সূরা আল মায়েদাহ; আয়াত ৭২-৭৫ (পর্ব ২১)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আল মায়েদাহ'র ৭২ থেকে ৭৫ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হবে। এই সূরার ৭১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَقَالَتْ طَائِفَةٌ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ آَمِنُوا بِالَّذِي أُنْزِلَ عَلَى الَّذِينَ آَمَنُوا وَجْهَ النَّهَارِ وَاكْفُرُوا آَخِرَهُ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ (72)
"তারা কাফের, যারা বলে যে, মরিময়-তনয় মসীহই আল্লাহ; অথচ মসীহ বলেন, হে বনি-ইসরাঈল, তোমরা আল্লাহর এবাদত কর, যিনি আমার পালন কর্তা এবং তোমাদেরও পালনকর্তা। নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরিক বা অংশীদার স্থির করে, আল্লাহ তার জন্যে জান্নাত বা বেহেশত হারাম করে দেন। এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই।" (৫:৭২)
গত কয়েকটি পর্বে আমরা ইহুদিদের চিন্তাগত ও জ্ঞানগত বিচ্যুতিগুলো সম্পর্কে কোরআনের বক্তব্য জেনেছি। তারা গোড়ামির কারণে সত্যকে মেনে নেয়নি। আর এ আয়াতে মহান আল্লাহ খ্রিস্টানদের বলছেন: তোমরা কিভাবে মাসিহ বা হযরত ঈসা (আ.)-কে আল্লাহর পুত্র বা স্বয়ং আল্লাহ বলে মনে কর। মাসিহ কি নিজে এ ধরনের দাবি করেছেন, নাকি তোমরা ইহুদিদের মোকাবেলায় নিজ ধর্মকে বড় করে দেখানোর জন্য এ ধরনের দাবি করছ? তোমরা জেনে রাখ, মাসিহ বা হযরত ঈসা (আ.)-কে নিয়ে তোমরা যেসব অদ্ভুত কথা বলছ তা তোমাদের বিশ্বাসকে ও তোমাদেরকে অন্যদের চেয়ে বড় করছে না, বরং শির্ক বা অংশীবাদীতার মাধ্যমে কলুষিত করছে। তোমরা এর মাধ্যমে একত্ববাদ থেকে দূরে সরে গেছ এবং আল্লাহর ঘনিষ্ঠতা অর্জনের পরিবর্তে তাঁর কাছ থেকে নিজেদের বিতাড়িত করেছ। ফলে তোমরা দয়াময় আল্লাহর বেহেশত থেকে বঞ্চিত হবে এবং জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হবে, যে আগুন সহ্য করার ক্ষমতা কারো নেই ও সেখানে তোমরা কোনো সাহায্যকারী বা উদ্ধারকারী পাবে না।
বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, বর্তমান যুগে প্রচলিত বাইবেলেও দেখা যায় মাসিহ বা হযরত ঈসা (আ.) তাঁর কোনো বক্তব্যেই এ দাবি করেননি যে তিনি আল্লাহর পুত্র বা অন্যতম খোদা। বরং মারকসের বাইবেলের ১২ তম অধ্যায়ের ২৯ তম বাক্যে তিনি বলেছেন: আমাদের আল্লাহ বা স্রস্টা মাত্র একজন।
এ আয়াত থেকে আমাদের মনে রাখা দরকার:
এক. বিশ্বাসে ও কাজে যেমন কোনো ঘাটতি বা কমতি গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি ধর্মের প্রধানদের ব্যাপারে অতিরঞ্জিত করা বা বাড়িয়ে বলাও বৈধ নয়। কারণ, ঈমানের দাবি করা সত্ত্বেও এ ধরনের অতিরঞ্জন শির্ক ও কুফর।
দুই. কেউই পাপীদেরকে দোযখ থেকে মুক্ত করতে পারবে না। এমনকি হযরত ঈসা (আ.)ও কাউকে দোযখ থেকে মুক্ত করতে পারবেন না, তাই কেউ যেন তাকে খোদা মনে করে দোযখ থেকে মুক্তির আশা না করে।
সূরা মায়েদার ৭৩ ও ৭৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَلَا تُؤْمِنُوا إِلَّا لِمَنْ تَبِعَ دِينَكُمْ قُلْ إِنَّ الْهُدَى هُدَى اللَّهِ أَنْ يُؤْتَى أَحَدٌ مِثْلَ مَا أُوتِيتُمْ أَوْ يُحَاجُّوكُمْ عِنْدَ رَبِّكُمْ قُلْ إِنَّ الْفَضْلَ بِيَدِ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ (73) يَخْتَصُّ بِرَحْمَتِهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ (74)
"নিশ্চয় তারা কাফের, যারা বলেঃ আল্লাহ তিনের এক; অথচ এক উপাস্য ছাড়া কোন উপাস্য নেই। যদি তারা নিজ উক্তি থেকে নিবৃত্ত না হয়, তবে তাদের মধ্যে যারা কুফরে অটল থাকবে, তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি পাবে।" (৫:৭৩)
"তারা আল্লাহর কাছে তওবা করে না কেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে না কেন? আল্লাহ যে ক্ষমাশীল, দয়ালু।" (৫:৭৪)
