আদর্শ জীবনযাপন-১৭: "সুন্দর ভাষা ও বাচনভঙ্গি"
বন্ধুরা! সালাম ও শুভেচ্ছা নিন। আশা করি যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন। জীবনযাপনের ইসলামি পদ্ধতি ও দিক নির্দেশনা বিষয়ক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান “আদর্শ জীবনযাপনের" আজকের আসরে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি।
আমরা গত আসরে আমাদের মানসিক একটি প্রবণতা "ভয়" নিয়ে কথা বলেছিলাম। কুরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে আরও বলেছিলাম যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পন করেছে এবং সৎকাজ করেছে তাদের কোনো ভয় নেই বরং তাদের জন্য রয়েছে পুরস্কারের ব্যবস্থা।
অবশ্য ভয় দু'ধরনের। এক ধরনের ভয় ইতিবাচক মানে মানুষের জন্য তার প্রভাব বা ফলটা অনুকূল। আরেক ধরনের ভয় রয়েছে নেতিবাচক যা মানুষের জন্য একেবারেই প্রতিকূল। অনুকূল ভয়টা একেবারেই আল্লাহ কেন্দ্রিক। সুতরাং আল্লাহর ভয় মানে হলো আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পিত রাখা। এটা অনুকূল ভয়। যাই হোক, এই ভয় নিয়ে আর কথা নয়। আমরা আজকের আসরে সুন্দর ভাষা ও বাচনভঙ্গি নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো।

চলুন আমরা একসঙ্গে কথা বলি। কিন্তু কীভাবে? হ্যাঁ! অন্যদের সঙ্গে কথা বলার ভঙ্গি একটা বাচিক শিল্প। এই শিল্পটি জীবনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক জীবনে আমরা অনেক সময় উগ্র এবং উত্তপ্ত কথাবার্তার সম্মুখিন হই। এমনিক অন্যদের পক্ষ থেকে নিন্দা কিংবা অভিযোগেরও সম্মুখিন হই। আর এ ধরনের আচরণের মুখে বাধ্য হয়ে যাই যথাযথ জবাব দিতে। বর্তমান সমাজে আমরা শিষ্টাচার বহির্ভূত বিচিত্র অসংলগ্ন আচরণের মুখোমুখি হচ্ছি। কথা বলার ভঙ্গি, হুমকি ধমকি দিয়ে ভয় দেখানোর প্রবণতা, আরেকজনকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে কথা বলা আজকের দুনিয়ায় স্বাভাবিক একটি ঘটনায় দাঁড়িয়ে গেছে।
আদর্শ জীবনযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আমাদের আত্মিক ও মানসিক স্বাস্থের উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জন করা। সামাজিক সুস্থতা, আচার আচরণগত সৌন্দর্য বৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক ও যোগাযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্যগুলো ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। সুস্থ মানসিকতা ও সুন্দর আচরণ নিজেকে এবং সমাজকে অবক্ষয় থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি সমাজের ও নিজের মানসিক সুস্থতার স্তরকেও উন্নত করে। আপনি যার সঙ্গে কথা বলছেন তাঁকে যদি সম্মান ও শ্রদ্ধা করে কথা বলেন তাহলে সেটা আপনারই লাভ। কারণ সুস্থ ও সুন্দর করে অপরকে সম্মান দেখিয়ে কথা বলা মূলত আপনার মানসিক সুস্থতা এবং উন্নত চিন্তারই বহিপ্রকাশ। আপনি যে ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ও সংস্কৃতিবান একজন মানুষ তারই প্রমাণ বহন করে সুন্দর আচরণ।
বলছিলাম সুন্দর করে, অপরকে সম্মান দিয়ে কথা বলার মধ্য দিয়ে আপন ব্যক্তিত্বের বিষয়টিই ফুটে ওঠে। অপরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে, হেয় প্রতিপন্ন করে কথা বলার মানে হলো একটি সমাজের সদস্যের ব্যক্তিত্বের ওপর আঘাত হানা। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ফারশদ শিবানি বলেছেন: তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা বা ঠাট্টা মশকরার মাধ্যমে অন্যকে ছোট করে কথা বলাটা মস্তিষ্কের একটি নেতিবাচক অবস্থা। এখানে এমন কোনো বিষয় রয়েছে যে বিষয়টি অপরকে তাচ্ছিল্য করে কথা বলতে মানসিকভাবে বক্তাকে উত্তেজিত করেছে। তাই সে কিছু বাক্য ও শব্দ প্রয়োগ করে প্রতিপক্ষকে কথা শোনায় যাতে তার মানসিক উত্তেজনা কমে আসে।
কারও ব্যক্তিত্বে আঘাত হানা কিংবা কারো অবমাননা করাকে পবিত্র কুরআনে এক ধরনের জুলুম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে কুরআনের বহু আয়াতে মুমিনদেরকে বলা হয়েছে তারা যেন কাউকে তাচ্ছিল্য করা, কারো দোষ ত্রুটি খুঁজে বেড়ানো কিংবা কাউকে নোংরা উপাধি বা উপনামে ডাকা ইত্যাদি থেকে নিজেদের বিরত রাখে। সূরা হুজরাতের ১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: "হে ঈমানদারগণ!এক কওম যেন অন্য কওমকে বিদ্রূপ না করে। হতে পারে তারাই এদের চেয়ে উত্তম। আর মহিলারাও যেন অন্য মহিলাদের বিদ্রূপ না করে। হতে পারে তারাই এদের চেয়ে উত্তম। তোমরা একে অপরকে বিদ্রূপ করো না এবং পরস্পরকে খারাপ নামে ডেকো না"।
অপরের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যক্তির নৈতিকতা ও ব্যক্তিত্বকে উন্নত করে। তবে এই সম্পর্কের জন্য প্রয়োজন শিষ্টাচার রক্ষা করে চলা অর্থাৎ অপরকে সম্মান ও মর্যাদা দেয়া।
সম্পর্কের ক্ষেত্রে শিষ্টাচার মেনে চলার কথা বলছিলাম। এ প্রসঙ্গে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেছেন: একটি সমাজ ও ব্যক্তিকে যে বিষয়টি মানবীয় পূর্ণতায় পৌঁছায় তা হলো সৎ চরিত্র ও সুন্দর আখলাক। সুন্দর আখলাকের বিষয়টি কেবল অন্য মানুষের সঙ্গেই জড়িত নয়। সৎ গুণাবলি ও নীতি নৈতিকতা নিজের ভেতরে অর্থাৎ অন্তরাত্মায় লালন করতে হবে এবং তার কাজে কর্মে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। জ্ঞান ও সভ্যতার বাহ্যিক উন্নতি যদি আপাত দৃষ্টিতে সমৃদ্ধির উচ্চ শিখরেও আরোহন করে, তারপরও সেই সমাজকে মানবীয় পূর্ণতায় সমৃদ্ধ সমাজ বলা যাবে না। কেন বলা যাবে না সে বিষয়ে আমরা কথা বলবো পরবর্তী আসরে।
- আমাদের হাতে আজ আর সময় নেই। আপনারা যারা দীর্ঘক্ষণ ধরে আমাদের সঙ্গে ছিলেন সবার প্রতি রইলো আন্তরিক অভিনন্দন।#
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো:আবুসাঈদ/২৯