সূরা আ'রাফ; আয়াত ৬৩-৬৬ (পর্ব-১৫)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা সূরা আ'রাফের ৬৩ থেকে ৬৬ নম্বর আয়াতের তাফসির উপস্থাপন করা হবে। এই সূরার ৬৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
أَوَعَجِبْتُمْ أَنْ جَاءَكُمْ ذِكْرٌ مِنْ رَبِّكُمْ عَلَى رَجُلٍ مِنْكُمْ لِيُنْذِرَكُمْ وَلِتَتَّقُوا وَلَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ (63)
"তোমরা কি এতে বিস্মিত হচ্ছো যে, তোমাদের কাছে তোমাদেরই এক পুরুষের মাধ্যমে তোমাদের প্রতিপালকের উপদেশ এসেছে যাতে সে তোমাদেরকে সতর্ক করে, যেন তোমরা সাবধানী হও এবং যেন তোমাদের দয়া করা হয়।" (৭:৬৩)
গত পর্বের আলোচনায় আমরা হযরত নুহ নবী (আ.)'র নবুওত প্রাপ্তি এবং তাঁর সঙ্গে স্বগোত্রীয় নেতাদের অবমাননাকর আচরণ সম্পর্কে কথা বলেছি। এ আয়াতে হযরত নুহ নবী (আ.) ওইসব অবমাননার জবাবে বলছেন, আল্লাহ তাঁর বাণী পৌছে দেয়ার জন্য মানুষের মধ্য থেকেই একজনকে বেছে নিয়েছেন। আল্লাহ তাঁর প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী নাজেল করেছেন খোদায়ী বাণীবাহক সেই নবীর ওপর। আর এটা কি অযৌক্তিক ও অদ্ভুত কোনো ব্যাপার যে তোমরা আমার সঙ্গে এ ধরনের অন্যায় আচরণ করছ? আমি কি সতর্ক করে দেয়ার কাজ ছাড়া অন্য কিছু করছি? আমি তোমাদের কাছে কিছু চেয়েছি যে তোমরা আমাকে এভাবে এড়িয়ে চলছ? তোমরা কি আল্লাহর রহমত বা দয়া কামনা কর না? যদি আল্লাহর দয়া পেতে চাও তাহলে আল্লাহকে ভয় কর এবং মন্দ ও অশোভনীয় কাজ করো না।
এ আয়াত থেকে আমাদের মনে রাখা দরকার:
এক. খোদায়ী প্রত্যাদেশ বা ওহী' র উদ্দেশ্য হল, মানুষকে সতর্ক করার মাধ্যমে প্রশিক্ষিত করা।
দুই. নবী-রাসূলরাও ছিলেন মানুষ। তাই সমাজের নেতা ও সর্দার শ্রেণীর মানুষ তাদেরকে মানতে চাননি।
সূরা আরাফের ৬৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
فَكَذَّبُوهُ فَأَنْجَيْنَاهُ وَالَّذِينَ مَعَهُ فِي الْفُلْكِ وَأَغْرَقْنَا الَّذِينَ كَذَّبُوا بِآَيَاتِنَا إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا عَمِينَ (64)
"অতঃপর তারা তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করল। আমি তাঁকে এবং যারা তাঁর সঙ্গে নৌকায় ছিল তাদেরকে পরিত্রাণ দিলাম এবং যারা আমাদের নিদর্শনগুলোকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল তাদের সবাইকে ডুবিয়ে দিয়েছি। নিশ্চয় তারা ছিল এক অন্ধ সম্প্রদায়।" (৭:৬৪)
যদিও খোদায়ী শাস্তি ও পুরস্কার মূলত পরকালীন বিষয়, কিন্তু আল্লাহ কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁর শাস্তির সামান্য অংশ এই পৃথিবীতেই কাফেরদের দেখিয়ে দেন। যেমনটি এ আয়াতে আল্লাহ বলছেন, নুহ (আ.)'র জাতির গোঁড়ামি ও অবাধ্যতা এতটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তাদেরকে ঝড়-তুফান ও মহাপ্লাবনের শিকার করি এবং তারা সবাই ডুবে গিয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে আমরা এই নবীকে একটি বড় নৌকা তৈরি করতে বলেছিলাম। ফলে নুহ ও মুমিন বান্দারা তাতে উঠে মহাপ্লাবন ও ঝড়ের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল।
আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, যাদের হৃদয় অন্ধ হওয়ার কারণে তারা সত্যকে দেখতে ও বুঝতে আগ্রহী ছিল না, তারা এমন শাস্তির শিকার হয়েছে যে বংশের বাতি রক্ষার জন্যেও তাদের কেউ বেঁচে থাকতে পারেনি।
এই আয়াত থেকে আমাদের মনে রাখা দরকার:
এক. ঈমান মানুষের রক্ষা পাওয়ার মাধ্যম আর খোদাদ্রোহীতা ধ্বংস ডেকে আনে।
দুই. তুফান ও বন্যার মত প্রাকৃতিক দূর্যোগ আল্লাহরই নিয়ন্ত্রণাধীন বিষয়। এইসব দূর্যোগও আল্লাহর ক্রোধের নিদর্শন।
