এপ্রিল ১৭, ২০১৮ ১৫:০৩ Asia/Dhaka

আমরা গত আসরে সদাচার এবং প্রফুল্ল থাকার ইতিবাচকতা সম্পর্কে হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে আসরের সমাপ্তি টেনেছিলাম। সেখানে রাসূল (সা) এর মতো চরিত্রের কাছাকাছি পর্যায়ের গুণাবলি সম্পন্ন মানুষ হলো সে-ই, "যে সদাচারী, উত্তম চরিত্রবান, নম্র, আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে সদ্ব্যবহারকারী, দ্বীনী ভাইদের সঙ্গে আন্তরিক বন্ধুসুলভ, সত্যের ওপর ধৈর্যশীল, উত্তেজনা প্রশমনকারী এবং সুখে-দুখে-রাগের মধ্যেও ভারসাম্যপূর্ণ।"

আরও বলা হয়েছে, সদাচার হলো আলোকরশ্মির মতো। ওই আলোকরশ্মি ব্যক্তির নিজের পাশাপাশি সঙ্গী-সাথীসহ আশেপাশের ওপরও আলো ছড়ায়। প্রকৃতপক্ষে সুন্দর ও কল্যাণময় আচরণ কেবল যে ব্যক্তির নিজেকেই আনন্দময় করে তোলে তা নয় বরং পরিবারের অপরাপর সদস্যকেও সেই আনন্দ উপহার দেয়। কিন্তু সুন্দর আচরণ কী জিনিস? জাফর সাদেক (আ) "গোরারুল হেকাম" নামক গ্রন্থে এই প্রশ্নের জবাবে লিখেছেন: সদয় ও নম্র হও, কথাবার্তায় শালীন হও এবং তোমার ভাইদের সঙ্গে প্রফুল্ল থাকো"। গত আসরের ধারাবাহিকতায় এই সুন্দর আচরণ নিয়ে আমরা আজকের আসরেও কিছু কথা বলার চেষ্টা করবো।

 

সুন্দর আচরণ এবং উত্তম চরিত্রের ব্যাপারে ইসলামে ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একটি পরিবারে সুখ শান্তি হাসিখুশি প্রফুল্লতা ইত্যাদি বজায় রাখার ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের মাঝে এই গুণাবলি কীভাবে বিস্তার ঘটানো যায় তা নিয়েও ধর্মীয় বিধি বিধানে ব্যাপক উপদেশ ও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দাম্পত্য জীবনের শুরু থেকে স্বামী এবং স্ত্রী তাদের পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কয়েকটি অভিন্ন বিষয়ে ঐকমত্যে আসাটা জরুরি। যেমন ঈমানের বিষয়টি। ঈমান বা আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে অভিন্নতা না থাকলে দাম্পত্য জীবনে সুখের আশা করাটা দুরূহ। এর পাশাপাশি হাসিখুশি, প্রফুল্লতা, সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি না থাকা, উদার মানসিকতা ইত্যাদির সমতা থাকলে পরিবারের সন্তান সন্ততির মাঝে সেগুলোর প্রভাব ও বিস্তার অনায়াসে পড়ে যেতে পারে। জন্মের পর থেকেই এইসব বৈশিষ্ট্য সন্তানদের মাঝে বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে অনন্য উপহার হিসেবে চলে যায়।

 

কুরআনে কারিমের যুক্তি ও বক্তব্য অনুযায়ী সৃষ্টির মূল বৈশিষ্ট্যই এমন যে নিজে নিজেই মানুষের মাঝে আনন্দ প্রফুল্লতার উপাদানগুলো তৈরি হয়ে যায়। সূর্যোদয়, প্রশান্ত ও অনাবিল ভোর, আনন্দময় বসন্ত, মন কেড়ে নেয়া ঝরনাধারা, বিচিত্র রঙের ফুল, দুজন মানুষের মধ্যকার সম্পর্কসহ বিশ্বের আরও অনেক উদ্ভাবনী ইত্যাদি মানুষের হাসি-উল্লাস ও প্রফুল্লতার উৎস হিসেবে কাজ করে। একইভাবে ঈমান এবং সৎকাজ পরকালীন সুখ-শান্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি এই পৃথিবীতেই সাফল্য এনে দেয়। বন্ধুত্ব ও স্নেহ-মমতা সৃষ্টির ক্ষেত্রেও সৎকাজ আর ঈমানের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে।

