ডিসেম্বর ১৯, ২০১৭ ১৬:৪০ Asia/Dhaka
  • আদর্শ জীবনযাপন-১৫:

আজ আমরা নতুন আরেকটু প্রসঙ্গের অবতারণা করবো। সেটা হলো পরহেজগারদের একটি মহান গুণ হলো রাগ ও ক্রোধ দমন করা। পবিত্র কুরআনের সূরা আলে-ইমরানের ১৩৪ নম্বর আয়াতে এই পরহেজগারদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলা হয়েছে: "যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল সব অবস্থায়ই অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে এবং যারা ক্রোধ দমন করে ও অন্যের দোষ ক্রটি মাফ করে দেয়। এ ধরনের সৎলোকদের আল্লাহ অত্যন্ত ভালোবাসেন"।

তার মানে এ আয়াতে আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার উপায়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। এইসব গুণের মধ্যে আমরা আজ  শুধু ক্রোধ দমন নিয়েই কথা বলার চেষ্টা করবো।

এমন অনেক সময় নিশ্চয়ই আপনার কেটেছে যখন আপনি উপলব্ধি করেছেন একরাশ উত্তেজনা আর মানসিক চাপ। আবার আনন্দঘন মুহূর্তও যেমন কাটিয়েছেন তেমনি দু:খ-বেদনাময় সময়ও কেটেছে আপনার অনেক। প্রতিটি মানুষের জীবনেই কখনো না কখনো ঘটনা দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। কতশত খবর শুনতে হয় কিংবা কত রকমের চিন্তাভাবনার ভেতর দিয়ে কাটাতে হয়। আবার এমন অনেক কাজও করতে হয় যেসব কাজের ফলে অন্যরাও নিজেদের ভেতর এক ধরনের অনুভূতি বা উত্তেজনা বোধ করে। এই অনুভব আমাদের বাহ্যিক পৃথিবী সম্পর্কে এবং এমনকি আমাদের চিন্তা চেতনাগত পদ্ধতি সম্পর্কে এমন কিছু তথ্যের জন্ম দেয় যেগুলো আমাদের পরবর্তী জীবনাচরণে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

ভয়

যখন আমরা আনন্দিত থাকি উল্লসিত থাকি তার মানে আমরা সম্ভবত কোনো না কোনো সুসংবাদ শুনেছি বা শুভ কোনো ঘটনা আমাদের জন্য ঘটে থাকবে। আর নিরানন্দ কিংবা বিষন্ন থাকার মানে হলো বিপরীত কোনো ঘটনার মুখোমুখি হয়েছি আমরা। এই উত্তেজনা, অনুভূতি সবই কিন্তু অভ্যন্তরীণ জীবনাভিজ্ঞতা থেকে উৎসারিত। ভেতরে কিংবা বাইরে যতসব ঘটনা দুর্ঘটনা ঘটেছে সেগুলোরই প্রতিফলন এইসব অনুভব। যেমন আমরা কখনো অনুভব করি রাগ বা উত্তেজনা, দুশ্চিন্তা, আনন্দ, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, ভয়-ভীতি ইত্যাদি। এরকম বিচিত্র অনুভূতি বিভিন্ন জনের মাঝে সৃষ্টি হয়। মানুষের ভেতরে অনুভূতির তীব্রতার ওপর তাদের পরবর্তীকালের আচার আচরণে সেই অনুভূতির প্রভাবের গভীরতা নির্ভর করে। সহজ করে বলা যায় অনুভূতির তীব্রতার বৈচিত্র্যের কারণে আচরণের ওপরেও প্রভাবগত বৈচিত্র্য দেখা দেয়।

যেসব অনুভূতির কথা বললাম অর্থাৎ দুশ্চিন্তা, রাগ, উত্তেজনা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ইত্যাদি মানসিক অবস্থা আমরা যদি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি তাহলে এই উত্তেজনাই আমাদের শরীর ও মনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে আমাদের জীবনে নেমে আসতে বিচিত্র নেতিবাচকতা। সুতরাং উদ্বেগ উৎকণ্ঠাকে মোকাবেলা করার সক্ষমতা ও শক্তি অর্জন করা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই শক্তি সামর্থ্য আমাদেরকে সক্ষম করে তোলে নিজের ভেতরকার উদ্বেগ ও বিষন্নতার বীজগুলো শনাক্ত করতে এমনকি অন্যদের ভেতরের কারণগুলোকেও শনাক্ত করতে শেখায়। এজন্য প্রথমে আচরণের উপর উদ্বেগের প্রভাব এবং পদ্ধতি সম্পর্কে  আমরা জানতে হবে এবং তারপর উদ্বেগ উৎকণ্ঠার ধরণ বুঝে যথাযথ প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে।

