আগস্ট ১২, ২০১৭ ১৬:৪৩ Asia/Dhaka

গত পর্বে আমরা বলেছিলাম যে বিজ্ঞান-চর্চায় উৎসাহী বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও সম্রাট উলুগ বেগ সমরকন্দে মহাকাশ-পর্যবেক্ষণ ও বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কাজে সহায়তার জন্য যেসব বিজ্ঞানীদের সাহায্য চেয়েছিলেন জামশিদ কাশানিও ছিলেন তাদের অন্যতম।

কারণ, অসাধারণ বিজ্ঞানী জামশিদ কাশানি ছিলেন একাধারে পদার্থ-বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ।  এর  আগে তিনি কখনও তার বৈজ্ঞানিক দক্ষতা ও যোগ্যতা প্রমাণের এতো বড় সুযোগ পাননি।  

 

জামশিদ কাশানি জ্যোতির্বিদ্যা বা মহাকাশ-বিদ্যা সম্পর্কিত তার বই ‘জিজে খক্বানি’র নামকরণ করেছিলেন উলুগ বেগের বাবা শাহরুখ তৈমুরির নামের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে। শাহরুখ তৈমুরির উপাধি ছিল খ’ক্বান। বইটি তিনি উপহার দেন শাহরুখের পুত্র উলুগ বেগকে।

 

অনেকেই বলেন যে, এ বইয়ের কারণেই উলুগ বেগ গিয়াসউদ্দিন জামশিদ কাশানিকে সমরকন্দে আসার দাওয়াত দিয়েছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন, উলুগ বেগ কাজিজাদেহ রুমির মাধ্যমে জামশিদ কাশানি সম্পর্কে জানতে পারেন এবং এ কারণেই তাকে অত্যন্ত মর্যাদা দিয়ে সমরকন্দে আসার আমন্ত্রণ জানান। কাজিজাদেহ নিজেও ছিলেন একজন গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ।  এ সম্পর্কিত এক বর্ণনায় এসেছে:

 

কাজিজাদেহ ছিলেন রুমের একজন বিজ্ঞানী। রুম অঞ্চলটি ছিল বর্তমান তুরস্কে। কাজিজাদেহ রুমি ট্রান্স-অক্সিয়ানা অঞ্চলের শাসক মির্জা উলুগ বেগ তৈমুরির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ইরাক থেকে সমরকন্দে যান।

 

পথে তিনি কাশানে অবস্থান করেন কিছু সময়ের জন্য। একদিন তিনি ফার্সিভাষী কোনো গণিতবিদের সন্ধানে কাশানের বাজার এবং অলি-গলিতে ঘুরছিলেন। ঘটনাক্রমে তিনি একটি ছোট্ট ঘরে একজন খাটো আকৃতির মানুষকে বসে থাকতে দেখলেন। ওই ব্যক্তি একটি বইয়ে নজর বুলাচ্ছিলেন। তার আশপাশেও ছিল এক গাদা বই এবং অ্যাস্ট্রোল্যাবসহ জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কিত কিছু যন্ত্রপাতি। কাজিজাদেহ বুঝতে পারেন যে এই ব্যক্তি নিশ্চয়ই জ্যোতির্বিদ ও গণিতবিদ। ফলে কাজিজাদেহ খুব খুশি মনে ওই ব্যক্তির ঘরটির দরজার খুব কাছে গিয়ে তাকে প্রশ্ন করেন, মাওলানা! এসব কী?

 

ওই ব্যক্তি পাল্টা প্রশ্ন করেন, আপনি কী করতে চান? কাজিজাদেহ বললেন, আমি এসব কিনতে চাই। ওই ব্যক্তি তথা গিয়াসউদ্দিন জামশিদ কাশানি বললেন, কী কিনতে চান? কাজিজাদেহ বললেন, আমি অ্যাস্ট্রোল্যাবটি কিনতে চাই। জামশিদ কাশানি বললেন, এটা আপনার কি কাজে লাগবে? কাজিজাদেহ এক ধরনের বিশেষ অ্যাস্ট্রোল্যাবের নাম বললেন। জবাবে গিয়াসউদ্দিন জামশিদ কাশানি বললেন,আমি এই অ্যাস্ট্রোল্যাবটি কেবল তার কাছেই বিক্রি করব যে গণিত বিষয়ে আমার কিছু প্রশ্নের উত্তর তথা কিছু সমস্যার সমাধান বলে দিতে পারবে।

 

কাজিজাদেহ গিয়াসউদ্দিন জামশিদ কাশানির প্রশ্নগুলোর কোনো জবাব দিতে পারেননি। এবার কাজিজাদেহ গণিত বিষয়ের পাল্টা কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দেন জামশিদ কাশানির কাছে। কাশানি সবগুলো প্রশ্নের সঠিক জবাব দেন একে একে। এরপর কাজিজাদেহ প্রশ্ন করে জানতে পারেন যে এই বিজ্ঞ গণিতবিদের নাম গিয়াসউদ্দিন জামশিদ কাশানি। এ ঘটনার পর কাজিজাদেহ ও কাশানি পরস্পরের অন্তরঙ্গ বন্ধু হন।

