মে ০৯, ২০১৮ ১৪:১৪ Asia/Dhaka

সেই কিশোর ও যুব বয়সেই সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখতে শুরু করেছিলেন তিনি। পবিত্র কুরআনের সূরা কালামে হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর মহান চরিত্রের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ইন্নাকা লা আলা খুলুকিন আজিম। অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সুমহান চারিত্রিক আদর্শ দিয়ে সৃষ্টি করেছি।

আজকের আসরে আমরা বিবি খাদিজা সালামুল্লাহি আলাইহার সঙ্গে তাঁর পরিচয়, বিবাহবন্ধন এবং নবুওয়াতপ্রাপ্তি সম্পর্কে আলোচনা করব। আশা করছি শেষ পর্যন্ত আপনাদের সঙ্গ পাব।

খুওয়াইলিদ কন্যা খাদিজা ছিলেন কুরাইশ বংশের একজন সম্ভ্রান্ত ও ধনাঢ্য নারী। তিনি অনেকদিন ধরেই নিজের ব্যবসার দেখভাল করার জন্য একজন বিশ্বস্ত মানুষের সন্ধান করছিলেন যিনি তার পণ্য সিরিয়ার বাজারে বেচাকেনা করবেন। ঠিক সে সময় মুহাম্মাদ (সা.) ২৫ বছরের যুবক। তাঁর সততা ও আমানতদারির কথা মক্কার মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। এই পুত-পবিত্র মানুষটিকে তখন সকলে আল-আমিন নামে ডাকতে শুরু করেছে।

একদিন কুরাইশ নেতা আবু তালিব নিজের ভাতিজাকে ডেকে বলেন: হে মুহাম্মাদ! খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ নিজের বাণিজ্য দেখভাল করার জন্য একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তির সন্ধান করছেন। আমার পরামর্শ হচ্ছে, তুমি খাদিজার কাছে গিয়ে এই দায়িত্বভার গ্রহণ করো।   

 

চাচার কথায় চিন্তায় পড়ে গেলেন মুহাম্মাদ (সা.)। তিনি নিজে থেকে আগ বাড়িয়ে এ কাজ করতে চাচ্ছিলেন না। চাচাকে বিনয়ের সঙ্গে বললেন: হয়ত খাদিজা নিজেই আমার সন্ধানে লোক পাঠাবেন। শেষ পর্যন্ত হলোও তাই। চাচা-ভাতিজার এ কথোপকথন খাদিজার কানে পৌঁছামাত্র তিনি মুহাম্মাদ (সা.)-এর কাছে লোক পাঠান। তাকে বলেন, আপনার সত্যবাদিতা, আমানতদারি ও উন্নত চারিত্রিক গুণাবলী আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমার বাণিজ্যের দায়িত্ব নিলে আমি আপনাকে দ্বিগুণ লাভ দেব এবং আপনার নির্দেশ পালনের জন্য দু’জন গোলামকে আপনার সঙ্গে দিয়ে দেব। আল্লাহর রাসূল এই প্রস্তাবের কথা ঘরে ফিরে চাচা আবু তালেবকে জানান। চাচা তখন বলেন: তোমার জীবনের শ্রীবৃদ্ধির জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকেই এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তুমি যাও। চাচার অনুমতি নিয়ে জীবনের প্রথম বাণিজ্যিক সফরে যাওয়ার জন্য তৈরি হন মুহাম্মাদ (সা.)।

সে সময় কুরাইশ বংশের সব বণিক একসঙ্গে বাণিজ্যিক সফরে বের হতেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিবি খাদিজার পণ্যসামগ্রী নিয়ে উটের পিঠে সওয়ার হন আল্লাহর রাসূল। খাদিজা তাঁর দুই গোলামকে বলে দেন, তারা যেন মুহাম্মাদের প্রতিটি নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে।

এই সফরে কুরাইশের সব বণিক ব্যাপক লাভ করেন, তবে মুহাম্মাদ (সা.)-এর লাভ হয় সবচেয়ে বেশি। ফেরার পথে তিনি আদ ও সামুদ জাতির ধ্বংসাবশেষ দ্বিতীয়বারের মতো অতিক্রম করেন। এর আগে একবার চাচা আবু তালিবের সঙ্গে এই পথে যাওয়ার সময় ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদটি দেখেছিলেন। একটি জাতির ধ্বংস হয়ে যাওয়ার বিষয়টি তাঁকে ভাবিয়ে তোলে।

