আদর্শ জীবনযাপন-১৬: "রাগ বা ক্রোধের নেতিবাচক দিক"
বন্ধুরা! সালাম ও শুভেচ্ছা নিন। আশা করি যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন। জীবনযাপনের ইসলামি পদ্ধতি ও দিক নির্দেশনা বিষয়ক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান “আদর্শ জীবনযাপনের" আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি আমি সোহেল আহম্মেদ এবং আমি আব্দুর রশিদ।
আমরা গত আসরে আমাদের মানসিকতার ওপর রাগ বা ক্রোধের নেতিবাচক দিক নিয়ে কথা বলেছি। আজ তারই ধারাবাহিকতায় মানুষের স্বাভাবিক একটি নেতিবাচক প্রবণতা নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো।
এই প্রবণতাটি হলো "ভয়"। এটা মানুষের একটি মানসিক অবস্থা। এই ভয় এমন একটি প্রবণতা, একজন মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনসঙ্গী হয়ে যা সর্বদাই পাশাপাশি সহাবস্থান করে। কখনো ভয়ের মাত্রা বেশি হয়ে গেলে মানুষের আচার আচরণের ওপর তার বিশেষ প্রভাব পড়ে। ভয় পাওয়া মানুষের অনুভূতি একেবারেই অপ্রীতিকর। ভয়ের অনুভূতির প্রতিক্রিয়ায় অনেক বিপজ্জনক পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়। যাই হোক এ নিয়ে আমরা আজকের আসরে আরও কিছু কথা বলবো ইনশাআল্লাহ। আপনারা আমাদের সঙ্গেই আছেন যথারীতি এ প্রত্যাশা রইলো।
ভয় হলো একটা উত্তেজনাকর প্রতিক্রিয়া। বিশৃঙ্ক্ষলার কারণেই এই ভীতির সৃষ্টি হয় এবং মানুষের স্বাভাবিক আচরণে এই ভয় ব্যাঘাত সৃষ্টি করার পাশাপাশি মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায় যে সে চেষ্টা প্রচেষ্টা বা তৎপরতা চালানোর শক্তি হারিয়ে ফেলে। ভয় এবং অস্থিরতা মানুষের শান্তি নষ্ট করে দেয়। শুধু তাই নয় মানুষের মনের ওপর ব্যাপক চাপ এবং অস্থিরতা সৃষ্টিরও কারণ হয়ে দাঁড়ায় এই ভয়। অবশ্য ভয় আর অস্থিরতা এক জিনিস নয়, দুয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ভয়ের সুনির্দিষ্ট হোক কিংবা নেপথ্য হোক কোনো না কোনো কারণ থাকে। কিন্তু অস্থিরতার কারণ সুস্পষ্টভাবে শনাক্ত করা দুরূহ ব্যাপার।

উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে কোনো ব্যক্তি এই ভেবে ভয় পেতে পারে যে কুকুর তাকে কামড়াতে পারে। এটা খুবই স্বাভাবিক একটি ঘটনা। কিন্তু কেউ যদি ভাবে তার সন্তান ভয়াবহ কোনো দুর্ঘটনার শিকার হবার আশঙ্কা রয়েছে তাহলে সেই চিন্তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে একটা অস্বাভাবিক এবং অস্পষ্ট পরিস্থিতির মাঝে ফেলে দিতে পারে,এটাই মানসিক অস্থিরতা। ভয় মানুষের ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণতার জন্য একটা সীমা পর্যন্ত প্রয়োজন রয়েছে। সে কারণে ভয়কে সাধারণত দুটি ভাগে বিভক্ত করা যায়। একটি হলো অনুকূল ভয় অপরটি প্রতিকূল ভয়।
বন্ধুরা! আমরা দুই রকম ভয় নিয়ে কথা বলছিলাম। একটি ইতিবাচক বা অনুকূল ভয় আর অন্যটি হলো নেতিবাচক বা প্রতিকূল ভয়। আল্লাহকে ভয় করাটা অনুকূল ভয়ের পর্যায়ে পড়ে। আর আল্লাহকে ভয় করার অর্থ হলো নিজের গুনাহ এবং দুর্বলতার ভয়। আল্লাহ আমাদেরকে বেশ কিছু দায় দায়িত্ব দিয়ে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। আমাদের ওপর আরোপিত দায়িত্বগুলো আমরা সঠিকভাবে পালন না করে থাকলে সেই ভয় আমাদেরকে সবসময় তাড়িয়ে ফিরবে এটাই স্বাভাবিক। এই ভয়টা কিন্তু সন্ত্রস্ত কিংবা আতঙ্কিত হওয়াকে বোঝায় না বরং এটা এক ধরনের বিনয় বা নম্রতার মধ্যে পড়ে। সুতরাং এ ধরনের ভয় লালন করাটা চমৎকার একটা গুণ।
