ইরানের পণ্য-সামগ্রী: ইরানি কার্পেটের নকশা
ইরানের জলে-স্থলে, ক্ষেত-খামারে, বাগ-বাগিচায়, কল-কারখানায় উৎপাদিত বিচিত্র সামগ্রীর পাশাপাশি খনি থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন সামগ্রী এবং ইরানি নরনারীদের মেধা ও মনন খাটিয়ে তৈরি করা বিভিন্ন শিল্পের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য আমাদের সাপ্তাহিক আয়োজন "ইরানের পণ্য সামগ্রী" শীর্ষক আসরের আজকের পর্বে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি।
গত আসরে আমরা ইরানের ঐতিহ্যবাহী পণ্য কার্পেট নিয়ে কথা বলার এক পর্যায়ে বলেছি যে গালিচা বুণন শিল্পের বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে ইরানি কার্পেটগুলোকে নকশা ও ডিজাইনের ভিত্তিতে ১৯ ভাগে স্তরবিন্যাস করা যেতে পারে।
আরও বলা হয়েছিল শাহ আব্বাসি ডিজাইন, ইসলামি ডিজাইন, শিকারের স্থান, উপজাতীয়, জ্যামিতিক ডিজাইন, পুরাতাত্ত্বিক ডিজাইন, ঐতিহাসিক ভবন ডিজাইন ইত্যাদি ডিজাইন এই স্তরবিন্যাসের অন্তর্ভুক্ত। যাই হোক,আজকের আসরেও আমরা কার্পেট নিয়ে আরও কিছু কথা বলার চেষ্টা করবো।
ইরানের ঐতিহ্যবাহী কার্পেটের নকশা ও ডিজাইনের মধ্যে অপর একটি ধারা হলো উপজাতীয় নকশা। এই শ্রেণীর কার্পেট বোণার ক্ষেত্রে যেসব ডিজাইন ব্যবহার করা হয়েছে সে সবই নেয়া হয়েছে প্রকৃতি থেকে। যেমন গাছ পালা, লতাগুল্ম, জন্তু জানোয়ার ইত্যাদির ছবিই বেশি স্থান পেয়েছে উপজাতীয় নকশার কার্পেটে। উপজাতীয় নকশার অপর একটি বৈশিষ্ট্য হলো ছবিগুলোর জ্যামিতিক গঠন। এই ডিজাইনটি ইরানি কার্পেটের প্রাচীন মডেলগুলোর অন্যতম। এখনও ইরানের গ্রামাঞ্চলে বিশেষ করে বিভিন্ন শ্রেণীর উপজাতীয়দের মধ্যে এরকম জ্যামিতিক ডিজাইনের কার্পেট বোণার রেওয়াজ রয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, এই ডিজাইনগুলো গ্রামীণ বুণন শিল্পীদের কেউ শিখিয়ে দেয় নি। তারা নিজেরাই নিজেদের মেধাকে কাজে লাগিয়ে ডিজাইনগুলো তৈরি করেছে।
مواد اولیه رنگرزی سنتی فرش ایرانی
رنگرزی سنتی
رنگرزی سنتی فرش
تهیه رنگ به شیوه سنتی
رنگرزی سنتی فرش ایرانی
رنگرزی سنتی
رنگرزی سنتی
رنگ های طبیعی
উপজাতীয়দের তৈরি জ্যামিতিক ডিজাইনের ঐতিহ্যবাহী কার্পেটগুলোর চাহিদা বিশ্বব্যাপী। তবে বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষ ইরানের উপজাতীয় যেসব নকশা পছন্দ করে সেগুলো উৎপন্ন হয় তুর্কামান, কাশকয়ি, বাখতিয়রি, লোর এবং কুর্দি উপজাতীয়দের মধ্যে।
কার্পেট শিল্পীরা আরও যে ডিজাইনটি ব্যবহার করেন তার মধ্যে রয়েছে বিল্ডিংয়ের সজ্জা বা অলংকরণের আঙ্গিক। টাইলসের ডিজাইন, বড় বড় বিল্ডিংয়ের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য যেসব আঙ্গিক বা নকশা ব্যবহার করা হয় সেসব থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এসব ডিজাইন করা হয়েছে। এ ধরনের কার্পেট যারা ডিজাইন করেন তারা অনেক সময় বিল্ডিংয়ের ডিজাইন থেকে পাওয়া ধারণার সঙ্গে নিজস্ব মেধাকে কাজে লাগিয়ে সংমিশ্রিত ডিজাইনের জন্ম দেন। তবে যতোই মেধার প্রয়োগ করেন ভবনের ডিজাইনের মূল আঙ্গিক অক্ষুন্ন থেকে যায়।
