জুলাই ১৩, ২০১৭ ১৩:২২ Asia/Dhaka

জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিখ্যাত ইরানি মনীষী খাজা নাসিরউদ্দিন তুসির অবদান ও ভূমিকা প্রসঙ্গে আমরা এই মহান মনীষীর কয়েকটি বইয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরেছিলাম গত পর্বে। আজ আমরা তার অন্য কয়েকটি বই সম্পর্কে একই ধরনের আলোচনা করব।

খাজা নাসিরউদ্দিনের লেখা আরেকটি বিখ্যাত বই হল ‘উসাফুল আশরাফ’। এ বইটি ইরফান বা আধ্যাত্মিক জ্ঞান বিষয়ে খাজার উচ্চতর অবস্থান তুলে ধরে। তিনি মোঙ্গল রাজদরবারের একজন মন্ত্রীর অনুরোধে এ বইটি লিখেছিলেন। খাজা এ বইয়ে কিয়ামত, বেহেশত ও জাহান্নামসহ নানা বিষয়ে আলোচনা করেছেন ইরফানি দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে। 

‘মাবদা ও মায়াদ’ বা ‘উৎস ও পরকাল’ খাজা নাসিরউদ্দিনের লেখা আরেকটি বই। কোনো কোনো সংস্করণে এ বইটির নাম ‘অ’গাজ ও আনজ’ম’ তথা ‘শুরু ও সমাপ্তি’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বইয়েও তিনি সৃষ্টির সূচনা, সৃষ্টি সম্পন্ন হওয়ার পর্যায়, কিয়ামত, বেহেশত ও জাহান্নামসহ নানা বিষয়ে আলোচনা করেছেন ইরফানি দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে।  

খাজা নাসিরউদ্দিন ভূগোল, খনিজ-বিদ্যা, ইসলামী আইন, তাফসির, শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ, সঙ্গীত ও আরও অনেক বিষয়ে মূল্যবান লেখনী বা অবদান রেখে গেছেন। তার লেখা বই, প্রবন্ধ ও পত্রের সংখ্যা ১৫০টিরও বেশি। এসব বইয়ের মধ্যে রয়েছে যুক্তিবিদ্যা সম্পির্কত বই ‘আসাসুল ইকতেবাস’ তথা ‘আহরণ বা চয়নের ভিত্তি’। গবেষকরা মনে করেন এ বইটি যুক্তিবিদ্যা বিষয়ে গুরুত্বের দিক থেকে শীর্ষস্থানীয় বইগুলোর অন্যতম।

খাজা নাসির উদ্দিন গণিতে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। তিনি এ বিষয়ে কয়েকটি বই লিখে গেছেন। এ বইগুলো ছিল সৃষ্টিশীলতা ও উদ্ভাবনে ভরপুর। খাজাই প্রথমবারের মত তার একটি বইয়ে ত্রিকোনোমিতি শাস্ত্রকে জ্যোতির্বিদ্যার  আশ্রয় না নিয়েই বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। গনিতের সূত্র বা বিধানগুলো ও সেসবের নানা রূপ নির্ণয়ে তিনি অসাধারণ পারদর্শিতা দেখিয়েছেন।

সমতল জ্যামিতির নানা মূলনীতি ও তত্ত্ব পুরোপুরি আয়ত্ত্ব করেছিলেন খাজা নাসির উদ্দিন। সমান্তরাল জ্যামিতির রেখাগুলো সম্পর্কিত তত্ত্বকে তিনি বিন্যস্ত করেছেন নানা যুক্তি ও সম্ভাবনার ভিত্তিতে যা তার আগের গণিতবিদরা ধারণা করতে পারেননি। খাজাই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি বৃত্তাকার  বা গোলক-আকৃতি বিশিষ্ট ক্ষেত্রের ত্রিভূজে আয়তক্ষেত্রের ৬ ধরনের অবস্থা নির্নয় করেন। তিনি ত্রিকোনোমিতি বিষয়ে যেসব গবেষণা করেছেন তা আধুনিক যুগের এ সংক্রান্ত গবেষকদের গবেষণার সঙ্গে মিলে যায়। আর এ জন্যই ত্রিকোনোমিতি শাস্ত্রের আলোচনায়  খাজা নাসির উদ্দিনের নাম অমর হয়ে আছে।

খাজা নাসির উদ্দিন ইউক্লিড, আর্কিমিডিস ও টলেমির মত বড় বড় গণিতবিদের গাণিতিক কর্মের ওপর ব্যাখ্যামূলক বই লিখেছেন। খাজা তাদের গাণিতিক কর্মগুলোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং অর্থ অত্যন্ত সহজ ভাষায় তুলে ধরেছেন এইসব বইয়ে। এভাবে তিনি তার যুগের ও পরবর্তী যুগের গণিত-শিক্ষার্থী এবং গবেষকদের জন্য গণিত শাস্ত্রকে অপেক্ষাকৃত সহজ করে দিয়ে গেছেন। খাজা নাসির উদ্দিন অতীতের গণিত বিষয়ের অনুবাদ বইগুলোর অনেক কিছুই সংশোধন করেছেন। এইসব বই অনুবাদ করা হয়েছিল গ্রিক থেকে আরবি ভাষায়। 

জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ে খাজা নাসির উদ্দিনের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ দু’টি বই হল ‘জিজে ইলখানি’ বা ইলখানি সারণী এবং ‘তাজকিরা ফি ইলমুল ইলাহিয়্যাত’ বা আসমানি বিদ্যার কথা। শেষোক্ত বইটি তথা ‘তাজকিরা ফি ইলমুল ইলাহিয়্যাত’ শীর্ষক বইটিতে খাজা টলেমির জ্যোতির্বিদ্যার সমালোচনা করেছেন। টলেমির জ্যোতির্বিদ্যার এমন পরিপূর্ন সমালোচনা আর কোথাও দেখা যায় না। ফলে খাজার এ বইটি গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি সম্পর্কিত গণিতের আদর্শ বই হিসেবে বিবেচিত হয়। এ বইটি খুব সম্ভবত বাইজান্টাইন জ্যোতির্বিদদের লেখনীর সূত্রে কোপার্নিকাসের কাছে পৌঁছেছিল। আর কোপার্নিকাস তাতে জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কিত নতুন কিছু তথ্য যুক্ত করেন। অবশ্য সূর্য যে আমাদের এই সৌর-জগতের কেন্দ্র –এই ধারণাটি এ বইয়ে উল্লেখ করা হয়নি।   

খাজা নাসির উদ্দিন মারাক্বের মানমন্দির বা বিজ্ঞান গবেষণাগার ও মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের জন্য নানা যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করেছিলেন। অতীতের মহাকাশ পর্যবেক্ষণ-কেন্দ্রগুলোতে এমন উন্নত যন্ত্রপাতি ছিল না। খাজার এইসব উন্নত যন্ত্রের সুবাদে জ্যোতির্বিদ্যা শাস্ত্রের ব্যাপক উন্নতি ঘটেছিল। 

খাজা নাসির উদ্দিন তুসি রাষ্ট্র ও সমাজ-পরিচালনা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি ধর্মকে পরকালের অনন্ত জগতে পৌঁছার উজ্জ্বলতম পথ বলে মনে করতেন। খাজা তার সব লেখনীতে  স্বাধীনতা ও জ্ঞানের শ্লোগান দেয়া সত্ত্বেও প্রকাশ্যেই এটা বলতেন যে, প্রকৃত জ্ঞান ঈমান ও ধর্মের মাধ্যমেই অর্জন করা যায় এবং জ্ঞানের মূল বাস্তবতা হল ধর্ম যা মানুষের ক্লান্ত প্রাণ ও আত্মাকে করে প্রশান্ত।

খাজা নাসির উদ্দিন তুসি অন্য যে কোনো বিষয়ের চেয়ে জ্যোতির্বিদ হিসেবে এবং বিজ্ঞান গবেষণাগারের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেই খ্যাতি অর্জন করেছেন।

খাজা নাসির উদ্দিনের ‘তানসুক-নামেহ’ বইটিকে খনিজ-পাথর বিদ্যা বিষয়ে বিরুনির বইয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়। বইটি এক্ষেত্রে বিরুনির কিতাব ‘আল জামাহিরু ফি মারেফাতিল জাওয়াহের’ শীর্ষক বইটির পরই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে।

খাজা নাসির উদ্দিন তুসিকে অন্যতম সেরা মুসলিম দার্শনিক হিসেবেও সম্মান করা হয়। ইবনে সিনার রেখে-যাওয়া ‘মাশশায়ি’ বা এরিস্টটোলিয় দর্শনকে তিনিই পুনরুজ্জীবিত করেন। ইবনে সিনার এ দর্শন দুই শতকের মধ্যে কালাম  শাস্ত্র বা ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক ধর্মতত্ত্বের মধ্যে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। খাজা ‘ইশরাক্বি’ দর্শন তথা বুদ্ধি ও ঐশী সহায়তা-লব্ধ দর্শন ও ‘মাশশায়ি’ দর্শনের পর্যায়ক্রমিক সমন্বয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিত্বদের অগ্রপথিক হিসেবেও বিবেচিত হন।

নীতিশাস্ত্র বা নৈতিকতা বিষয়ে লেখা খাজা নাসির উদ্দিনের বই ‘আখলাকে নাসিরি’ এতটা জনপ্রিয় ছিল যে তা ছিল ভারত ও ইরানে নৈতিকতা বিষয়ের বইগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত বই। নাসির উদ্দিন তুসির ‘তাজরিদুল আকায়েদ’ বা ‘আকিদা-বিশ্বাসের বিশুদ্ধিকরণ’ শীর্ষক বইটিতে বিশ্বনবী (সা)’র পবিত্র আহলে বাইতের অনুসারী তথা ১২ ইমামি শিয়া মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস সংক্রান্ত আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে।#

 

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/১৩