সূরা আরাফের ৬৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
وَإِلَى عَادٍ أَخَاهُمْ هُودًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ أَفَلَا تَتَّقُونَ (65)
"আদ জাতির কাছে তাদের ভাই হুদকে (পাঠিয়েছিলাম)। সে বলল: হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহরই ইবাদত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোন উপাস্য নেই। তবুও কি তোমরা সাবধান (ও আত্মসংযমী) হবে না?" (৭:৬৫)
হযরত নুহ (আ.)'র ঘটনা বর্ণনার পর এই আয়াতে হযরত হুদ (আ.) ও আদ জাতির ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। আদ জাতির বাসস্থান ছিল হিজাজ বা আরব উপদ্বীপের দক্ষিণে ইয়েমেন অঞ্চলে। এরা শারীরিক শক্তির দিক থেকে ছিল খুবই শক্তিশালী। কিন্তু তারা অনৈতিকতা ও মূর্তি পূজায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল। তাই আল্লাহ এই জাতির মধ্য থেকে হুদ (আ.)-কে নবী হিসেবে মনোনীত করে তাদেরকে সত্য ও পবিত্রতার দিকে আহ্বান জানানোর দায়িত্ব দেন যাতে মূর্তি পূজাসহ অন্যান্য অনাচারের দাসত্ব থেকে তারা মুক্তি পায়। আল্লাহর ইবাদতই যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় পূর্ণতা তা বোঝানোর জন্য হযরত হুদ (আ.) তাঁর জাতির উদ্দেশে বলেন, তোমরা আসল স্রস্টা বা প্রভুর ইবাদত কর। সেই আসল প্রভু বা আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই। তাই তোমরা সৌভাগ্য অর্জনের জন্য এসব দূরাচার ও নোংরা কাজ ত্যাগ কর এবং আল্লাহকে ভয় কর।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় ক'টি দিক হল:
এক. নবী-রাসূলরা মানুষের সঙ্গে ভ্রাতৃসুলভ আচরণ করেছেন। তারা মানুষের কল্যাণকামীতায় ছিলেন সবচেয়ে বেশি আন্তরিক।
দুই. তাওহিদ বা একত্ববাদের প্রতি আহ্বান এবং অংশীবাদিতা বা শির্ক পরিত্যাগের উপদেশ ছিল যুগে যুগে নবী-রাসূলদের দাওয়াতের প্রধান বিষয়।
সূরা আরাফের ৬৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
قَالَ الْمَلَأُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَوْمِهِ إِنَّا لَنَرَاكَ فِي سَفَاهَةٍ وَإِنَّا لَنَظُنُّكَ مِنَ الْكَاذِبِينَ (66)
"(হযরত হুদ (আ.)'র দাওয়াতের জবাবে) আদ জাতির নেতারা, যারা ছিল অবিশ্বাসী, তারা বলল, নিশ্চয়ই আমরা তোমাকে নির্বুদ্ধিতায় লিপ্ত দেখছি এবং আমরা নিশ্চয়ই তোমাকে মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত মনে করি।" (৭:৬৬)
নুহ (আ.)'র জাতির মত আদ জাতিও নিজেদের নবীর আহ্বান নিয়ে ভাবনা চিন্তা না করেই তাঁকে উপহাস করল। তারা তাঁর বক্তব্যকে অদূরদর্শী ও আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত বক্তব্য নয় বলে উল্লেখ করল। তারা হযরত হুদ (আ.)-কে মিথ্যাবাদী বলেও অপবাদ দিল।
হ্যাঁ, অপবাদ ছাড়া কাফির-মুশরিকদের কোনো যুক্তি নেই। এমনকি তারা কথাবার্তায় শিষ্ঠাচারও বজায় রাখত না। বরং অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে নবী-রাসূলদেরকে নির্বোধ ও বোকা বলে অভিহিত করত। তাদের মতে নবী-রাসূলরা খেয়ালীপনা ও অজ্ঞতার শিকার হয়েই আবোল-তাবল কথা বলছেন মাত্র! কল্পনার শিকার হয়েই তাঁরা নিজেদের নবী-রাসূল বলে মনে করছেন।
এ আয়াতের দু'টি শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
এক. নবী-রাসূলরা কঠোরতম প্রচারণা, বিরোধীতা, অপবাদ তথা কঠোরতম মনস্তাত্তিক যুদ্ধের শিকার হতেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা সত্যের আহ্বানে অবিচল থাকতেন।
দুই. অজ্ঞ ও নির্বোধ ব্যক্তিরাই পৃথিবীর সবচেয়ে জ্ঞানী ও বিজ্ঞ ব্যক্তিদের জ্ঞানহীন মানুষ বলে অভিহিত করত এবং এমনকি তাদের মিথ্যাবাদী বলে অপবাদ দিত! #