জুন ২৮, ২০১৭ ১২:০৭ Asia/Dhaka

গত দুই পর্বের আলোচনায় আমরা জেনেছি খাজা নাসির উদ্দিন নানা বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করা সত্ত্বেও গণিত বিষয়ে তাঁর দক্ষতার খ্যাতি ছিল সবচেয়ে বেশি।

তিনি ইউক্লেডিয় জ্যামিতির মূল নীতির বিষয়ে একটি ব্যাখ্যামূলক বই লিখেছিলেন। বইটি অক্ষত অবস্থায় আজও টিকে আছে। গ্রিক পণ্ডিত ইউক্লিডের জ্যামিতি বিষয়ক বই আব্বাসিয় খলিফার যুগে আরবি ভাষায় অনূদিত হয়েছিল কয়েক ব্যক্তির অনুবাদের সুবাদে। আর ওই আর ওই অনুবাদের আলোকে খাজা নাসির উদ্দিন বইটির ব্যাখ্যা ও পুনর্লিখন সম্পন্ন করেন। এ বইয়ে রয়েছে ১৩টি প্রবন্ধ, পরে আরও দু’টি প্রবন্ধ এতে যুক্ত করা হয়। প্রথম থেকে ষষ্ঠ প্রবন্ধ সমতল জ্যামিতি সম্পর্কিত এবং সপ্তম থেকে দশম প্রবন্ধ ক্যালকুলাস ও সংখ্যার বৈশিষ্ট্য বিষয়ক। আর ১১ থেকে ১৩ তম প্রবন্ধ মহাকাশ-বিষয়ক জ্যামিতি।

 

প্রখ্যাত মার্কিন ঐতিহাসিক জর্জ সার্টন ‘বিজ্ঞানের ইতিহাস’ শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন, খাজা নাসির উদ্দিনের এই ব্যাখ্যামূলক বই ও ইউক্লিডের প্রতি তার অনুসরণের সুবাদে শত শত বছর ধরে প্রখ্যাত গণিতবিদরাও গণিতের এই দিকপালকে অনুসরণ করেছেন।

 

‘জিজে ইলখানি’ বা ‘ইলখানি সারণী’ খাজা নাসির উদ্দিনের একটি বিখ্যাত বই। বইটি তিনি লিখেছেন ফার্সি ভাষায়। জিজ বলতে জ্যোতির্বিদরা গ্রহ-নক্ষত্রসহ আকাশের নানা বস্তুর অবস্থা আর গতিবিধির বর্ণনাকে বোঝান যা তারা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অর্জন করেন। খাজা মহাকাশ-পর্যবেক্ষণ করে নানা সময়ে যা দেখেছেন তা লিখেছেন এ বইটিতে। বইটিতে রয়েছে চারটি প্রবন্ধ বা অধ্যায়। প্রথম প্রবন্ধটি ইতিহাস সম্পর্কিত, দ্বিতীয় প্রবন্ধটি গ্রহ-নক্ষত্রের গতিপথ ও অবস্থান সম্পর্কিত এবং তৃতীয় প্রবন্ধটি সময় বিষয়ক ও চতুর্থ প্রবন্ধটি গ্রহ-নক্ষত্রের অন্যান্য তৎপরতা সম্পর্কিত। খাজা এ বইয়ের ভূমিকায় মোঙ্গল শাসক চেঙ্গিস খান ও তার বংশধরদের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। আর এই ভূমিকা থেকেই জানা সম্ভব হয় যে খাজা মারাগের মানমন্দির বা মহাকাশ-পর্যবেক্ষণ ও বিজ্ঞান-গবেষণা কেন্দ্রটি নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন হিজরি ৬৫৭ সনে। খাজার এ বইটির ব্যাখ্যা সম্পর্কেও কয়েকটি মূল্যবান ও নির্ভরযোগ্য বই লেখা হয়েছে।

 

‘আখলাকে নাসিরি’ বা ‘নাসিরি নৈতিকতা’ খাজা নাসির উদ্দিনের লেখা আরেকটি বিখ্যাত বই। এ বইটিও তিনি লিখেছেন ফার্সি ভাষায়। ব্যবহারিক প্রজ্ঞা ও নৈতিকতার বিষয়ে কুহেস্তান তথা দক্ষিণ খোরাসানের তৎকালীন শাসক মোহতাশামের অনুরোধেই খাজা এ বইটি লিখেছিলেন। অত্যন্ত সারগর্ভ এ বইয়ে চরিত্রকে উন্নত করা এবং পরিবার ও রাষ্ট্র-পরিচালনার বিষয়ে প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্বদের মতামতের পাশাপাশি এসব বিষয় উপলব্ধির জন্য সহায়ক প্রাচ্যের দর্শনও তুলে ধরা হয়েছে আকর্ষণীয় ও সর্বোত্তম পন্থায়।

 

চিকিৎসা বিষয়েও কয়েকটি বই লিখেছিলেন খাজা নাসির উদ্দিন। তবে খাজা গণিত, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা ও জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ে যত গভীরভাবে মনোনিবেশ করেছিলেন ততটা গভীর মাত্রায় মনোনিবেশ করেননি চিকিৎসা বিদ্যার দিকে। খাজা কিছু দিন কুতুব উদ্দিন মিসরির কাছে চিকিৎসা বিদ্যা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। মিসরি ছিলেন ফখরুদ্দিন রাজির ছাত্র এবং চিকিৎসা ও প্রজ্ঞা শাস্ত্রের একজন বড় বিশেষজ্ঞ। খাজা তার কাছে ইবনে সিনার বিশ্ববিশ্রুত বই কানুন অধ্যয়ন করেছিলেন।   

