আগস্ট ১৪, ২০১৭ ১৩:৪৯ Asia/Dhaka
  • আদর্শ জীবনযাপন-৮

আত্মিক ও মানসিক রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে কুরআনের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবের কথা বলেছি আমরা। এর বাইরেও বিষন্নতা দূর করার ক্ষেত্রে বিয়ে করা এবং পরিবার গঠনের ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছে আল কুরআন। মানসিক বহু সমস্যা নিরসনের ক্ষেত্রে মানবীয় এই বন্ধনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে কুরআন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা -ডব্লিও এইচ ও- প্রতি বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষ্যে একটা শ্লোগান উপস্থাপন করে। তো বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে বিশেষ করে যান্ত্রিক জীবনের বিস্তারের ফলে এবং মানুষের সমকালীন জীবনে অস্থিরতা, উত্তেজনা বৃদ্ধির ঘটনায় হু এবছর মানে ২০১৭ সালের জন্য শ্লোগান দিয়েছে বিষন্নতা কেন্দ্রিক। শ্লোগানটি হলো: “বিষন্নতা! মুখ খোলো! কথা বলো আমার সাথে।“

বিষন্নতা মানুষকে একাকি নি:সঙ্গ করে তোলে। বিষন্নতার সঙ্গে বেদনা হতাশার সম্পর্ক সরাসরি। বিষন্ন লোকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো অন্যদের সঙ্গে কথাবার্তা বলা থেকে দূরে থাকা, নিজেকে গুটিয়ে রাখা। কারও সঙ্গেই কথা বলার কোনো আগ্রহ থাকে না তাদের মধ্যে। এই বিষন্নতার কারণে মানসিক অশান্তি, অস্থিরতা এবং ব্যক্তির কর্মক্ষমতার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এমনকি সহজ একটা কাজও তার পক্ষে আর করা হয়ে ওঠে না। কখনো কখনো পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এবং জীবন যাপনের অব্যাহত প্রক্রিয়ার ওপরও ভয়ংকর প্রভাব ফেলে। পরিস্থিতির চূড়ান্ত পরিণতিতে বিষন্নতায় আক্রান্ত অনেকেই আত্মহত্যা পর্যন্ত করে বসে। সাধারণত ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যেই এই দ্বিতীয় সমস্যাটা মানে আত্মহত্যার প্রবণতাটি বেশি দেখা যায়।

Image Caption

আজকাল অবশ্য অপরাপর বহু রোগের মতো বিষন্নতা রোগেরও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা রয়েছে কিংবা রয়েছে চিকিৎসাও। বিষন্ন রোগের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন প্রাণবন্ত ও হাসিখুশি থাকার স্বার্থে একটা আন্তরিক অথচ দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা, সেইসঙ্গে কথা বলা অর্থাৎ অন্যদের সঙ্গে সম্পর্ক ও যোগাযোগ গড়ে তোলা। মনোবিজ্ঞানী এবং সমাজ বিজ্ঞানীদের অনেকেই পরিবারের ভেতর এই বিষন্নতার ট্রিটমেন্ট রয়েছে বলে মনে করেন। তাঁদের মতে বিষন্নতা রোধ করা এবং প্রাণবন্ত ও হাসিখুশি থাকার মূল উপায় উপকরণ পরিবারের মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সামাজিক সংকট বিশেষজ্ঞ ডক্টর মাজিদ আবহারি বলেছেন: জীবন যাপন পদ্ধতি, পেশাগত পরিস্থিতি এবং জীবনযাপনের অবস্থার সঙ্গে বিষন্নতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তার মানে হলো ভুল জীবন পদ্ধতি, নি:সঙ্গতা, কোনঠাসা অবস্থা, চির কুমারত্ব, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা ইত্যাদি কারণে মানুষ বিষন্নতায় ভুগতে পারে।

এ ধরনের আত্মিক এবং মানসিক বিচিত্র রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে অন্যতম পদ্ধতি হিসেবে পবিত্র কুরআন বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হবার, পরিবার গঠন করার পরামর্শ দিয়েছে। মনোরোগ চিকিৎসকদেরও অনেকেই কুরআনের এই পরামর্শ অনুসরণ করার পক্ষে মত দিয়েছেন। মানসিক চাপ এবং তার পার্শ্চপ্রতিক্রিয়া নিরসনের একটি মৌলিকতম উপায় হলো বিয়ে।  যে-কোনো বিপর্যয়, সমস্যা ও সংকটের ওপর বিজয়ী হবার মৌলিক উপকরণ হলো বিবাহ। পবিত্র কুরআনে আদম সন্তানদের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে: ‘আল্লাহই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন একটি মাত্র প্রাণ থেকে এবং তারই প্রজাতি থেকে তার জুড়ি বানিয়েছেন, যাতে করে তার কাছে প্রশান্তি লাভ করতে পারে।‘