আনন্দময় অনুভূতি মানুষের ভেতর যেমনিইতিবাচক শক্তি যোগায় তেমনি অসন্তোষজনক বা নিরানন্দময় অনুভূতি মানুষের ভেতর ছড়ায় নেতিবাচক শক্তি। সুতরাং আমাদের দৈনন্দিন অনুভূতি ও বিশ্বাসগুলোকে পরিবর্তন করতে হবে যাতে ইতিবাচক অনুভূতি ও বোধ আমাদের ভেতরে প্রতিষ্ঠা পায়। যে ব্যক্তি ইতিবাচক চিন্তা করে তার ভেতরে সন্তোষজনক বা প্রশান্তিময় একটা অনুভূতি কাজ করে সবসময়। এই ইতিবাচকতা যৌক্তিক চিন্তার সুযোগ সৃষ্টি করে। আমাদের ব্রেইনের দরোজা ইতিবাচক চিন্তার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। অপরদিকে যারা মন্দ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে সবসময় তারা তাদের সমস্যা সমাধানের জন্য ব্রেইনের দরোজা বন্ধ করে রাখে। সুতরাং তারা ধারাবাহিকভাবে অসন্তোষজনক ও অশুভ অনুভূতিরই জন্ম দিতে থাকে।

ক্রোধের পরিণতি

ইমাম আলি (আ) বলেছেন: "চিন্তা ভাবনার ব্যাপারে সতর্ক হও কেননা তোমার কথাবার্তায় তা প্রকাশ পায়, কথাবার্তার ব্যাপারে সতর্ক থেকো কারণ তোমার আচার আচরণের ওপর তার প্রভাব পড়ে, অভ্যাস ও আচরণের ব্যাপারে সতর্ক থেকো কেননা  তোমার ব্যক্তিত্বের ওপর তার প্রভাব পড়ে আর তোমার ব্যক্তিত্বের ব্যাপারে সাবধান থেকো কারণ তার ওপর নিহিত রয়েছে তোমার ভবিষ্যৎ"।

মানুষের ভেতরে যেসব চিন্তা বা দুশ্চিন্তা কাজ করে সেসবের বেশিরভাগই পরিবেশগত না হয় ব্যক্তিগত কারণ থেকেই উৎসারিত।

দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো কিংবা চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন আনা সম্ভব হলে মানসিক প্রশান্তি লাভ করা যেতে পারে। কীভাবে সম্ভব এই পরিবর্তন আনা! হ্যাঁ! এজন্য আপনাকে আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। নিজের ওপর, নিজের মন ও মননের ওপর নিয়ন্ত্রণ অধিকার সৃষ্টি করতে হবে। দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে হবে যে জীবনের ঘটনাবলির ওপর আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব নয়। তাহলেই জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে এবং যে-কোনো পরিস্থিতি দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবেলা করা যেতে পারে। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ডক্টর নাজেমি বলেছেন: "জীবন নৈপুণ্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো নেতিবাচক উত্তেজনাময় দিকগুলোকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাতে সেগুলো আরেকটি নেতিবাচকতার জন্ম না দেয় বরং ইতিবাচকতার দিকেই যেন ধাবিত হয়"।

ডক্টর নাজেমি একটি উদাহরণ দিয়ে বলেছেন: "দুশ্চিন্তার মতো একটি নেতিবাচক উদ্বেগকে যদি কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে কিংবা যদি না জানে যে কীভাবে সেগুলোকে কাটিয়ে উঠতে হয় তাহলে কালক্রমে ওই সমস্যাগুলো তার জীবনের ওপর প্রভাব গেড়ে বসতে পারে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিষন্ন এবং দু:খবাদী হয়ে ওঠার আশঙ্কা থেকে যায়। কিছু কিছু মানুষ আছে যারা সবসময়ই বিরক্ত, যারা নেতিবাচক জীবনবোধে আক্রান্ত, তারা সবসময়ই মন্দ অনুভূতি লালন করে এবং তাদের জীবনের নানা পরিস্থিতি ও ঘটনাবলিতে শুধু নেতিবাচক চিন্তাই করে"।