আগের আয়াতে হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে খ্রিস্টানদের বিশ্বাস তথা তাঁকে মানুষের চেয়েও বড় কোনো সত্তা ও এমনকি আল্লাহর মর্যাদায় আসীন করার পরিণতি সম্পর্কে তাদেরকে সতর্ক করা হয়েছে। এ দুই আয়াতে বলা হচ্ছে- তাদের এ ধরনের বিশ্বাস সৃষ্টিকূলের স্রস্টা মহান আল্লাহকে তাঁর মূল মর্যাদার চেয়ে অনেক ছোটভাবে তুলে ধরছে। আল্লাহকে তিন খোদার মধ্যে অন্যতম বলে দাবি করে খ্রিস্টানরা। অথচ প্রভুত্বের বিষয়টি সৃষ্টিকর্তা থেকে পৃথক নয়। স্রস্টা যদি একজন হন, তবে উপাস্যও হবে মাত্র একজনই। খ্রিস্টানদের এ সব অদ্ভুত ও বিচ্যুত দাবির ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে আল্লাহ বলছেন, যারা নিজ বিশ্বাস সংশোধন করতে প্রস্তুত নয়, তাদেরকে আল্লাহ কঠোর শাস্তি দেবেন। আর যদি তারা তওবা করে এক আল্লাহর দিকে ফিরে আসে তাহলে তারা অবশ্যই মুক্তি পাবে ও আশ্রয় পাবে আল্লাহর রহমতের ছায়াতলে।
এ আয়াত থেকে আমাদের মনে রাখা দরকার:
এক. কোরআন অতীতের ধর্ম ও নবী-রাসূলকে স্বীকৃতি দেয়ার পাশাপাশি ঐশী কিতাবগুলোর এবং নবী-রাসূলদের শিক্ষার বিকৃতির কথা তুলে ধরেছে। এভাবে কোরআন সত্যকে যথাযথভাবে তুলে ধরার ও বিচ্যুত ব্যক্তিদের সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে।
দুই. কুফর বলতে কেবল আল্লাহকে অস্বীকার করাকেই বোঝায় না। আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করাও এক ধরনের কুফর।
তিন. কেউ যদি আন্তরিক চিত্তে অনুতপ্ত হয় ও তওবা করে তবে আল্লাহ তার অতীতের সমস্ত পাপ ক্ষমা করবেন এবং তার ভবিষ্যতকেও রহমত ও দয়ার মাধ্যমে সমৃদ্ধ করবেন।
সূরা মায়েদার ৭৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَمِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ مَنْ إِنْ تَأْمَنْهُ بِقِنْطَارٍ يُؤَدِّهِ إِلَيْكَ وَمِنْهُمْ مَنْ إِنْ تَأْمَنْهُ بِدِينَارٍ لَا يُؤَدِّهِ إِلَيْكَ إِلَّا مَا دُمْتَ عَلَيْهِ قَائِمًا ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَالُوا لَيْسَ عَلَيْنَا فِي الْأُمِّيِّينَ سَبِيلٌ وَيَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ وَهُمْ يَعْلَمُونَ (75)
"মরিয়ম-তনয় মাসিহ রাসূল ছাড়া আর কিছু নন। তাঁর আগেও অনেক রাসূল অতিক্রান্ত হয়েছেন, আর তাঁর জননীও একজন সত্যবাদী ও সৎকর্মশীল ছিলেন। তাঁরা উভয়েই খাবার খেতেন। (হে নবী! আপনি) দেখুন, আমি তাদের জন্যে কিরূপ যুক্তি-প্রমাণ বা নিদর্শন বর্ণনা করি, আবার দেখুন, তারা কিভাবে সত্যের বিপরীত দিকে যাচ্ছে!" (৫:৭৫)
মহান আল্লাহ ও হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে খ্রিস্টানদের বিচ্যুত চিন্তাধারা তুলে ধরার পর কোরআন এ আয়াতে তিনটি প্রমাণ তুলে ধরে বলছে যে, ঈসা মাসিহ আল্লাহ নন। কারণ, তিনি মায়ের গর্ভে জন্ম নিয়েছেন, অথচ আল্লাহ তো জন্ম নেন না। দ্বিতীয়ত: অতীতের নবীদের মধ্য থেকে আদম (আ.)-কেও ব্যতিক্রমী নিয়মে সৃষ্টি করেছেন মহান আল্লাহ। হযরত ঈসা (আ.)'র মা ছিলেন, কিন্তু হযরত আদম (আ.) মা ও বাবা ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেউ তাকে আল্লাহ মনে করত না। তৃতীয়ত: তর্কের খাতিরে ধরে নেয়া হলো হযরত ঈসা (আ.) জন্মের পর আল্লাহয় পরিণত হয়েছেন, আল্লাহ হওয়ার পরও কেন তিনি ও তাঁর মা মানুষের মত খাবার খেতেন? কেন তাঁরা খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন? খোদা কি ক্ষুধার্ত হন? তোমাদের খোদা কেমন অদ্ভুত ও খাদ্য-নির্ভর?
এ আয়াত থেকে আমাদের মনে রাখা দরকার:
এক. কোনো কোনো বিশেষ ব্যতিক্রম বা বিশেষ ক্ষমতা আল্লাহ হওয়ার প্রমাণ নয়। নবী. রাসূলদের মোজেজাও তাঁদেরকে আল্লাহর মর্যাদায় উন্নীত করে না।
দুই. সত্য বলা ও সৎ আচরণ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবীয় মূল্যবোধ। আল্লাহ হযরত মরিয়ম (সা.)কে এসব গুণের জন্যই সিদ্দিকা বলে সম্মানিত করেছেন।
তিন. হযরত মরিয়ম (সা.) ও তাঁর পুত্র হযরত ঈসা (আ.)-উভয়ই ছিলেন মানুষ, যদিও তাঁরা ছিলেন অনেক উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। #