বলছিলাম,ঈমান এবং সৎকাজের ফলে পরকালীন সুখ-শান্তি নিশ্চিত হয় এবং পার্থিব জগতে সাফল্য আর মায়া-মমতারও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্বামী-স্ত্রী যখন এক আল্লাহর বেঁধে দেওয়া নীতি-নৈতিকতার প্রতি অটুট থাকে তখন তাদের ভেতরে জন্ম নেয় ঐশী আলো। সেই অদেখা অলৌকিক আলোয় তারা পারস্পরিক অধিকার আদায়ে সচেষ্ট থাকতে চেষ্টা করে। মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে যারা আল্লাহর একত্ববাদ এবং পরকালীন জীবনে বিশ্বাস করে তারা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি আনন্দময় ও প্রফুল্ল জীবনযাপন করে। পবিত্র কুরআনের সূরা রাদের ২৮ নম্বর আয়াতেও এই সত্যকে তুলে ধরে বলা হয়েছে: 'তারাই এ ধরনের লোক যারা -নবীর দাওয়াত-গ্রহণ করেছে এবং আল্লাহর স্মরণে তাদের চিত্ত প্রশান্ত হয়'।

 

কুরআন ব্যক্তির জীবনকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে উদ্বুদ্ধ করেছে। ইতিবাচক জীবনদৃষ্টি এবং কুদৃষ্টির পরিবর্তে বিচক্ষণতাপূর্ণ ও যৌক্তিক সুদৃষ্টি সৌভাগ্যপূর্ণ জীবনের মূল চাবিকাঠি।ইতিবাচক দৃষ্টি জীবনে প্রশান্তি ও সুখ শান্তির একটা নিয়ামক শক্তি। জীবনে কখনো কোনো ব্যর্থতা এলে ইতিবাচক দৃষ্টি তা থেকে শিক্ষা নিতে শেখায়। যে পরিবারে এই ইতিবাচক ও সৎ চিন্তার চর্চা বেশি বেশি হয় এবং পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলোকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয় সেই পরিবারের সমন্বিত জীবন প্রকৃত সুখ-শান্তিময় ও মধুময় হয়ে ওঠে। একজন মা যখন জীবনের কষ্টক্লেশকে জীবনেরই অনিবার্য ও অভিন্ন অংশ বলে মনে করেন এবং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন তাঁর জীবন থেকে সুখশান্তি কখনোই দূরে সরে যায় না। কেননা তিনি সুখ শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে সবসময় ওই জীবন সমস্যার সঙ্গে লড়াই করতে থাকেন।   

পবিত্র কুরআন মুমিনদেরকে প্রফুল্লতার দিকে আহ্বান জানিয়েছে। সূরা ইউনুসের ৫৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:হে নবী! বলুন “এ জিনিসটি যে,তিনি পাঠিয়েছেন এটি আল্লাহর অনুগ্রহ এবং তার মেহেরবানী। এ জন্য লোকদের আনন্দিত হওয়া উচিত, কেননা তারা যা কিছু জমা করছে সে সবের চেয়ে এটি অনেক ভাল”।

আল্লাহর রহমত, দয়া, ঐশী অনুগ্রহ ও নিয়ামত এবং বিজয় অর্জনের জন্য মুমিনরা যে আনন্দ করবে সে ব্যাপারে কুরআনে কারিমে উল্লেখ রয়েছে। সুরা রূমের ৪ ও ৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: আর সেদিনটি হবে এমন দিন যেদিন আল্লাহ প্রদত্ত বিজয়ে মুসলমানরা আনন্দে উৎফুল্ল হবে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সাহায্য করেন এবং তিনি পরাক্রমশালী ও মেহেরবান।

তবে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো মানুষকে বুঝতে হবে জীবনে আনন্দ লাভের সর্বোত্তম উপায় হলো পরিকল্পিত জীবনযাপন করা এবং বর্তমান নিয়ে ভাবা। যে অতীত চলে গেছে তা নিয়ে ভেবে লাভ নেই এবং যে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কারও জানা নেই আসবে কি আসবে না-তা নিয়েও ভেবে লাভ নেই। এইসব ধারণা আমাদের ভাবনার জগতকে আরও সমৃদ্ধ করুক, সুখ-শান্তি ও প্রফুল্লতা নিশ্চিত হোক জীবনে-এই প্রত্যাশায় আজকের আসর এখানেই গুটিয়ে নিচ্ছি। কথা হবে আবারও পরবর্তী আসরে। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো:আবুসাঈদ/ ১৭