আদর্শ জীবনযাপন-১১
মানুষ তার সমশ্রেণীর কাউকে কিংবা দ্বীনী ভাইকে সাহায্য করলে সেই কল্যাণটা নিজের দিকেই ফিরে আসে। অর্থাৎ অন্যের কল্যাণ করলে মূলত নিজেরই কল্যাণ হয়। কারণটা হলো যিনি কারো উপকার করছেন বা কারও কল্যাণার্থে আন্তরিকতার সাথে কাজ করেন তার মাধ্যমে আসলে সেই ব্যক্তি নিজেরই ব্যক্তিত্বকে পরিপূর্ণতা দান করেন।
আপনি অবশ্যই এই সত্যটি স্বীকার করবেন যে অন্যের উপকার করা একটা বদান্যতা, একটা অসাধারণ ঔদার্য ও গুণ। আমাদের সমাজের বহু লোক গুরুত্বপূর্ণ এই মানবিক বৈশিষ্ট্য থেকে বঞ্চিত এমনকি অপরের দু:খ কষ্ট উপলব্ধি করারও ক্ষমতা রাখে না। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে যে লোক মানুষ ছাড়াও অন্যান্য প্রাণীর উপকার করাকে মানে জন্তু-জানোয়ার,পশুপাখি, গাছপালার সেবা করাকে নিজের একটি মৌলিক দায়িত্ব বলে মনে করে তারা অনেক বড় মাপের মানুষ হিসেবে পরিগণিত। আপনারা জানেন, মানুষের মৌলিক প্রয়োজনীয়তার ওপর মাজলু একটি পিরামিড ধারণা দিয়েছেন। যারা নিম্ন পর্যায়ের চাহিদা বা প্রয়োজনীয়তার ওপর দৃষ্টি দেয় এবং কেবল নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করে, তাদের বেশিরভাগই হৃদরোগ, মানসিক রোগসহ ভাস্কুলার বা রক্তনালী সংক্রান্ত রোগে আক্রান্ত হয়।
অন্যদিকে যারা অপরের সেবায় নিয়োজিত থাকে, পরোপকারী তারা সবসময় সুস্থ জীবনযাপন করে, আনন্দঘন জীবনযাপন করে। অন্যদের কাছে তাদের মূল্যায়ন ও গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। তাহলে আমরা কেন এই মহৎ গুণটি অর্জন করবো না? কেন আমরা মনোদৈহিক এই প্রশান্তি লাভ করবো না? সুতরাং আমরাও চেষ্টা করবো পরোপকার করার মতো, অপরের সেবা করার মতো মানবীয় অমূল্য গুণটি অর্জন করার। অবশ্য অন্যের সাহায্য-সেবা করার বিচিত্র মানদণ্ড রয়েছে। বিভিন্নভাবে মানুষের সেবা করা যায়। যেমন কেউ অর্থাভাবে দিন কাটাচ্ছে,তাকে আর্থিকভাবে সাহায্য করা যেতে পারে।
বিরতির আগে আমরা সেবা ও সহযোগিতা করার বিভিন্ন উপায় ও ক্ষেত্র নিয়ে কথা বলছিলাম। ধরা যাক, কেউ উল্টাপাল্টা দর্শনে বিশ্বাসী হয়ে ভুল জীবনযাপন করছে, তাকে চিন্তা-চেতনা দিয়ে সঠিক দর্শনের জ্ঞান দিয়ে সাহায্য করা যেতে পারে। আবার কল্যাণময় ও সৎকাজে একে অপরকে সাহায্য করা যেতে পারে। শত্রুদের মোকাবেলায়ও সাহায্য করা যেতে পারে। ধরা যাক দুজনের মাঝে কিংবা দুই দলের মাঝে কোনো কারণে সম্পর্কের টানাপড়েন যাচ্ছে। এক্ষেত্রে দুজনের মাঝে কিংবা দুই দলের মাঝে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে দেওয়ার ক্ষেত্রেও সাহায্য করা যেতে পারে। এভাবে বিচিত্রভাবে সেবা ও সহযোগিতা করার ক্ষেত্র রয়েছে। অপরকে সাহায্য করার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। পবিত্র কুরআনে পরোপকারের ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কয়েক জায়গায় একেবারে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণাই করা হয়েছে যে,”আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অনুগ্রহ প্রদর্শনকারীদেরকে ভালোবাসেন।"
