রমজান: খোদাপ্রেমের বসন্ত (পর্ব- ১৩)
মহান আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন যাতে বিশ্ব-জগতে মানুষ হতে পারে তাঁর প্রতিনিধি।
যে কোনো প্রতিনিধির কাজ হল তিনি যার প্রতিনিধিত্ব করছেন তাঁরই নীতি অনুসরণ করা তথা তাঁর বিধি-বিধানগুলো মেনে চলা এবং তিনি যেসব লক্ষ্য অর্জন করতে চান সেসবের জন্য যথাসাধ্য কাজ করা। তাই এক অর্থে প্রত্যেক মানুষই হচ্ছে মহান আল্লাহর এক একজন দূত। অন্যদিকে প্রত্যেক মানুষই হচ্ছে মহান আল্লাহর দাস বা বান্দাহ। আর প্রকৃত দাসের কাজ হল তার মনিবের সব হুকুম ও ইচ্ছাগুলো বাস্তবায়নের জন্য একনিষ্ঠভাবে কাজ করা। একজন দূত বা প্রতিনিধি তার মূল কর্তার অনেক গুণ ও দায়িত্বেরও প্রতিনিধিত্ব করেন। তাই আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে মানুষকে হতে হবে পবিত্র, কারণ মহান আল্লাহ পবিত্রতা ভালবাসেন। আর পবিত্রতা অর্জনের জন্য সব ধরনের পাপ থেকে দূরে থাকতে হবে। মহান আল্লাহ জালিমদের প্রতি কঠোর। তাই প্রকৃত মানুষ বা আল্লাহর প্রকৃত প্রতিনিধি হতে হলে একজন মুসলমানকেও হতে হবে জালিমের প্রতি কঠোর। আল্লাহ সৎকর্মশীল ও ধৈর্যশীলদের পছন্দ করেন। তাই প্রকৃত মানুষ তথা মুসলমানকে হতে হবে অন্য অনেক গুণের পাশাপাশি এই দুই গুণেরও অধিকারী। অর্থাৎ প্রকৃত মানুষকে হতে হবে সৎকর্মশীল ও সৎকর্মশীলদের বন্ধু এবং ধৈর্যশীল ও সবরকারীদের সহযোগী।

মোটকথা মানুষ যদি আল্লাহর প্রতিনিধি তথা প্রকৃত মানুষ হতে চায় তাহলে তাকে হতে হবে কৃতজ্ঞ, পরোপকারী, দানশীল, ন্যায়নিষ্ঠ, ক্ষমাশীল, জালিমের প্রতি কঠোর ও মজলুমের বন্ধু, মুমিনের প্রতি কোমল ও ইসলামের শত্রু কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং পবিত্র কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত এ ধরনের আরও অনেক গুণের অধিকারী। মানুষ যখন এভাবে আল্লাহর প্রকৃত প্রতিনিধি হবেন তখনই তাকে বলা যাবে সৃষ্টির সেরা তথা আশরাফুল মাখলুকাত। আর খোদায়ি গুণগুলো অর্জনের এবং শয়তানি স্বভাবগুলো বর্জনের অনুশীলনের সবচেয়ে বড় ও মোক্ষম ঋতু হল পবিত্র রমজান মাস। প্রকৃত মানুষ বা মুসলমান রমজান মাসকে সামনে রেখে বা অন্য যে কোনো সময়ে মজুদদারি, অন্যায্য মূল্যবৃদ্ধি, ভেজাল পণ্য-বিক্রি কিংবা অন্য কোনো পাপই করতে পারেন না। একজন ভালো মুসলমানের উচিত বিগত দিনের চেয়ে নতুন দিনে নিজেকে বেশি উন্নত করা। একটি হাদিসের বক্তব্য অনুযায়ী যার দুই দিন পর পর একই অবস্থা হয় আত্মশুদ্ধি বা আত্ম-উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার জন্য এটা অশুভ বা আক্ষেপের বিষয়। কিন্তু যার অবস্থা আগের দিনের চেয়ে খারাপ হয় তাকে তো আরও বেশি সতর্ক হতে হবে।
নামাজ ও রোজা ও হজ কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই ধরনের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেয়। হজের সময় ইহরাম অবস্থায় থাকতে হয়। এ সময় অনেক বৈধ বিষয়ও বর্জন করেন হজযাত্রী। আর এই প্রশিক্ষণের আলোকে হজযাত্রী পরে নিজেকে ও সমাজকে সংশোধন করতে পারেন। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, নামাজ মানুষকে অশ্লীলতা থেকে রক্ষা করে। হজ, রোজা ও জাকাতও এই একই বা এই জাতীয় অনেক সুফল দেয়। এভাবে ইসলামের নানা ধরনের ইবাদত মহান আল্লাহর প্রেমিক ও তার যোগ্য প্রতিনিধি হিসেবে মানুষকে গড়ে তোলে এবং মানুষের জন্য নানা কল্যাণ বয়ে আনে।
