আদর্শ জীবনযাপন-১২
অন্যদের জন্য কাজে আসা বা উপকারী হতে পারা প্রয়োজনীয় ভালোবাসা নিশ্চিত করার একটা উপাদান। এই উপাদানটি আমাদের মানসিক সুস্থতার সহায়ক। আমাদের সেবা ও সহযোগিতামূলক আন্তরিক আচার আচরণে তুষ্ট হয়ে কেউ যখন দোয়া করে সেটাই হবে ভালোবাসার ভাণ্ডার পূর্ণ করার মৌলিক পদক্ষেপ।
একটা গল্প দিয়ে এই সেবা বা দানের গুরুত্বের বিষয়টি তুলে ধরা যাক। একদিন এক লোক হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়লো। নিদারূণ যন্ত্রণায় তড়পাতে তড়পাতে সে তার ছেলেকে ডেকে পাঠালো। ছেলেকে বললো: হে আমার সন্তান! আমার মৃত্যুর পর ওই জমিন এবং এই বাগান অভাবগ্রস্ত এবং ইয়াতিমদের দান করে দিও যাতে ওই দানের আলোয় আমার আখেরাতের পথের সকল অন্ধকার দূর হয়ে যায়।
খোদার রহমতে এরপর ওই বাবা মানে অসুস্থ লোকটির অবস্থার উন্নতি হতে লাগলো এবং সুস্থ হয়ে গেল। একরাতে সে ওই বাগানে যাবার লক্ষ্যে ঘর থেকে বের হলো। ছেলেকে বললো একটা বাতি নিয়ে তাকে যেন সঙ্গ দেয় এবং বাগানে নিয়ে যায়। ছেলে তাই করলো। বাবার পিছু পিছু বাতি নিয়ে হাঁটতে লাগলো। কিন্তু চেরাগের আলো বাবার পথ চলার ক্ষেত্রে তেমন একটা কাজে এলো না। বাবা তাই বললো:হে আমার সন্তান!তুমি তো আমার পেছনে পেছনে আসছো!চেরাগের আলো তো আমার পথে তেমন পড়ছে না। তোমার পথটাই শুধু আলোকিত হয়।
মিউজিকের আগে বাবার কথাটা ছিল এরকম: হে আমার সন্তান!তুমি তো আমার পেছনে পেছনে আসছো!চেরাগের আলো তো আমার পথে তেমন পড়ছে না। তোমার পথটাই শুধু আলোকিত হয়। বাবার কথা শুনে ছেলে বললো: বাবা! তোমার মৃত্যুর পরে দান খয়রাত করা এরকম চেরাগের মতোই। তবে তার আলো আমার জন্য উপকারী, তোমার জন্য যদিও খুব কমই উপকারী। কেননা তোমার ওই দান এমন সম্পদের অংশ যা এই পৃথিবী তোমার কাছ থেকে ফেরৎ নিয়ে আমাকে দান করেছে। কেননা তুমি এমন সম্পদ থেকে দান করছো যা তোমার জন্য আর উপকারী নয় কিংবা তুমি আর সেই সম্পদ ব্যবহার করতে পারবে না। উত্তম হলো সেটাই যা তুমি তোমার জীবদ্দশায় ব্যবহার করা অবস্থায় তার মায়া ত্যাগ করে আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করো!