কুরআনে কারিম যে বিষয়টির প্রতি বেশি গুরুত্ব দিয়েছে তা হলো আপনি যদি কারও দিকে সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন অর্থাৎ কারো সেবা করেন বা উপকার করেন,সেটা আসলে অন্যের উপকার নয় নিজেরই উপকার করলেন।সূরা বনি ইসরাইলে বলা হয়েছে: "দেখো,তোমরা ভালো কাজ করে থাকলে তা তোমাদের নিজেদের জন্যই ভাল ছিল”। তার মানে মানুষ তার সমগোত্রীয়কে কিংবা দ্বীনী ভাইকে যে সাহায্য সহযোগিতা করে তা প্রকৃতপক্ষে সাহায্যকারীর নিজের ভাণ্ডেই জমা হয়। কারণ সেবাকারী ব্যক্তি ওই সাহায্য সহযোগিতা করে নিজের ব্যক্তিত্বকে পরিপূর্ণ করে তোলে। এভাবেই ব্যক্তির অস্তিত্ব পূর্ণতায় পৌঁছার পথ সুগম হয়।
মানুষের সেবা ও সহযোগিতা করা এমন একটি গুণ যা সবসময়ই শুভ ও কল্যাণ বয়ে আনে। আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিষয়টি ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি বিচিত্র বালা মুসিবত দূর হয়ে যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো সেবার প্রতিদান হিসেবে আল্লাহর কাছে প্রিয় হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়। আর কে না জানে আল্লাহর প্রিয় হওয়া মানেই তাঁর দয়া ও রহমত লাভের পথ সুগম হয়ে যায়। দ্বীনী শিক্ষা তো এরকম যে, তুমি যদি কোনোদিন নফল রোজা রাখো এবং কেউ যদি তোমাকে তার বাসায় দাওয়াত করে, তাহলে বলো না রোজা রেখেছো, তুমি বরং তার দাওয়াত গ্রহণ করো! তার বাসায় যাও এবং খাও! আল্লাহ তোমাকে সেই রোজার সওয়াব দান করবেন। কেননা এ কাজের মাধ্যমে তুমি একজন মুসলমানের অন্তরকে আনন্দে ভাসাতে সহযোগিতা করেছো।
এই প্রসঙ্গে রাসুলে খোদা (সা) বলেছেন: তুমি যদি আল্লাহর সাহায্য পেতে চাও তাহলে মানুষকে সাহায্য করো! যাই হোক শ্রোতাবন্ধুরা! আশা করি আপনারা কিছুটা হলেও অপরের সেবা করা বা অপরকে আনন্দিত করার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছেন। আসলে মানুষের সেবা ও সহযোগিতা করা এমন একটি গুণ যা সবসময়ই শুভ ও কল্যাণ বয়ে আনে। আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিষয়টি ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি বিচিত্র বালা মুসিবত দূর হয়ে যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো সেবার প্রতিদান হিসেবে আল্লাহর কাছে প্রিয় হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়। আর কে না জানে আল্লাহর প্রিয় হওয়া মানেই তাঁর দয়া ও রহমত লাভের পথ সুগম হয়ে যায়। দ্বীনী শিক্ষা তো এরকম যে, তুমি যদি কোনোদিন নফল রোজা রাখো এবং কেউ যদি তোমাকে তার বাসায় দাওয়াত করে, তাহলে বলো না রোজা রেখেছো, তুমি বরং তার দাওয়াত গ্রহণ করো! তার বাসায় যাও এবং খাও! আল্লাহ তোমাকে সেই রোজার সওয়াব দান করবেন। কেননা এ কাজের মাধ্যমে তুমি একজন মুসলমানের অন্তরকে আনন্দে ভাসাতে সহযোগিতা করেছো। এই প্রসঙ্গে রাসুলে খোদা (সা) বলেছেন: তুমি যদি আল্লাহর সাহায্য পেতে চাও তাহলে মানুষকে সাহায্য করো!
ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিস এরকম: রাসুলে আকরাম (সা) বনি নাজিরের ইয়াহুদিদের উপর বিজয়ের দিন আনসারদের বলেছিলেন: তোমরা কি তোমাদের ঘরবাড়ি, তোমাদের মাল-সামানা মুহাজিরদের সঙ্গে ভাগ করতে প্রস্তুত আছো? কিংবা এইসব গনিমতের ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে শরিক হতে রাজি আছো? নাকি তোমরা চাও এইসব মালামাল কিংবা তোমাদের ঘরবাড়ি তোমাদেরই থাকুক কিংবা এইসব গনিমত থেকে কোনো কিছুই তোমাদেরকে দেয়া না হোক? উত্তরে আনসাররা বলেছিলো: আমরা আমাদের ঘরবাড়ি এবং মালামাল তো তাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করবোই। সেইসঙ্গে এইসব গনিমতের অংশ পাবার কথা ভাবিও না। উপরন্তু আমরা মুহাজিরদেরকে আমাদের ওপর অগ্রগণ্য বলে মনে করি।
এরকম পরিস্থিতিতে সুরা হাশরের নয় নম্বর আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল। সেখানে তাদের বড় মনের পরিচয় প্রদানকে প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। “যারা এসব মুহাজিরদের আগমনের পূর্বেই ঈমান এনে দারুল হিজরাতে বসবাস করছিলো। তারা ভালবাসে সেইসব লোকদের যারা হিজরাত করে তাদের কাছে এসেছে। যা কিছুই তাদের দেওয়া হোক না কেন এরা নিজেদের মনে তার কোন প্রয়োজন পর্যন্ত অনুভব করে না এবং যত অভাবগ্রস্তই হোক না কেন নিজেদের চেয়ে অন্যদের অগ্রাধিকার দান করে। মূলত যেসব লোককে তাদের মনের সংকীর্ণতা থেকে রক্ষা করা হয়েছে তারাই সফলকাম”।
পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে সাহায্য ও সেবা বলতে কেবল খাওয়া-পরা কিংবা রুটি রুজির ক্ষেত্রে সহযোগিতাকেই বুঝায় না কেননা বহুলাংশেই এসব ক্ষেত্রে মানুষের সাধ্য খুবই সীমিত এবং মানুষের ক্ষমতার বাইরে বলা চলে। বরং এসবের পরিবর্তে মানুষ তার প্রতিপক্ষকে একটি সুন্দর কথা বলে কিংবা যথাযথ নির্দেশনা দিয়েও সাহায্য সহযোগিতা করতে পারে। যার ফলে মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা থেকে একজন মানুষ মুক্তি পেতে পারে। সুরা নিসার পাঁচ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: "আর তোমরা যে ধন-সম্পদেকে আল্লাহ তোমাদের জীবন ধারণের মাধ্যমে পরিণত করেছেন,তা নির্বোধদের হাতে তুলে দিয়ো না।তবে তাদের খাওয়া পরার ব্যবস্থা করো এবং সদুপদেশ দাও"।
একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে: বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক তাঁর কোনো একটি ক্লাসে পাঠ্য বিষয়ের বাইরে তাঁর নিজের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দু:খ-কষ্ট ও তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা ছাত্রদের সামনে তুলে ধরতে পারেন। এভাবে ব্যক্তি জীবনের কষ্টকর অভিজ্ঞতার কথা বলে ছাত্রদের প্রতি সহজেই সহানুভূতি প্রকাশ করতে পারেন এবং সমব্যথী হতে পারেন। এতে করে ছাত্ররা যখন দেখবে যে তাদের শিক্ষক জীবনে কত কষ্ট সহ্য করেছেন তাহলে নিজের সমস্যার ব্যাপারে সে বা তারা আর খুব বেশি উদ্বিগ্ন হবে না বরং প্রশান্তি বোধ করবে।
আমরা যদি আল্লাহর নবীদের জীবন চরিতের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাবো,তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি ছিল মানুষের সমস্যার সমাধান দেওয়া। পবিত্র কুরআনে এসেছে একদল লোক জুলকারনাইনের কাছে এসেছিল। তারা বলেছিল, ইয়াজুজ ও মাজুজের গোষ্ঠি তাদেরকে খুব বিরক্ত করছে। সুতরাং আপনি একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দিন যাতে আমাদের লোকেরা ওই ইয়াজুজ ও মাজুজের অত্যাচার থেকে রক্ষা পায়। জুলকারনাইনও তাদের কথা অনুযায়ী দেয়াল তৈরি করে দিয়েছিলেন। পবিত্র কুরআনের আরও এক জায়গায় হযরত মুসা এবং হযরত হারুনের উদ্দেশে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন: হে মুসা! মিসরে নিজের কওমের জন্য কতিপয় গৃহের সংস্থান করো!
হযরত মুসা (আ)ও হযরত শোয়াইব (আ) এর ছাগলগুলোকে পানি খাওয়াতেন, মানুষের জন্য প্রাচীর নির্মাণ করে দিতেন এবং মানুষের জন্য ঘরবাড়ি তৈরি করে দিতেন। সুরা মায়েদায় যেমনটি আল্লাহ বলেছেন: "নেকি ও আল্লাহভীতির সমস্ত কাজে সবার সাথে সহযোগিতা করো এবং গুনাহ ও সীমালংঘনের কাজে কাউকে সহযোগিতা করো না! আল্লাহকে ভয় করো"। এ প্রসঙ্গে রাসুলে খোদা (সা) বলেছেন: মুসলমান ভাইয়ের প্রয়োজন মেটানো কিংবা একটি পরিবারকে খুশি করা মাসজিদুল হারামে দুই মাস এতেকাফ করারর সওয়াবের চেয়েও উত্তম।
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/৮