ভবনের ডিজাইন থেকে নেয়া উপজাতীয় কার্পেটের নকশার কথা বলছিলাম। এ ধরনের যেসব ভবন বা ডিজাইন থেকে কার্পেট শিল্পীরা অনুপ্রাণিত হয়েছেন সেসব নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে বেশ কিছু স্থাপনা। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় ইস্ফাহানে অবস্থিত ঐতিহাসিক শেখ লুৎফুল্লাহ জামে মসজিদের কথা। কিংবা নিশাবুরের ইমামজাদা মাহরুক স্থাপনার মূল দ্বার, ইস্ফাহানের ইমাম মসজিদ, শিরাজের তাখতে জামশিদ বা পার্সপোলিস এবং কেরমানশাহের ত্বক বোস্তন ইত্যাদি। এইসব স্থাপনায় যেসব নকশা বা ডিজাইন রয়েছে, সেগুলো ঐতিহাসিক নি:সন্দেহে। আর সেইসব ঐতিহাসিক নকশাগুলো থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কার্পেট শিল্পীরা যেসব নকশা তৈরি করেছেন সেইসব কার্পেটও এখন বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে সমাদৃতি পেয়েছে।
কার্পেটের সঙ্গে যেসব ইরানির নিবিড় পরিচয় রয়েছে তারা জানেন যে বেশিরভাগ কার্পেটকেই নকশা এবং ডিজাইনের মাধ্যমেই তারা চেনে। কিন্তু ইরানের বাইরে ইরানি নকশা বা ডিজাইনগুলো বেশিরভাগ বুণন এলাকার মাধ্যমেই পরিচিত। ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি অর্গানাইজেশন বা ডব্লিও,আই,পি,ও-তে ইরানি হাতে বোণা কার্পেটের জন্য ইরানের বিখ্যাত বহু এলাকার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। যেমন তাব্রিজ, হেরিস, খোই, ইস্ফাহান, কোম, মাশহাদ, হামেদান, কশ্মার, কাশান, কেরমান, নয়িন, সরুক, ইয়াযদ, আর্দেবিল এবং তুর্কামান বা গুলেস্তান ইত্যাদি। এসব শহরের মধ্যে শিল্প-সংস্কৃতি ও হস্তশিল্প সামগ্রির দিক থেকে অন্যতম তাব্রিজ শহরকে ওয়ার্ল্ড ক্র্যাপ্টস কাউন্সিলের পক্ষ থেকে " বিশ্ব কার্পেট বুণন শহর' নামে অভিহিত করা হয়েছে। এখানে রয়েছে ঐতিহাসিক 'মোজাফফারিয়া বাজার'এবং কার্পেট মিউজিয়াম।
কার্পেট শিল্পের ক্ষেত্রে ইরানের বহু প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা সক্রিয় রয়েছে। 'ইরানের জাতীয় কার্পেট কেন্দ্র" এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান। দেশে বিদেশে ইরানের হাতে বোণা কার্পেটের পরিচয় তুলে ধরা এবং কার্পেট বুণন শিল্পী ও এই শিল্পকে যথাসাধ্য পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়াই কেন্দ্রটির মূল উদ্দেশ্য। 'ইরানের জাতীয় কার্পেট কেন্দ্র" প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০০৩ সালে। দেশের বাইরে কার্পেট রপ্তানি করার ক্ষেত্রেও এই প্রতিষ্ঠানটি ভূমিকা রাখছে। এই কেন্দ্রের উদ্যোগে দেশের অভ্যন্তরে বেশ কয়েকটি কার্পেট মেলার আয়োজন করেছে। সেইসঙ্গে অন্যান্য দেশেও ইরানের কার্পেট শিল্পীদের এবং উৎপাদনকারীদের উপস্থিতির ক্ষেত্র তৈরি করেছে এই প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি হাতে বোণা কার্পেটের পঁচিশতম মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে তেহরানে। www.wikicarpet.com এই অ্যাড্রেসে মেলা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
তো বন্ধুরা! হাতে আজ আর সময় নেই। কার্পেট নিয়ে বেশ কটি অনুষ্ঠান করলাম আমরা। তারপরও পরিচিতিটা একেবারেই সামান্য। বিস্তারিত ধারণা পেতে চাইলে আমরা যে ওয়েব অ্যাড্রেসটির কথা বললাম সেই অ্যাড্রেসে ব্রাউজ করতে পারেন। #
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/ ২৩