কুরআনে কারিমে এই বিষয়টিকে খুব সুন্দর করে বর্ণনা করা হয়েছে: "হে ঈমানদারগণ! আমি তোমাদের যা কিছু ধন-সম্পদ দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করো!সেই দিনটি আসার আগে,যেদিন কেনাবেচা চলবে না,বন্ধুত্ব কাজে লাগবে না এবং কারো কোন সুপারিশও কাজে আসবে না"।

ইবাদাত যে আঙ্গিকে যেভাবেই হোক না কেন সেটা মানসিক সুস্থতার অন্যতম একটা উপাদান। এই ইবাদাত করতে পারার সামর্থ্য বা তৌফিক জীবনের একটি নেপুণ্য বা সার্থকতা বলতে হবে। গবেষকদের গবেষণায় দেখা গেছে, ধর্মীয় আচার ব্যবহার মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে। আধুনিক মনোবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণায়ও এই সত্যটি উঠে এসেছে যে, কিছু কিছু কাজ করলে মানুষের ভেতরটা অনেক বেশি শক্তিশালী হয়। বিশেষ করে মানসিক প্রশান্তি, অন্তরের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য এবং প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। এ নিয়ে আরও কথা বলবো খানিক মিউজিক বিরতির পর।
আপন ধন সম্পদ থেকে অন্যদের দান খয়রাত করার একটা ইতিবাচক দিক রয়েছে। সেটা হলো কেউ যদি আন্তরিকতার সঙ্গে কাউকে কিছু দান করে ওই দানের কল্যাণে দানকারীর মানসিকতার ওপর ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। যেমন দাতার মন প্রশান্তি ও সুস্থতা লাভ করে। একইসঙ্গে যাকে দান করা হলো সেই গ্রহীতার মনও প্রশান্তিতে ভরে যায়। আর দাতা-গ্রহীতার প্রশান্তির ছায়া পড়ে পুরো সমাজের ওপর। ফলে সমাজেও তার একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। দানকারী ব্যক্তি এই দান করার মধ্য দিয়ে নিজের প্রশান্তি ও আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলার পাশাপাশি সমাজেও তার প্রভাব ফেলে। সমাজে একটা আত্মবিশ্বাস দানা বেঁধে ওঠে। বেশি বেশি সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহানুভূতির একটা চমৎকার পরিবেশও তৈরি হয়।
প্রকৃতপক্ষে অন্যের উপকারে আসাটা ভালোবাসা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। যে উপাদানটি আমাদের মানিসিক স্বাস্থ্যকে সুস্থ ও সঠিক রাখার ব্যাপারে খুবই সাহায্য করে। আমরা আমাদের আচার আচরণের জন্য যখন অন্যের কাছ থেকে দোয়া পাবো তখন বুঝতে হবে ভালোবাসার ভাণ্ডার পূর্ণ করার পথে যথার্থই পদক্ষেপ নিতে পেরেছি। ভালোবাসার এই ভাণ্ডার অপূর্ণ থাকলে বিষন্নতা পেয়ে বসে এবং উৎসাহ উদ্দীপনা কমে যায়। সুতরাং দান হচ্ছে আমাদের সজীবতা, আনন্দ উদ্দীপনার নেপথ্য শক্তি।
আমরা বলেছিলাম যে ভালোবাসার ভাণ্ডার অপূর্ণ থাকলে বিষন্নতা পেয়ে বসে এবং উৎসাহ উদ্দীপনা কমে যায়। সুতরাং দান হচ্ছে আমাদের সজীবতা, আনন্দ উদ্দীপনার নেপথ্য শক্তি। এখন যদি প্রশ্ন করা হয় আপনি কিংবা আমি নিজে দান করার মানসিকতা কতোটা পোষণ করি? উত্তরটা যে যার মতো ভাবুন। সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া না গেলে নিজেকে সেই মানের তৈরি করে নেওয়ার চেষ্টা করুন।
সহানুভূতি বা দান করার মাধ্যমে ব্যক্তি আর নিজের মধ্যে থাকে না। আত্মকে উত্তীর্ণ করে মানবীয় বিকাশের স্বাদ উপলব্ধি করতে পারে। বিশেষ করে বিত্ত-বৈভব,ধন-সম্পদ দান করার মধ্য দিয়ে অহংকার বোধ কাটিয়ে উঠে একটা ইতিবাচক দীপ্তিতে ভরে ওঠে অন্তর। আর এই দীপ্তিই ব্যক্তির সুস্থতা নিশ্চিত হওয়ার অন্যতম পদক্ষেপ। হযরত ফাতেমা (সা) এবং তাঁর সন্তানেরা যখন তাদের সবার খাবারগুলো একটানা তিনদিন অভাবগ্রস্তদের দান করেছিলেন, কুরআন তাঁদের সেই সুন্দর ও নজিরবিহীন মহতি কাজের প্রশংসা করেছে এবং সবাইকে এই দিকটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে যে তারা “ভীষণ পছন্দ করা সত্ত্বেও নিজেদের প্রিয় খাবারগুলোকে অসহায়, ইয়াতিম ও বন্দিদেরকে খাইয়েছে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তারা এ কাজ করে, কোনোরকম প্রতিদান কিংবা কৃতজ্ঞতা প্রাপ্তির আশা করে না”।