আদর্শ জীবনযাপন-১৩
জি আমরা অপরের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি ও উন্নয়নের উপায় নিয়ে কথা বলছিলাম। সম্পর্ক উন্নয়নের একটি মৌলিক নীতি এবং যার ব্যাপক প্রভাব পড়ে সম্পর্কের ওপর তা হলো বুদ্ধিবৃত্তিক এবং যৌক্তিক আচরণ করা। আপনি যাঁর সঙ্গে কথা বলছেন তার দৃষ্টিভঙ্গি যদি আপনার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে না মেলে তাহলে আপনাকে সহনশীল হতে হবে।
এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। তার সঙ্গে সদয়, সহানুভূতিশীল এবং বিনয়ী আচরণ করতে হবে। অযথা রেগে যাওয়া কিংবা যুক্তিবিবর্জিত আচরণ করা মোটেই ঠিক হবে না।
আপনি আপনার জীবনে এরকম লোকেরও সম্মুখিন হয়ে থাকবেন হয়তো যার আচার আচরণ আপনার জন্য একেবারেই বিস্ময়কর ও অনাকাঙ্ক্ষিত কিংবা আপনার উপলব্ধি বা চিন্তারও বাইরে। আপনি তার আচরণকে হয় অশোভন মনে করেছেন কিংবা শিশুসুলভ ভেবেছেন। এও হতে পারে যে আপনি ওই লোকের আচরণকে বা কাজকে কোনো যুক্তিতেই মেনে নিতে পারেন নি। প্রকৃতপক্ষে এমন বহু আচরণ করা হয় যেসব আপনার জন্য তিরষ্কারের শামিল। আপনি সেইসব আচরণের মুখোমুখি হলে স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রতিক্রিয়া আপনার মাঝে কাজ করে। সেই প্রতিক্রিয়া কখনো বেশ কঠোরই হয় আবার কখনো হালকাও হতে পারে।
অশোভন বা অপ্রত্যাশিত বিরূপ আচরণের প্রতিক্রিয়া কঠোর কিংবা নরম হবার কারণ হলো আচরণকারী নিজে। কোনো ব্যক্তি যদি আমাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বাসের বিপরীত আচরণ করে তাহলে আমাদের প্রতিক্রিয়াটা একটু কঠোরই হয়ে যায়। এ ধরনের আচরণকারী লোকেরা চায় সবাই তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বাসের অনুকূল আচরণ করুক। অবশ্য সেরকম হলে নিরাপদ একটা অনুভূতি প্রতিষ্ঠায় সুবিধা হয়। কিন্তু সমস্যা হলো সবাই কি আমাদের বিশ্বাসে বিশ্বাসী? সবাই কি আমাদের মতোই আচরণ করে? কিংবা সকলের কি উচিত আমাদের মতোই আচরণ করা? না। কেননা বিশ্বের প্রতিটি মানুষেরই নিজস্ব একটা দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, রয়েছে তার আচরণগত বৈশিষ্ট্যও। সুতরাং একথা বলার কোনো সুযোগ নেই যে আমরা তো ভীষণ শক্তিশালী তাই অন্যদেরকেও আমরা আমাদের আদর্শ ও চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন করে ফেলবো।
এ বিষয়ে মনোবিজ্ঞানীদের পরামর্শ হলো: এ কথা মেনে নিতেই হবে যে আমাদের মতো অন্যরাও আছে। বিশ্বের মাত্র অর্ধেকটা আমাদের জন্য এটাও মেনে নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। আমরা যেরকম আশা করি অন্যরাও আমাদের মতো হয়ে যাক একইভাবে অন্যরাও তো সেরকমই ভাবে। তারাও প্রত্যাশা করে আমরা যেন তাদের মতো হয়ে যাই। সুতরাং আমাদের দেখতে হবে যে লোকজনের চিন্তা চেতনা ভিন্ন ভিন্ন। আমরা যখনই তাদের সঙ্গে চিন্তা-চেতনাগত দিক থেকে ভিন্নতা দেখাবো তখনই তাদের মূল আচরণ লক্ষ্য করা যায়। এ কারণে আমাদের উচিত নিজেদের ভেতরে এই চিন্তা পোষণ না করা যে অন্যদের দৃষ্টিভঙ্গিও আমাদের মতোই হবে। বরং উল্টো আমাদের চেষ্টা করতে হবে তাদের মাঝে যে জিনিসটি রয়েছে সেদিকে লক্ষ্য রেখে তাদের ভেতরটাকে উপলব্ধি করা। এক মানুষের সঙ্গে অন্য মানুষের সম্পর্ক বৃদ্ধি ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে মৌলিক এবং প্রভাবশালী একটি নীতি হলো সহিষ্ণুতা ও