মক্কায় ফিরে আসার পর বিবি খাদিজার বিশ্বস্ত গোলাম মায়সারা সফরের পুরো ঘটনাকে তার কাছে খুলে বলে। গোলামের বক্তব্যে মুহাম্মাদের সুমহান চরিত্রের বিষয়টি আরো বেশি স্পষ্ট হয়ে যায়। মায়সারা বলতে থাকে: “বেচাকেনার সময় এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে মুহাম্মাদের কথা কাটাকাটি হয়। ওই ব্যক্তি তাঁকে বলে, তুমি যদি প্রভু লাত ও উজ্জা’র নামে শপথ করে বলো তাহলে আমি বিশ্বাস করব। এ কথার জবাবে মুহাম্মাদ বলেন, তুমি যাদের নাম উচ্চারণ করলে আমার কাছে তাদের চেয়ে নিকৃষ্ট সৃষ্টি আর হতে পারে না।” মায়সারা আরো জানায়, “ভ্রমণের পথে একটি গির্জার পাশে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন মুহাম্মাদ। এ সময় গির্জার পাদ্রী আমার কাছে তাঁর নাম জানতে চান। আমি নাম বলার পর তিনি বলেন, এই গাছের নীচে যে ব্যক্তি শুয়ে আছেন তিনি হচ্ছেন সেই শেষ নবী যার সুসংবাদ তাওরাত ও ইঞ্জিলে বহুবার দেয়া হয়েছে।” 

বিবি খাদিজা সালামুল্লাহি আলাইহা

 

ক্রীতদাসের মুখে মুহাম্মাদ (সা.)-এর এসব প্রশংসা শুনে মোহমুগ্ধ হয়ে যান বিবি খাদিজা। এর কিছুদিন পর তিনি আল্লাহর রাসূলের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। মুহাম্মাদ (সা.) এ প্রস্তাব কবুল করেন। এ সময় বিবি খাদিজার বয়স ছিল ৪০ এবং মুহাম্মাদ (সা.) ছিলেন ২৫ বছরের যুবক। বিয়ের পর খাদিজা নিজের সব সম্পদ মুহাম্মাদের হাতে তুলে দেন। সঙ্গে দেন দুই গোলামকেও। আল্লাহর রাসূল দুই গোলামকে সঙ্গে সঙ্গে মুক্ত করে দেন এবং এটি ছিল ক্রীতদাস প্রথার বিরুদ্ধে তাঁর প্রথম সংগ্রাম।

বিয়ের পর যতই দিন যাচ্ছিল বিবি খাদিজা সালামুল্লাহি আলাইহা তত বেশি আল্লাহর রাসূলের সুমহান চারিত্রিক গুণাবলীর সঙ্গে পরিচিত হচ্ছিলেন, তত বেশি মুগ্ধ হচ্ছিলেন। স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর আচার ব্যবহারের কোনো তুলনা ছিল না। পাশাপাশি গভীর রাতে একনিষ্ঠ চিত্তে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হয়ে থাকা মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর কাছে আরো বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছিলেন।

মাঝেমধ্যে ধ্যান করার জন্য তিনি হেরা পর্বতের গুহায় চলে যেতেন এবং কখনো কখনো টানা কয়েকদিন পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করতেন। এ সময় বিবি খাজিদা রাসূলের চাচাত ভাই আলীকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর জন্য খাবার ও পানি দিয়ে আসতেন।

হেরা পর্বতের গুহা

 

এভাবে কয়েকদিন ঘর থেকে দূরে থাকার পর খাদিজা মাঝেমধ্যে নিজের এবং সন্তানদের কথা তুলে ধরে তাঁকে ঘরে ফিরতে বলতেন। শিশু আলী ইবনে আবু তালিবও একই আবেদন জানাতেন। কিন্তু তাদের আবেদনের জবাবে আল্লাহর রাসূল বলতেন: “তোমাদের কথা আমি বুঝতে পারছি এবং তোমরাও তোমাদের প্রতি আমার ভালোবাসার কথা জানো। কিন্তু এখন কেন জানি দয়াময় স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালার স্মরণ ও ভালোবাসা ছাড়া অন্য কোনো কিছু আমার মনে স্থান পাচ্ছে না।”