যে আয়াতটি আমরা মিউজিক বিরতির আগে শুনলাম সেখানে নারী পুরুষকে একই প্রজাতির বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেইসঙ্গে শান্তি ও সুখের উপকরণ হিসেবে স্ত্রী নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে।  একই প্রসঙ্গে কুরআনের সূরা রূমের একুশ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে , তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই জাতি থেকে সৃষ্টি করেছেন স্ত্রীগণকে, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো  এবং তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। অবশ্যই এর মধ্যে বহু নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্য যারা চিন্তা- ভাবনা করে।

Image Caption

প্রকৃতপক্ষে ব্যক্তির মাঝে প্রাকৃতিক প্রফুল্লতা ও আনন্দের উপাদান উপকরণ কুরআনের একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। আল্লাহ নিজেই মানুষের জন্য তাকে আনন্দ ও উদ্দীপনার কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। এর কারণ হলো বিয়ের ফলে স্বামী স্ত্রীর ইমান বৃদ্ধি পায় এবং সেইসঙ্গে তাদের মেধার বিকাশ ঘটে,  অন্তরাত্মায় আধ্যাত্মিকতার সুষমা সৃষ্টি হয়।

অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন ও যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদান হলো পরিবার গঠন করা। কথাবার্তা বলা, বিষন্নতা ও অবসাদ থেকে মুক্তি, দাম্পত্য সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়ার সবোর্ত্তম উপায় হলো বিয়ে করা। একজন বিবাহিত লোক অনৈতিকতার বিস্তার রোধ করতে সহযোগিতা করতে পারেন। কেননা একজন লোক যখন তার স্ত্রী কিংবা স্বামীর সঙ্গে দাম্পত্য বন্ধনে প্রতিশ্রুত হন তখন তিনি চেষ্টা করেন নৈতিক স্খলনধর্মী প্রবণতা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে আসতে। বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ডা: কারায়ি মোকাদ্দাম বলেছেন: যে সমাজে অবিবাহিতের সংখ্যা বেশি সেই সমাজে লাগামহীন বেলেল্লাপনা, মাদকাসক্তি, ভবঘুরের সংখ্যা অনেক বেশি। বিয়ের মাধ্যমে দাম্পত্য সম্পর্কে আবদ্ধ হলে জীবনে যদি প্রশান্তি নেমে আসে তাহলে মানসিকভাবে বিবাহিত নারী পুরুষ সুখে শান্তিতে বাস করতে পারে। এ কারণেই বিষন্নতার আরেক পরিণতি হিসেবে চিরকুমারত্ব বা নিংসঙ্গতার কথা বলা হয়।

সমাজবিজ্ঞানী ডা: সায়িদ মায়িদফার বলেছেন, অবিবাহিত জীবনের ফলে ব্যক্তি সমাজ ও সামাজিকতা থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়। এ কারণেই একত্রে বসবাস, সহাবস্থান, অপরকে মেনে নেওয়ার মতো গুণগুলো অবিবাহিতের জীবনে কমে যেতে থাকে। এরকম পরিস্থিতি একটা সমাজের জন্যও খুবই মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনতে পারে। পক্ষান্তরে বিবাহিত জীবনের ফলে পারস্পরিক হৃদ্যতা সৃষ্টি হয়, সহাবস্থানের শিক্ষা লাভ করে এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ নিজের ভেতরে গ্রহণ করার প্রবণতা তৈরি হয়। এর ফলে সমাজের পাশাপাশি দেশেরও উন্নয়ন ও অগ্রগতি সূচিত হয়।