পবিত্র কুরআনের সূরা ফাতিরের আটাশ নম্বরে আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন: "আসল ব্যাপার হচ্ছে, আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে একমাত্র জ্ঞান সম্পন্নরাই তাকে ভয় করে"। এ কথার মানে হলো, আল্লাহর শক্তিমত্তা, জ্ঞান প্রজ্ঞা, ও বিজ্ঞানময়তা,ক্রোধ, পরাক্রম সার্বভৌম কর্তৃত্ব ক্ষমতা ও অন্যান্য গুণাবলি সম্পর্কে যে ব্যক্তি যত বেশি জানবে সে তত বেশি তার নাফরমানি করতে ভয় পাবে। তাই এই ভয় আল্লাহর অনুগত বান্দা হতে সাহায্য করে এবং মানুষকে পরিপূর্ণতার পথে পরিচালিত করে। অনুগত মানে হলো আল্লাহ যেসব কাজ পছন্দ করেন সেসব কাজ বেশি বেশি করা আর যেসব কাজ অপছন্দ করেন সেসব কাজের ধারেকাছেও না যাওয়া।
ভয় জনিত উদ্বেগ উৎকণ্ঠা মোকাবেলা করার জন্য পবিত্র কুরআন চমৎকার দিক-নির্দেশনা দিয়েছে। ভয় পরিহার করার সর্বোত্তম উপায় হিসেবে বলা হয়েছে আল্লাহর সামনে পরিপূর্ণভাবে নিজেকে সমর্পন করা এবং কায়-মনোবাক্যে, পরিপূর্ণ এখলাস ও আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহর নির্দেশিত কাজগুলো করে যাওয়া। ভয় সাধারণত সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি বা কোনো কিছু হারানোর আশঙ্কা থেকে উৎসারিত হয়। কিন্তু একজন মুমিন ব্যক্তি যিনি আল্লাহর অস্তিত্বে পরিপূর্ণ ঈমান বা বিশ্বাস রাখেন তিনি আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ ভরসা রাখেন মানে সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করেন। সুতরাং মুমিন ব্যক্তি কোনো কিছু হারাবার ভয় করে না। কেননা তিনি মনে করেন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং ক্ষমতার অধিকারী হলেন আমাদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। আর সেই আল্লাহই তাকে দেখছেন এবং তার তত্ত্বাবধানেই মুমিন ব্যক্তি রয়েছেন। সুতরাং ভয় কীসের।
কিন্তু এই অবস্থাটা কখন তৈরি হয়? যখন একজন মুমিন তার জীবনের সকল কাজ একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে মানে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে করার চেষ্টা করে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:
আসলে তোমাদের বা অন্য কারোর কোন বিশেষত্ব নেই। সত্য বলতে কি যে ব্যক্তিই নিজের সত্ত্বাকে আল্লাহর আনুগত্যে সোপর্দ করবে এবং কার্যত সৎপথে চলবে, তার জন্য তার রবের কাছে এর প্রতিদান রয়েছে। আর এই ধরনের লোকদের জন্য কোন ভয় বা মর্মবেদনার অবকাশ নেই।
আমরা যেন সেরকম একনিষ্ঠ মুমিন হতে পারি সেই কামনা করে পরিসমাপ্তি টানছি আজকের আসরের। যারা সঙ্গ দিলেন সবাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
- কথা হবে আবারও পরবর্তী আসরে।#
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/১৯