পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব: বিখ্যাত ইরানি কবি দাকিকির জীবনী ও অবদান
গত পর্বের আলোচনায় আমরা বলেছি, লুবাবুল আলবাব নামের বইসহ নানা বইয়ে দাকিকির নানা কাসিদা,গজল ও সাহিত্যকর্মের কথা আলোচিত হয়েছে।
দাকিকির অসম্পূর্ণ শাহনামা হল ‘গাশতাসবনামে’। তার এই অমর শিল্পকর্মটি বিখ্যাত ইরানি সম্রাট গাশতাসবের কাহিনী নিয়ে রচিত। দাকিকির এই শাহনামা মুসলিম ইরানের অন্যতম সেরা বীরত্ব-গাঁথা হিসেবে খ্যাত। এই অমর কাব্যের কারণে দারি ফার্সি সাহিত্যের অন্যতম বড় পথিকৃৎ ও দিকপাল হিসেবে বিবেচিত হন দাকিকি।
জরথুস্তের আবির্ভাব, তুরান বা ইরান-বহির্ভূত অঞ্চলের আরজাসবের সঙ্গে ইরানের গাশতাসবের যুদ্ধ গাশতাসবনামের আরও কিছু আলোচ্য বিষয়। মাত্র এক হাজার দ্বিপদী পঙক্তির মধ্যে এইসব বিষয়ের বর্ণনা তুলে ধরতে সক্ষম হন কবি দাকিকি। ফেরদৌসি তার শাহনামায় দাকিকির এই এক হাজার পঙক্তি যুক্ত করেছেন বিশ্বস্ততা বজায় রেখে এবং এসব পঙক্তিকে দাকিকির শিল্পকর্ম বলে সসম্মানে উল্লেখ করেছেন। মহাকবি ফেরদৌসি আসলে দাকিকির সূচিত অসম্পূর্ণ শাহনামাকেই পরিবর্ধন ও সম্পূর্ণ করেছেন।
অনেক গবেষক মনে করেন দাকিকির অন্য কাব্যগ্রন্থও ছিল। তবে তার বেশিরভাগই কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। নানা সাক্ষ্য প্রমাণ থেকে জানা যায় দাকিকির এই কাব্যগ্রন্থ বা দিওয়ান/ নাসের খসরুর যুগ তথা খ্রিস্টিয় একাদশ শতকেও টিকে ছিল। অন্য কথায় হিজরি পঞ্চম শতকের শেষের দিকেও দাকিকির এই কাব্য টিকে ছিল। ওই কাব্যের কয়েকটি গজল ও গীতি-কবিতার অংশ এখনও টিকে আছে।
দাকিকির কবিতার ভাষা ছিল সহজ ও প্রাঞ্জল এবং অলঙ্কারবিহীন। গজল ও প্রশংসাসূচক কবিতার মাধ্যমেও নিজের অনেক চিন্তাধারা আর বিশ্বাস তুলে ধরেছেন দাকিকি। তার প্রশংসাসূচক কবিতায় রয়েছে প্রকৃতির সৌন্দর্যের বর্ণনা এবং নানা বিষয় ও বস্তু সম্পর্কে অতিরঞ্জিত গুণ-কীর্তন।
দাকিকির গজলগুলোও সাধারণত বেশ প্রাঞ্জল, সুললিত ও সহজ-সরল। তবে সমালোচকদের কেউ কেউ বলেন, দাকিকির গজলগুলোর কোনো কোনো অংশ প্রাঞ্জল ও শ্রুতি-মধুর নয়। অল্প বা কম বয়সের অনভিজ্ঞতা এবং অপরিপক্কতাই এ জন্য দায়ি বলে তারা মনে করেন। তার যেসব কবিতা আজও টিকে আছে তা বিশ্লেষণ করলেও বোঝা যায় শক্তিমান এই কবি অনেক সময়ই প্রচলিত কাব্য-রীতি ও শিল্পের ধারা অনুসরণ করেননি। তার কবিতাগুলো বিশ্লেষণ করলে এটাও ফুটে ওঠে যে তিনি যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন আনন্দ ও ফুর্তির মধ্যে সুখেই ছিলেন।
দাকিকি প্রায়ই –দেশ-বিদেশে ভ্রমণ করতেন এবং আমির-ওমরাহদের গুণ-কীর্তন করতেন। আর এভাবেই কেটেছে তার জীবন।
দাকিকির যুগে খোরাসান ছিল কাব্য ও কবিতা চর্চার বিকাশের যুগ। এ যুগে পুনরুজ্জীবিত হচ্ছিল প্রাচীন ইরানের নানা প্রথা ও রীতি। এ যুগেই দাকিকিসহ ইরানের বেশিরভাগ কবি শিল্প ও সংস্কৃতি-ক্ষেত্রে ইরানিদের অতীতের গৌরবময় অবদানগুলো পুনরুজ্জীবনে সচেষ্ট হন। তারা ভুলে-যাওয়া ইরানি প্রথা ও সংস্কৃতিকে আরবি সাহিত্যের স্থলাভিষিক্ত করার উদ্যোগ নেন। ফলে রুদাকি ও শহীদ বালখির হাতে সমৃদ্ধ হয়ে-ওঠা ইরানের কাব্য ও কবিতা শিল্প আরও বিকশিত হতে থাকে।