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেসব ইবাদাত করার কথা বলেছেন দান তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। তার মানে দাঁড়ায় দানটা ওয়াজিবের পর্যায়ে পড়ে, যেমন জাকাত-খুমুস দেওয়া কিংবা স্বেচ্ছায় দান করা বা মুস্তাহাব হিসেবে দান করা। যেভাবেই দান করা হোক না কেন সেসব দানের উদ্দেশ্য হলো বঞ্চিত অসহায়ের সেবা করা, ইয়াতিমদের সম্মান করা এবং এরকম আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে দানের অর্থ-সম্পদ ব্যবহার করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। সম্পদ থেকে দানের ইতিবাচকতা তুলে ধরে পবিত্র কুরআন বহু জায়গায় দান করার ব্যাপারে ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। এটা কুরআনের প্রেরণাদায়ক ও শিক্ষামূলক নীতিমালার অংশ। কুরআন বলেছে যত বেশি দান তত বেশি কল্যাণ।
পবিত্র কুরআনের সূরা আলে-ইমরানের বিরানব্বুই নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: "তোমরা নেকি বা কল্যাণ অর্জন করতে পারবে না যতক্ষণ না তোমাদের প্রিয় বস্তুগুলো-আল্লাহর পথে-ব্যয় করবে। আর তোমরা যা -কিছু ব্যয় করবে আল্লাহ সে সম্পর্কে ওয়াকিফহাল”। আল্লাহর পথে ব্যয় বা দান করার উদাহরণ হলো নদী থেকে বালতি দিয়ে জল তোলার মতো। যতই বালতি পূর্ণ করে জল নেওয়া হোক না কেন সঙ্গে সঙ্গেই জল আবার কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়। সূরা সাবা’র উনচল্লিশ নম্বর আয়াতে এসেছে: "হে নবী! তাদেরকে বলো,“আমার রব তার বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে চান মুক্ত হস্তে রিযিক দান করেন এবং যাকে চান রিযিক সংকুচিত করে দেন। যা কিছু তোমরা দান করে দাও তার জায়গায় তিনি তোমাদের আরো দেন,তিনিই সর্বোত্তম রিযিকদাতা।“
একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হলো পবিত্র কুরআন সবসময় মানুষের ব্যক্তিত্বকে সম্মান করেছে এবং করতে বলেছে। যারা সত্যিকারের অসহায়,অভাবগ্রস্ত তাদেরকে এমনভাবে দান করতে হবে যাতে সমাজে তাদের সম্মান, মর্যাদা ক্ষুন্ন না হয়। অন্যদিকে দানকারীকে ব্যাপক পুরস্কার দেওয়া হবে বলে কৃতজ্ঞ থাকার কথা বলা হয়েছে। সেইসঙ্গে সমাজে যে অভাবগ্রস্ত লোকজন আছে, অসহায়, বঞ্চিত লোকজন আছে তাদেরকে দান করতে পারাকে আধ্যাত্মিক ও আত্মিক উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। ব্যক্তির সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় দান করার কথা বলা হয়েছে গোপনে।
দানের একটা নীতিমালা রয়েছে। কুরআনের ভাষ্য অনুসারে এতো বেশি সংকীর্ণ দৃষ্টি সম্পন্ন হওয়াও ঠিক যাতে আশেপাশের লোকজনের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়তে হয়। আবার এতোবেশি মুক্তহস্ত হওয়াও ঠিক নয় যাতে নিজেই আবার অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়তে হয়। সূরা বনি ইসরাইলের উনত্রিশ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: নিজের হাত গলায় বেঁধে রেখো না এবং তাকে একেবারে খোলাও ছেড়ে দিয়ো না,তাহলে তুমি তিরষ্কৃত ও অক্ষম হয়ে যাবে"। দানের ব্যাপারে কুরআনের আরও একটি নীতিমালার উল্লেখ করে পরিসমাপ্তি টানবো আজকের আসরের: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা দানের কথা বলে বেড়িয়ে ও কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান খয়রাতকে সেই ব্যক্তির মতো নষ্ট করে দিয়ো না যে নিছক লোক দেখাবার জন্য নিজের ধন-সম্পদ ব্যয় করে”।
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/৯