ধৈর্যশীলতা। সহিষ্ণুতার মানে হলো যারা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে তাদের ব্যাপারে সহনশীল হওয়া, উদার হওয়া এবং যৌক্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আচরণ করা। বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে সামাজিক সম্পর্ক ও যোগাযোগের বিষয়টি সদা পরিবর্তমান। সামাজিক যে-কোনো পরিস্থিতিতেই একটা বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সেক্ষেত্রে এই সহনশীলতা ও ধৈর্য হতে পারে সাধারণ একটি প্রক্রিয়া যা সর্বাবস্থায় ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক ও যোগাযোগ প্রতিষ্ঠাকে সহজতর করবে। কোনো কোনো যুবক ও তরুণ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তাদের মাঝে আগ্রাসী একটা মনোভাবেরও সৃষ্টি হয়। তারা নিজেদের খুব কমই শান্তশিষ্টরূপে প্রকাশ করে। কিন্তু অন্যদের কাছে তারা প্রত্যাশা করে তাদের সঙ্গে যেন নম্র আচরণ করে।
প্রকৃতপক্ষে জীবন চলার পথটা সবসময় মসৃণ কিংবা সুগম নয়। অনেক ঝড়ঝঞ্ঝা, বাধা-বিপত্তি রয়েছে এই পথে। সুতরাং একমাত্র সহিষ্ণুতা ও ধৈর্যই ওই পথ চলতে সহযোগিতা করতে পারে। তাই আমাদের উচিত ধৈর্যশীল হওয়া পরমতসহিষ্ণু হওয়া। তাহলেই আমরা আমাদের জীবন চলার পথে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছুতে সক্ষম হবো।
পবিত্র কুরআনে এই সহনশীলতা ও ধৈর্য সম্পর্কে বহু আয়াত রয়েছে। ঐশী বার্তা ও আল্লাহর আদেশ নিষেধ হিসেবে পবিত্র কুরআন দাঙ্গা হাঙ্গামা ও কলহ-বিবাদপূর্ণ এমন এক জাহেলি পরিবেশে ইসলামের মহান নবীর ওপর অবতীর্ণ হয়েছে যে সমাজ ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি থেকে যোজন যোজন দূরে। সেরকম একটি ভূখণ্ড কুরআন নাজিল হবার খুব কম সময়ের মধ্যেই আলোকিত হয়ে গেল। কেবল সেই আরব্য উপদ্বীপেই নয় কুরআনের সেই আলো দ্রুততার সাথে ছড়িয়ে পড়লো আশেপাশের বিভিন্ন ভূখণ্ডেও। বিশেষজ্ঞদের অভিমত হচ্ছে কুরআন এতো দ্রুত জনগণের মাঝে প্রভাব বিস্তার করার পেছনে যে বিষয়টি কাজ করেছে তাহলো কুরআনের প্রয়োগ ছিল আলাপ আলোচনা এবং সহনশীল বৈশিষ্ট্যের মধ্য দিয়ে। অন্যভাবে বলা যায় কুরআন জনগণের ওপর জোর করে কোনো কিছু আরোপ করে নি।
পবিত্র কুরআন মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে,তাদেরকে প্রশিক্ষিত করে তোলার জন্য, তাদের অন্তরগুলোকে পরস্পরের প্রতি নৈকট্য স্থাপনে উদ্বুদ্ধ করতে এবং জনগণের মাঝে শান্তিপূর্ণ ও আন্তরিক একটি পরিবেশ তৈরি করার জন্য পরিমতসহিষ্ণু হবার পরামর্শ দিয়েছে। কুরআনের শিক্ষা হলো অন্যদের চিন্তা-চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গি উপলব্ধি করার জন্য এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত কোনো ভ্রান্তি থাকলে সেগুলো শোধরানোর জন্য অবশ্যই প্রথমে তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে পুরোপুরি শুনতে হবে। পুরোপুরি শুনলেই তার দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক কি ভুল সেটা বুঝেশুনে মতামত দেওয়া সহজ হবে। এক্ষেত্রে অন্যদের আচরণ ও বক্তব্য শোনার মতো প্রস্তুতি থাকতে হবে এবং বিভিন্ন রকম বক্তব্য থেকে সঠিক বক্তব্যটিকে বেছে নিতে হবে।
আমরা অন্যের বক্তব্য মনোযোগের সঙ্গে শোনার ব্যাপারে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলছিলাম। সূরা জুমারের সতেরো এবং আঠারো নম্বর আয়াতে এসেছে:
"কিন্তু যেসব লোক তাগুতের দাসত্ব বর্জন করেছে এবং আল্লাহর দিকে ফিরে এসেছে তাদের জন্য সু-সুংবাদ। হে নবী (সা)! আমার সেসব বান্দাকে সুসংবাদ দিয়ে দাও,যারা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে এবং তার ভাল দিকটি অনুসরণ করে। এরাই সেসব মানুষ যাদের আল্লাহ হিদায়াত দান করেছেন এবং এরাই বুদ্ধিমান"।
পবিত্র কুরআনে নবী (সা) কে আদেশ দেওয়া হয়েছে সুন্দর কথাবার্তা এবং সদাচার ও কৌশলের সাহায্যে সত্যের পথে দাওয়াত দিতে। এমনকি কারো জিজ্ঞাসার জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে এবং বিরোধী পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি ও যুক্তি খণ্ডন করতে সর্বোপরি তাদেরকে সম্মত করে তুলতে এই কৌশল অবলম্বন করতে হবে। বলা হয়েছে: "হে নবী! প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তা এবং সদুপদেশ সহকারে তোমার রবের পথের দিকে দাওয়াত দাও এবং লোকদের সাথে বিতর্ক করো সর্বোত্তম পদ্ধতিতে৷ তোমার রবই বেশী ভালো জানেন কে তাঁর পথচ্যুত হয়ে আছে এবং সে আছে সঠিক পথে"।
ধৈর্য ও সহনশীলতার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ হলো অন্যের চিন্তাধারা ও বিশ্বাসকে সম্মান করা। অন্যদের ভুলত্রুটি কিংবা সমালোচনাকে গ্রহণ করার জন্য মানসিক প্রস্তুতি কিংবা তারচেয়েও উন্নততর মানসিকতা হলো নিজের সম্পর্কে সমালোচনা শোনার মতো সহনশীলতা ও ধৈর্য। এটা খুবই প্রভাবশালী একটা বৈশিষ্ট্য যার মাধ্যমে মানুষের ভেতরের আত্ম বা আপন সত্তাকে চেনার সুযোগ তৈরি হয় এবং আরও বেশি সহনশীল হবার ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়। কেননা একজন মানুষ যখন অন্যদের সমালোচনার মাধ্যমে নিজের ভুল ত্রুটিগুলোর ব্যাপারে সচেতন হয় তখন অন্যদের অপ্রত্যাশিত ও অশোভন আচরণ সহ্য করার মতো শক্তি ও ধৈর্য আরও বৃদ্ধি পায়।
এ ব্যাপারে একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ধরা যাক আমরা যখন অন্যের চিন্তা চেতনা বা দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বাস এবং তার আচার আচরণ মেনে না নিই খুব স্বাভাবিকভাবেই তাদের ওপর বিরক্ত হয়ে পড়ি। অথচ এ্ বিরক্তি প্রকাশের মধ্য দিয়ে আমরা নিজেদের বিরক্তি ও অধৈর্যই প্রকাশ করে বসি। সেইসঙ্গে আমরা বোঝানোর চেষ্টা করি যে তোমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক নেই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিই ঠিক এবং যথার্থ। অথচ আমরা যদি আমাদের সহনশীলতা ও ধৈর্যশক্তি বাড়াতে পারি তাহলে আমরা সহজেই নিজেদেরকে ইতিবাচকতায় পাল্টে নিতে পারবো। এভাবে আমরা আমাদের সামাজিক সুযোগ সুবিধাগুলোকে কাজে লাগিয়ে নিজের মান উন্নয়ন করার পাশাপাশি শান্তি ও সংহতির সংস্কৃতিও উন্নত করতে সক্ষম হবো।
সামাজিক সংস্কৃতির কথা বলছিলাম। আমরা যে সমাজে বসবাস করি সেই সমাজে বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ বাস করে। আমরা যদি সেই সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ও যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে পারি এবং সবার সঙ্গে সুন্দরভাবে কথাবার্তা বলি আলাপ আলোচনা করি তাহলে সমাজে উগ্রতা, উত্তেজনা দ্বন্দ্ব-সংঘাত ইত্যাদি কমে যাবে এবং স্ট্রেস কমে গিয়ে সমাজ হয়ে উঠবে সুস্থ এবং নিরাপদ।#
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/১৮