খুব কম বয়সেই মারা যান দাকিকি। কিন্তু এর আগেই তিনি উপহার দিয়ে যান শাহনামা জাতীয় অসম্পূর্ণ বীরত্ব-গাঁথা ‘গাশতাসবনামে’। অবশ্য মহাকবি ফেরদৌসি না থাকলে দাকিকির অন্য কবিতা ও কাব্যের মত এক হাজার পঙক্তির এই অসমাপ্ত কাব্যও বিলীন হয়ে যেত। ফেরদৌসি তার শাহনামায় দাকিকির এই কাব্য যুক্ত করেছেন কোনো ধরনের পরিবর্তন ছাড়াই।
ফেরদৌসি এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন যে দাকিকি স্বপ্নযোগে তাকে অনুরোধ জানান যে তার গাশতাসবনামেহ যেন শাহনামায় যুক্ত করা হয়। আর ঘুমের মধ্যেই ফেরদৌসি তার অগ্রজ কবির এই অনুরোধ মেনে নেন। ফেরদৌসি বাস্তবেও তার কথা রেখেছেন।
শাহনামার মধ্যে গাশতাসবনামেহ সংযোজন করাকে প্রাচীন ইরানের ধর্মীয় বীরত্বগাঁথার সঙ্গে জাতীয় বীরত্বগাঁথাকে যুক্ত করার অসাধারণ ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ বলে ধরা হয়। ফেরদৌসির শাহনামার ভাষাকে দাকিকির অসম্পূর্ণ শাহনামার ভাষা থেকে অনেক বেশি উন্নত বলে মনে করা হয়। সোহরাব ও রুস্তমের কাহিনীর মত চিত্তাকর্ষক এবং বিচিত্রময় নানা ঘটনার বর্ণনা ও উন্নত ভাষা-শৈলীর কারণে ফেরদৌসির শাহনামা জনপ্রিয়তার দিক থেকে অনেক বেশি এগিয়ে গেলেও দাকিকির কবিতাও অনেক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
দাকিকির লেখা গাশতাসবনামে’র কাহিনীতে বলা হয়েছে, লাহরাসপ সম্রাট গাশতাসবের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে বালখে চলে যান এবং সেখানে ফকির-দরবেশদের মত জীবন যাপন করতে থাকেন ও আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হন। আর গাশতাসব রাজত্ব পরিচালনা শুরু করেন। তিনি জনগণকে আল্লাহর ধর্মের দিকে তথা ন্যায়-বিচার ও সত্যের পথে আসার আহ্বান জানাতে থাকেন। গাশতাসব নিজেও ন্যায়-বিচার ও সততা বজায় রাখছিলেন। চীনের সম্রাট আরজাসব ছাড়া সব রাজারাই গাশতাসবকে কর দিত। চীনা সম্রাট গাশতাসবের কাছে থেকে কর নিতেন।
দাকিকির গাশতাসবনামে’র কাহিনীতে আরও বলা হয়েছে, জরথুস্ত ধর্মের আবির্ভাব ঘটলে সম্রাট গাশতাসব এ ধর্ম গ্রহণ করেন এবং গোটা ইরানে এ ধর্ম ছড়িয়ে দেন। চীনা সম্রাট আরজাসব এ খবর পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। গাশতাসব এ নতুন ধর্ম ছড়িয়ে দেয়ার জন্য চীনে হামলা চালাবেন বলে আরজাসব ভয় পাচ্ছিলেন। তাই তিনি ইরানি সম্রাটকে প্রলুব্ধ ও মত পরিবর্তনে উদ্বুদ্ধ করার জন্য তার কাছে একটি চিঠি লেখেন। একইসঙ্গে তার কাছে অনেক উপহারও পাঠান আরজাসব। কিন্তু এসবে প্রভাবিত হননি ইরানি সম্রাট গাশতাসব। তাই চীনা সম্রাট যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হন। দুই দেশের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে চীনের অনেক তুর্কি সেনা প্রাণ হারায়। ফলে চীনা সম্রাট পালিয়ে যান। আর এখানেই শেষ হয় দাকিকির গাশতাসবনামে। এরপর মহাকবি ফেরদৌসি নিজে চীনাদের দ্বিতীয় যুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নানা ঘটনার বর্ণনা শাহনামায় লিখেছেন। #
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/২৮