Image Caption

পরিবারের ইতিবাচক ভূমিকা এখানেই যে এর ফলে একটা সহৃদয় সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয় এবং মানসিক সুস্থতার নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করে। এর পাশাপাশি মানসিক চাপ বা অস্থিরতা প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও পরিবার ব্যবস্থার ব্যাপক ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে অন্যদের সঙ্গে যাদের যোগাযোগ বা সম্পর্ক তেমন নেই তারা যাদের সামাজিক যোগাযোগ বেশি তাদের তুলনায় বেশি মারা যান। এদিক থেকে একটি পরিবার-যা কিনা নৈকট্য ও আন্তরিকতার মূল উৎস- তার সদস্যদের সম্মান,মর্যাদা ও নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে অনেক বেশি কার্যকর।

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী ও আনন্দ বিশেষজ্ঞ ড্যানিল গিলবার্ট বলেছেন: “পরিবার থাকায় বেশ আনন্দিত বোধ করছি। আনন্দিত বন্ধু বান্ধব থাকায়। আরও যা যা মনে হচ্ছে আমাকে আনন্দিত করছে তার মধ্যে রয়েছে বৃহৎ পরিবারে পৌঁছার উপায় এবং বেশি বেশি বন্ধুবান্ধব”। বিয়ে শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে তো বটেই ব্যক্তিগত ও সামাজিক দিক থেকেও প্রশান্তির উপায়। বিয়ে না করার কারণে এবং স্বাভাবিক প্রবৃত্তিগত যৌন অসন্তুষ্টির কারণে মানবীয় ভারসাম্য বিনষ্ট হয়। অন্যভাবে বলা যেতে পারে বিয়ে না করলে মানুষের ভেতর এক ধরনের অবসাদ কাজ করে, পাপাচার প্রবণতা কাজ করে। অথচ বিয়ে করলে বিবাহিত লোকটি সামাজিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়, দৃঢ় আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে, নিজের ভেতর এক রকম দায়িত্ববোধ জেগে ওঠে।বিবাহিত পুরুষ যেন নতুন করে ব্যক্তিত্ববান হয়ে ওঠে নিজের সকল মেধা ও প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে স্ত্রী পরিবারের সমস্যা সমাধানে প্রত্যয়ী হয়ে ওঠে।  

Image Caption

বিয়ের ফলে মানসিক প্রশান্তির বিষয়টিকে পবিত্র কুরআন রহমত হিসেবে উল্লেখ করেছে। প্রকৃতপক্ষে মানব সমাজের শক্ত কাঠামো তৈরির মৌলিক উপকরণ বা ভবন তৈরির মাল-মশলা হলো এই বিয়ে। বিয়ের সবচেয়ে দর্শনীয় দিকটি হলো ভবঘুরে আর সমাজ বিচ্ছিন্নদেরকে সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ করে তোলা। বিয়ের ফলে যে প্রেম সৃষ্টি হয় তা একটা আশা, একটা স্বপ্ন, একটা ভবিষ্যত চিন্তা জাগিয়ে তোলে বিবাহিতের চিন্তা চেতনায়। আরও যে ইতিবাচক দিকটি লক্ষ্য করা যায় তা হলো পরস্পরের প্রতি রহমত, কল্যাণ ও মঙ্গলজনক দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি হয় বিয়ের ফলে। এই কল্যাণদৃষ্টি থেকেই পরিবারের অভ্যন্তরে কথাবার্তা বলাসহ বিচিত্র তথ্য বিনিময়ের পরিবেশ তৈরি হয়। আর এ থেকেই পরিবারে নেমে আসে আনন্দঘন একটা আমেজ। সেই পরিবারই সবচেয়ে উন্নত যে পরিবারের সদস্যরা একে অপরকে ভালোবাসে এবং একত্রে বসে কথাবার্তা বলে আনন্দ পায়।

আজকাল যুবকদের বেশিরভাগই বিয়ের দায়িত্ব থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখে আর্থিক সংকটের কথা বলে। অথচ পবিত্র কুরআন সুস্পষ্টভাবে বলেছে বিয়ের মধ্যেই রয়েছে রুটি রুজি ও বরকত। বলা হয়েছে: “তোমাদের মধ্যে যারা একা ও নি:সঙ্গ এবং তোমাদের গোলাম ও বাঁদীদের মধ্যে যারা সৎ ও বিয়ের যোগ্য তাদের বিয়ে দাও! যদি তারা গরীব হয়ে থাকে,তাহলে আল্লাহ আপন মেহেরবানীতে তাদেরকে ধনী করে দেবেন, আল্লাহ মহান, প্রাচুর্যময় ও সর্বজ্ঞ”।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/১৪/ই-৮