 

খাজা নাসির উদ্দিন চিকিৎসা-বিজ্ঞান বিষয়ের দিকপাল ও অগ্রপথিক তথা আর রাজি,ইবনে সিনা,আহওয়াজি এবং ইসলামী চিকিৎসা বিদ্যার বিখ্যাত অনুবাদকদের মতামতকে সমর্থন করতেন। খাজা তার পূর্বসূরি তথা রাজি ও ইবনে সিনার মত হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করেননি, বরং তিনি গণিত,জ্যোতির্বিদ্যা ও দর্শন নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকতে আগ্রহী ছিলেন।

 

খাজা নাসির উদ্দিন আরবি ও ফার্সিতে কবিতাও লিখেছেন। খাজার মৃত্যুর পর বেশিরভাগ জীবনী লেখক ও ঐতিহাসিক তাকে কবি বলেই মনেই করতেন। সাহিত্যের অঙ্গনে খাজা ছিলেন একজন নিখুঁত সমালোচক। জ্যোতির্বিদ ও কবি হিসেবে খ্যাত খাজা নাসির উদ্দিন সাহিত্যের ক্ষেত্রে আসির উদ্দিন ও হুমাম তাবরিজির মত প্রখ্যাত ছাত্রও গড়ে তুলেছিলেন। সে যুগের জ্ঞানী-গুণিরা আরবিতে সাহিত্য ও জ্ঞান চর্চা করলেও খাজা উভয় ভাষাতেই জ্ঞান চর্চা করেছেন। ফলে ফার্সি ভাষার বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন খাজা নাসির উদ্দিন।  

 

খাজা নাসির উদ্দিনের লেখনীর বৈশিষ্ট্য হল তার লেখা সে যুগের অন্যান্য লেখকদের তুলনায় ছিল বেশি সহজ-সরল, সাবলীল ও কার্যকর।

‘আসাসুল ইকতেবাস’ তথা শিক্ষণের ভিত্তি, ‘মেইয়ারুল আশয়ার’ বা কবিতার মানদণ্ড এবং ‘তাজরিদই মানতেক’ বা যুক্তিবিদ্যার অস্পষ্টতা দূরীকরণ খাজার আরও কয়েকটি বিখ্যাত বইয়ের নাম।

 

খাজা নাসির উদ্দিনের ‘মেইয়ারুল আশয়ার’ বা উরুজে ফার্সি তথা ফার্সি কবিতার শব্দ-কাঠামো ও ছন্দ-বিশ্লেষণ বিষয়ক বইটি ৬৪৯ হিজরিতে লেখা হয়েছিল। তার ‘তাজরিদই মানতেক’ বা ‘যুক্তিবিদ্যার অস্পষ্টতা দূরীকরণ’ শীর্ষক বইটি লেখা শেষ হয় হিজরি ৬৫৬ সনে। এ বইটির শেষ অধ্যায়ে কবিতা সম্পর্কে আলোচনা করেছেন খাজা।

 

‘আসাসুল ইকতেবাস’ তথা শিক্ষণের ভিত্তি শীর্ষক বইটি যুক্তি-বিদ্যা সম্পর্কিত। খাজা নাসির উদ্দিন এ বইটি লিখেছিলেন ফার্সি ভাষায়। বইটি লেখা সম্পন্ন হয়েছিল হিজরি ৬৪২ সনে। এ বইয়ে রয়েছে ৯টি প্রবন্ধ। প্রতিটি প্রবন্ধে কয়েকটি বৈজ্ঞানিক বিষয়ের আলোচনা রয়েছে। আর নয় নম্বর প্রবন্ধটিতে রয়েছে কবিতা সম্পর্কিত আলোচনা। দর্শন ও যুক্তিবিদ্যার জগতে ইবনে সিনার ‘শাফা’ বইটির পরই ‘আসাসুল ইকতেবাস’ বইটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

ধর্মীয় নীতিশাস্ত্র বা কালাম শাস্ত্রেও অবদান রেখেছেন খাজা নাসির উদ্দিন। এ বিষয়ে তার লেখা ‘তাজরিদুল আকায়েদ’ তথা ‘ধর্মীয় বিশ্বাসে অস্পষ্টতা দূরীকরণ’ শীর্ষক বইটি হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই। ধর্মীয় বিশ্বাসের মূলনীতি তুলে ধরার ক্ষেত্রে এটি সংক্ষিপ্ত পরিসরের একটি শ্রেষ্ঠ বই। তিনি এ বইয়ে ৬টি বিষয়ে আলোচনা রয়েছে। এ বিষয়গুলো হল: সাধারণ বিষয়াদি, অলঙ্কারিক বা অতি মূল্যবান ও ব্যতিক্রমী বিষয় বা ঘটনা, স্রস্টার অস্তিত্বের প্রমাণ ও তাঁর গুণাবলী, নবুওত, ইমামত এবং পরকাল ও তার প্রমাণ। বইটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করে এবং এর পক্ষে-বিপক্ষে সমালোচনা ও ব্যাখ্যামূলক লেখালেখিতে ব্যস্ত হন বিশেষজ্ঞ বা আলেম সমাজ।#

 

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/২৮