 "ক্রোধ" মানুষের আচার আচরণের ওপর ব্যাপক উত্তেজনাকর প্রভাব ফেলে। মনের ভেতরে একটা নেতিবাচক ও অসন্তোষজনক অনুভূতির জন্ম দেয়। তারপরও এই ক্রোধকে মানুষের একটি জরুরি আচরণ বলে মনে করা হয়। কেননা এই ক্রোধকে যদি সুন্দরভাবে এবং গঠনমূলকভাবে কাজে লাগানো যায় তাহলে এই ক্রোধই হয়ে উঠতে পারে মানুষের সবচেয়ে ভালো প্রহরী ও রক্ষক। আবার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবনে বিচিত্র সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে এই ক্রোধ। সুতরাং ক্রোধ এবং উত্তেজনার উপাদানকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিয়ন্ত্রণ যদি যথাযথ হয় তাহলে ক্রোধই তার আচার আচরণে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণেই প্রাচীনকাল থেকে মনোবিজ্ঞানীরা ক্রোধকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর জন্য ব্যাপক চেষ্টা প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে।

সূরা আল-ইমরান: আয়াত-১৩৪

যে পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে মানুষকে সঠিকভাবে পরিচালিত করার মহান উদ্দেশে এবং মানুষের আচার আচরণগত ত্রুটি বিচ্যুতি সংশোধনের জন্য, সেই মহান গ্রন্থে মানুষের ক্রোধ এবং তা সংশোধনের উপায়গুলোর প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। মানুষের মানসিক অস্থির পরিস্থিতি ও অবস্থার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হলো রাগ বা ক্রোধ। এই রাগ যদি একবার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বসে তাহলে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটে যায়। পৃথিবীতে যত অপরাধ ঘটায় কিংবা ভয়ংকর যত সিদ্ধান্ত মানুষ তার জীবনে নেয় এই রাগ বা ক্রোধের অবস্থাতেই নেয়।

পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ইমরানের ১৩৪ নম্বর আয়াতে পরহেজগারদের একটি অনন্য গুণ হিসেবে ক্রোধ সংবরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে "ওয়াল কাজেমিনাল গাইজ"। এখানে কেজ্‌ম শব্দের অর্থ হলো মশকের মুখ বন্ধ করা যার ভেতেরে পানি ভর্তি। এই শব্দটিকে এখানে রূপকার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। মারাত্মক রাগ এবং ভয়াবহ মানসিক অস্থিরতা অর্থেও শব্দটির প্রয়োগ হয়ে থাকে। তো যখন এই রাগ বা ক্রোধের আগুণ মানুষের মুখে জ্বলে ওঠে দেহ তখন স্বাভাবিক অবস্থা থেকে দূরে সরে যায়। স্বাভাবিকভাবেই মানুষ তখন ঔচিত্যবোধ হারায়,স্বাভাবিক অনুভূতিও হারিয়ে বসে। সবচেয়ে বড় বিপদ হলো ক্রোধের সময় মানুষের বোধ এবং বুদ্ধি কোনো কাজ করে না। সুতরাং বিবেক বুদ্ধিকে সুস্থভাবে কাজে লাগাতে হলে এই ক্রোধ থেকে বাঁচতে হবে।

অ্যারিস্টটল বলেছেন: "ক্রুদ্ধ হওয়া সোজা কাজ। কিন্তু যথার্থ ব্যক্তির ওপর যথাযথ পর্যায়ে ক্রুদ্ধ হওয়া, বিবেচ্য মাত্রায় ক্রুদ্ধ হওয়া এবং যথাযথ কারণে ও সঠিক সময়ে ক্রুদ্ধ হওয়া সহজ কাজ নয়"। তবে ক্রুদ্ধ হওয়া অসম্ভব নয়। এই রাগ সংবরণের জন্য মানুষের ঈমান, আত্মিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। নবী করিম (সা) বলেছেন: শক্তিশালী সে নয় যে যুদ্ধে ব্যাপক বীরত্ব দেখায় বরং শক্তিশালী হলো সেই ব্যক্তি যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তার মানে রাগ করার মতো শক্তি থাকা সত্ত্বেও যে রাগকে দমন করে তার অন্তরকে আল্লাহ প্রশান্তি ও ঈমানের ঐশ্বর্যে পরিপূর্ণ করে দেন। কুরআনের একটি আয়াত উদ্ধৃত করে পরিসমাপ্তি টানবো আজকের আলোচনার: "তাদের জন্য পুরস্কার রয়েছে যারা বড় বড় গোনাহ এবং লজ্জাহীনতার কাজ থেকে বিরত থাকে এবং ক্রোধ উৎপত্তি হলে ক্ষমা করে"।

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/১৯