত্ব নয়, তা বরং আল্লাহরই দয়ার প্রকাশ। আর এসব ভালো কাজ কেবল আল্লাহর দয়ার ফলেই পাস মার্ক পেতে পারে, তা না হলে এসবই হবে মূল্যহীন!
খোদাপ্রেমিকদের আদর্শ দোয়া হিসেবে বিবেচিত দোয়ায়ে কুমাইলে বলা হয়:
হে আল্লাহ! ক্ষমা কর তাকে যার মূলধন কেবলই আশা আর অস্ত্র শুধু কান্না!... হে অসহায়ের ফরিয়াদে সাড়া দানকারী! হে আশ্রয়প্রার্থীদের আশ্রয়স্থল! মু’মিন মুসলমানদের অন্য এক বহুল প্রচলিত দোয়ায় বলা হয়:
‘হে আল্লাহ! আমি তোমার ক্ষমা-প্রাপ্তিকেই আমার আমলের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেই এবং তোমার রহমতকে আমার পাপের চেয়ে বেশি প্রশস্ত মনে করি। আমার পাপ যদি তোমার কাছে বড্ড বেশি বা খুব বড় মনে হয় হে খোদা! তবে তোমার ক্ষমাশীলতা তো তার চেয়েও অনেক বেশি বড়! আর আমি আমার অপকর্মগুলোর কারণে যদি তোমার রহমত লাভের উপযুক্ত নাও হয়ে থাকি, কিন্তু তোমার রহমত তো আমাকে ধরার উপযুক্ত, কারণ (কুরআনের ভাষায়) তোমার রহমত বা করুণা সব কিছুতেই পরিব্যপ্ত হয়ে আছে।
রমজানে বিশেষ করে রমজানের শেষ রাতগুলোতে দোয়া ও ইবাদতের গুরুত্ব অপরিসীম। এমনসব রাতে বলা উচিত: 'হে আল্লাহ! আমরা একদল রহমত-প্রত্যাশী ভিক্ষুক তোমার সম্মান ও মহামর্যাদার উসিলায় তোমার রহমতের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। পুণ্য বলতে কিছুই নেই আমাদের। তাই নতজানু ও দরিদ্রদের সঙ্গে চড়েছি এমন এক জাহাজে যা অপেক্ষা করছে তোমার দয়া ও করুণার মহাসাগর-তীরে। অনুমতি চাচ্ছি তোমার যাতে পাড়ি দিতে পারি তোমার দয়া ও রহমতের এই মহাসাগর। তুমি যদি এই সম্মানিত মাসে কেবল তাদেরকেই ক্ষমা কর যারা একনিষ্ঠ ইবাদত তথা রোজা ও নামাজের মাধ্যমে নিজেদের পবিত্র করেছে তাহলে উদাসীন পাপীদের কে রক্ষা করবে যারা ডুবে আছে তাদের পাপের সাগরে? যদি তুমি তোমার অনুগত বান্দাহ ছাড়া অন্যদের করুণা না কর তাহলে হতভাগা অবাধ্যদের কে রক্ষা করবে? যারা সৎকর্ম করেছে কেবল তাদের কাজকেই যদি তুমি কবুল কর তাহলে তাদের কি উপায় হবে যারা পুণ্যহীন বা যাদের সৎকর্ম খুবই নগণ্য?' 'হে আল্লাহ! আমরা অনুতপ্ত পাপী বলেই তুমি আমাদের ক্ষমা কর ও রক্ষা কর দোযখের আগুন থেকে তোমার অপার করুণায়। হে সর্বোচ্চ দাতা ও দয়ালু! তোমার প্রিয় নবী ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি অশেষ দরুদ পাঠানোর উসিলায় ক্ষমা কর আমাদের।'
হে আল্লাহ! পবিত্র রমজানে আমরা যেন প্রকৃত তওবাকারী হতে পারি এবং ঈমান ও খোদাপ্রেমের মাধুর্য অনুভব করতে পারি সে তৌফিক দিন।#
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবুসাঈদ/২৯