 

এরপর কাজিজাদেহ সমরকন্দে পৌঁছেন। সেখানে তিনি জানতে পারেন যে সম্রাট উলুগ বেগ একটি মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন এবং এ জন্য মহাকাশ ও জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত তথ্যের একটি নতুন সারণী তৈরির চেষ্টা করছেন। তিনি তখন সম্রাটের কাছে গিয়ে বলেন, ‘এ কাজের জন্য এক উপযুক্ত ব্যক্তি রয়েছেন। খাটো সাইজের ওই ব্যক্তি জমিন থেকে আসমান পর্যন্ত প্রত্যেক ইঞ্চি দূরত্বের নানা দিক সম্পর্কে খুব ভালো ধারণা রাখেন।’

 

উলুগ বেগ এই মহান বিজ্ঞানীর কথা শুনে এক ব্যক্তিকে তার কাছে পাঠান এবং তাকে কাশান থেকে সমরকন্দে আসার আমন্ত্রণ জানান। এরপর সম্রাট ওই মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণের দায়িত্ব জামশিদ কাশানির ওপর ছেড়ে দেন।  

 

জামশিদ কাশানি তার ভাগ্নে মইনুদ্দিন কাশানিকে নিয়ে ৮১৯ থেকে ৮২২ হিজরিতে সমরকন্দে চলে আসেন। তিনি সমরকন্দ থেকে তার বাবার কাছে দু’টি চিঠি পাঠিয়েছিলেন।  এ দুই চিঠিতে সমরকন্দের জ্ঞানী-গুণি, জ্ঞান-বিজ্ঞানের অবস্থা ও শিক্ষা-কেন্দ্র সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল। সেখানকার সম্রাট উলুগ বেগ ও বিজ্ঞানীদের পারস্পরিক সুসম্পর্কের কথা জানা যায় এ দুই পত্র থেকে। এ ছাড়াও এ দুই চিঠি থেকে সে সময়কার সমরকন্দের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থা সম্পর্কেও অনেক কিছু জানা যায়। 

 

জামশিদ কাশানি যখন সমরকন্দে আসেন তখন তার বয়স ছিল প্রায় ত্রিশ বছর। উলুগ বেগের দরবারের অন্যান্য বিজ্ঞানীরা সমরকন্দে কাশানির জ্ঞানগত যোগ্যতার কঠিন পরীক্ষা নেন। তারা কঠিন যেসব বিষয়ের সমাধান জানতেন না সেসব বিষয়ে কাশানির কাছে সমাধান জানতে চান। তিনি সমরকন্দে তার সেই প্রথম দিনগুলোতেই এইসব জ্ঞানগত সমস্যার সমাধান দিয়েছিলেন। ফলে কাজিজাদেহ রুমির মত বড় বিজ্ঞানীও কাশানিকে নিজের চেয়েও বড় বিজ্ঞানী বলে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হন। এরপর থেকে জামশিদ কাশানি সব সময়ই সম্রাট উলুগ বেগের কাছে থাকতেন। উলুগ বেগও কাশানের এই অমূল্য রত্নের অসাধারণ প্রতিভার প্রশংসা করতেন।

 

জামশিদ কাশানি সমরকন্দে দুই বছর থেকেছিলেন। এ দুই বছরে তিনি বিজ্ঞান সম্পর্কিত অনেক সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাবার কাছে লেখা চিঠিতে তিনি এ বিষয়গুলোও তুলে ধরেন। যেমন, এসব বিষয়ের মধ্যে ছিল মসজিদের মেহরাবে বৃত্তাকার ছিদ্রের মধ্য দিয়ে সূর্যের আলো অতিক্রমের অবস্থা দেখে যে কোনো ঋতুতে আসরের নামাজের সময় নির্ধারণ করা, কিংবা প্রায় এক মিটার ব্যাসের অ্যাস্ট্রোল্যাব নির্মাণ যাতে নথিবদ্ধ ছিল টলেমির সারণিতে থাকা ১০২২ টি তারকার সারণী।

 

সমরকন্দে আসার পর কিছু দিন না যেতেই জামশিদ কাশানি হয়ে পড়েন এখানে নির্মিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞানী। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক বিজ্ঞানে নানা সাফল্য দেখিয়ে জামশিদ কাশানি সমরকন্দ বিশ্ববিদ্যালয়কে জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রাচ্যের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করেন। জামশিদ কাশানি সম্পর্কে আমরা আরও কথা বলব এ ধারাবাহিকের আগামী আসরে। আশা করছি তখনও আপনাদের সবার সঙ্গ পাব।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/১২