রোজা মানুষকে সংযম শেখায়। তবে সংযমের অর্থ বৈরাগ্য সাধন তথা ঘর-সংসার ও প্রচলিত বৈধ এবং মানবীয় কাজগুলো থেকে দূরে থাকা নয়। ইসলামে উচ্চস্তরের খোদাভীতি বা তাকওয়া অর্জনের জন্য যোহদ্ বা সংযম চর্চার বিশেষ নীতিমালা রয়েছে। এই যোহদের মানে হল কোনো সম্পদ, পদ, সম্মান বা বস্তুগত কিছু হারিয়ে দুঃখ না করা এবং কোনো কিছু অর্জন করে গর্ব বা মহা-আনন্দ অনুভব না করা।
ধন-সম্পদ, খ্যাতি ও প্রভাব-প্রতিপত্তি-এসব যেন মানুষের নিয়ন্ত্রক না হয়-এটাই হল ইসলামী যোহদ বা সংযমের দাবি। মানুষ যখন এসব বিষয়ের গোলাম হয়ে পড়ে তখন সে আর নীতি-নৈতিকতা এবং হালাল-হারামের ধার ধারে না। অন্যদিকে সংযমের নামে স্ত্রী-পুত্র-পরিজন, হালাল বস্তু বা সম্পদ ও বৈধ আনন্দ এবং সমাজ থেকে দূরে থাকাটা হচ্ছে এমন এক চরম-পন্থা যার অনুমতি ইসলাম মানুষকে দেয়নি। কখনও কখনও মানুষ ইবাদতকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে সমাজ-সংসারকে পুরোপুরি বিসর্জন দেয় এবং অন্য এক শ্রেণীর মানুষ সমাজকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে ইবাদত-বন্দেগি পুরোপুরি বর্জন করে।- এ দুই ধরনের আচরণই বাড়াবাড়ি হিসেবে ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। অন্য কথায় সমাজবিমুখ ইবাদত ও ইবাদতবিমুখ সমাজমুখিতা- উভয়ই ইসলামে নিন্দনীয়।
পবিত্র রমজানের ফজিলত সম্পর্কে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ জনাব মুহাম্মাদ মুনির হুসাইন খান বলেছেন:
ইমাম সাদিক ( আঃ) বলেছেনঃ মহান আল্লাহ ১লা রমযানের রাতে স্বীয় বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা তাকে ক্ষমা করেন। রমযানের দ্বিতীয় রজনীতে প্রথম রাতে যাদের ক্ষমা করেছেন তাদের দ্বিগুণ সংখ্যককে তিনি ক্ষমা করেন। আর রমযানের তৃতীয় রাতে পূর্বে যাদেরকে তিনি ক্ষমা করেছেন তাদের দ্বিগুণ সংখ্যককে তিনি ক্ষমা করেন। আর ঠিক এভাবে রমযান মাসের শেষ রাত পর্যন্ত প্রতি রাতে তিনি যত বান্দাকে দোযখের আগুন থেকে মুক্ত করেছেন তার দ্বিগুণ সংখ্যক বান্দাকে ক্ষমা করেন ( এবং দোযখের আগুন থেকে মুক্ত (( আযাদ )) করেন।)
আমরা অনেক সময় মনে করি যে সঠিক পথে চলার জন্য জ্ঞান অর্জনই যথেষ্ট। কিন্তু তা ঠিক নয়। শিক্ষিত মানুষেরা জেনে শুনেও অনেক ক্ষতিকর কাজ করতে পারেন। যেমন, ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এই জ্ঞানটুকু থাকা সত্ত্বেও অনেকেই ধূমপান করে যাচ্ছেন। এভাবে অনেক জ্ঞানই আমাদের কোনো কল্যাণে আসছে না। ধর্মতত্ত্বের ছাত্রদের নৈতিক শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে বলা হয়, জ্ঞানী বা ধর্মপ্রচারক হওয়া সহজ, কিন্তু মানুষ হওয়া খুবই কঠিন।
জ্ঞানপাপীদের তওবা আল্লাহ মৃত্যুর কিছু আগ থেকেই আর ক্ষমা করেন না। কিন্তু অজ্ঞদের তওবা আল্লাহ তাদের জীবনের শেষ মিনিট পর্যন্ত কবুল করে থাকেন। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী কোনো আলেমের একটি গুনাহ ক্ষমা হবার আগে একজন অজ্ঞ মানুষের ৭০টি পাপ ক্ষমা করা হবে।

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/ ১৩