শেষ পর্যন্ত এল রহস্যে ঘেরা সেই কাঙ্ক্ষিত রাত। মক্কা শহরের সবাই তখন গভীর ঘুমে অচেতন। গোটা পরিবেশ অদ্ভুতভাবে নিস্তব্ধ। মনে হচ্ছিল যে, আকাশ-বাতাস-পৃথিবী সেই মহান ঘটনার সাক্ষী হওয়ার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুণছে। মুহাম্মাদ (সা.) রাতের বেশিরভাগ সময় জেগে থাকতেন। রাতের সে অন্ধকারে কোনো শব্দ কানে আসছিল না। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকানোর মতো নুরের আলোয় চারদিক উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মুহাম্মাদ (সা.)-এর সামনে উপস্থিত হন ওহীর ফেরেশতা জিব্রাইল। তিনি এর আগে তাকে স্বপ্নে দেখলেও এই প্রথম তাকে চোখের সামনে দেখতে পান। জিব্রাইল কাছে এসে মুহাম্মাদকে বুকে জড়িয়ে ধরে চাপ দেন। এরপর বলেন, ‘ইকরা’- হে মুহাম্মাদ, আপনি পড়ুন। মুহাম্মাদ আরো মনযোগ দিয়ে জিব্রাইলকে দেখে নেন। চোখের সামনে কিছু একটা লেখা দেখতে পান।

জিব্রাইল এবার বলেন, ‘ইকরা বিসমি রব্বি কাল্লাজি খলাক’। পড়ুন আপনার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। মুহাম্মাদ কম্পিত কণ্ঠে বলেন: আমি কি পড়ব? আমি তো পড়তে জানি না।  এ সময় ওহীর ফেরেশতা বলেন: পড়ুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন।  যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাটবদ্ধ রক্ত থেকে। পড়ুন আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু।  যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন।  শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।   

 

মুহাম্মাদ (সা.) এতদিন সৃষ্টিকর্তার বাণী শোনার এই মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আনন্দ অনুভূতি তাঁর সমস্ত অস্তিত্বকে গ্রাস করে নিয়েছিল। তিনি জিব্রাইলের সঙ্গে পড়তে শুরু করেন। ইকরা বিসমি রব্বি কাল্লাজি খলাক।

জিব্রাহিল চলে যাওয়ার পর আল্লাহর নবী (সা.) বিস্মিত ও হতবিহ্বল অবস্থায় ঘরে ফিরে আসেন এবং স্ত্রী খাদিজাকে ঘটনাটি খুলে বলেন। বিবি খাদিজা তার চাচাত ভাই ওয়ারকা বিন নওফেলের কাছে যান। বিজ্ঞ চিন্তাবিদ ও খ্রিস্টধর্মে জ্ঞানী নওফেল পুরো ঘটনা শুনে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, মুহাম্মাদই হচ্ছেন পৃথিবীর  বুকে আল্লাহর শেষ নবী। খাদিজা একবার সিরিয়ার এক পাদ্রীর কাছ থেকে যে কথা শুনেছিলেন এবার নওফেলের কাছে একই কথা শুনে খুশি হন। এমন মহাপুরুষের স্ত্রী হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করেন। সেইসঙ্গে নবীর স্ত্রী হিসেবে সামনের দিনগুলোর বন্ধুর পথের কথা স্মরণ করে নিজেকে মনে মনে প্রস্তুত করে নেন। ঘরে ফিরে তিনি চরম ভালোবাসা ও পরম শ্রদ্ধাভরে স্বামীকে উদ্দেশ করে বলেন: আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ- হে আল্লাহর রাসূল আপনার প্রতি সালাম।

এভাবে হিজরতে ১৩ বছর আগে রজব মাসের ২৭ তারিখ আল্লাহর রাসূল নবুওয়াতপ্রাপ্ত হন এবং শিরক, জুলুম ও অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে মানবজাতিকে মুক্তি দেয়ার সুমহান দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আর এই পথে প্রথম যে ব্যক্তি তাঁর প্রতি ঈমান আনেন এবং শ্রদ্ধাভরে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য মেনে নেন তিনি হলেন বিবি খাদিজা সালামুল্লাহি আলাইহা।

 

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/ ৯