আশুরার পরবর্তী পরিস্থিতি ও কারবালা বিপ্লবের প্রভাব
নিঃসন্দেহে কারবালার মর্ম বিদারী ঘটনা মানব ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় ঘটে যাওয়া অজস্র ঘটনাবলীর মধ্যে শিক্ষা ও গুরুত্বের দিক থেকে অনন্য।
এটা এমন এক মহাবিস্ময়কর ঘটনা, যার সামনে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষ বিশ্বের মহান চিন্তাবিদরা থমকে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছেন,পরম বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে তারা স্তুতি-বন্দনায় মুখিরত হয়েছেন এই নজিরবিহীন আত্মত্যাগের। কারণ, কারবালার কালজয়ী বিপ্লবের মহানায়করা ‘অপমান আমাদের সয় না’ -এই স্লোগান ধ্বনিত করে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য সংখ্যায় হাতে গোনা হওয়া সত্ত্বেও খোদায়ী প্রেম ও শৌর্যে পূর্ণ টগবগে অন্তর নিয়ে জিহাদ ও শাহাদাতের ময়দানে আবির্ভূত হন এবং প্রতারণা ও প্রবঞ্চনার অধঃজগতকে পেছনে ফেলে উর্দ্ধজগতে মহান আল্লাহর সনে পাড়ি জমান। তারা নিজ কথা ও কাজের মাধ্যমে জগতবাসীকে জানিয়ে দিয়ে যান যে,‘‘ যে মৃত্যু সত্যের পথে হয়, তা মধূর চেয়েও সুধাময়।’’

কারবালা ঘটনার একপিঠে রয়েছে পাশিবক নৃশংসতা ও নরপিশাচের কাহিনী এবং এ কাহিনীর হোতা ছিল ইয়াযিদ, ইবনে সা’দ, ইবনে যিয়াদ এবং শিমাররা। আর অপর পিঠে ছিল একত্ববাদ, দৃঢ় ঈমান, মানবতা, সাহসিকতা, সহানুভূতি ও সহমর্মিতা এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় আত্মদানের কাহিনী। আর এ কাহিনীর হোতা আর ইয়াযিদরা নয়, বরং এ পিঠের নায়ক হলেন শহীদ সম্রাট ইমাম হুসাইন (আ.),তার ভগ্নি হযরত যয়নাব এবং তার ভাই হযরত আব্বাসরা,যাদেরকে নিয়ে বিশ্বমানবতা গৌরব করতে পারে। তাই কারবালা ঘটনার সমস্তটাই ট্রাজেডি বা বিষাদময় নয়।
কারবালা বিপ্লবের বহু বিষাদময় ও তিক্ত ঘটনা এবং অসহনীয় যাতনা সয়ে ইমাম হুসাইন (আ)'র বোন ধৈর্যের অবিচল পাহাড়ের মত মনোবল নিয়েই নবী পরিবারের ধৈর্য ও মহান আল্লাহর প্রতি সর্বাবস্থায় সন্তুষ্টির পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে বলেছিলেন, এইসব ঘটনায় ইমাম শিবিরের দিক থেকে আমি বা আমরা সৌন্দর্য ছাড়া আর কিছুই দেখিনি।
মহান বীর হলো সেই ব্যক্তি সমস্ত মনুষ্যত্বও মানবতার জন্যে নিজের সাহস প্রয়োগ করে ঠিক যেভাবে সূর্য তার আলো দিয়ে সমস্ত জাতি ও সব মানুষকেই উপকার প্রদান করে। কারবালা বিপ্লবের আরেকটি মহান বৈশিষ্ট হল এ বিপ্লব যে অনুষ্ঠিত হবে তা ছিল মানুষের ধারণাতীত। এ ছিল ঘন অন্ধকারের মধ্যে এক খণ্ড আলোর ঝলকানি, ব্যাপক জুলুম-স্বৈরাচারের মধ্যে ন্যায়পরায়ণতার বজ্র আওয়াজ, চরম স্থবিরতার মধ্যে প্রকাণ্ড ধাক্কায় নিস্তব্ধ নিশ্চুপের মধ্যে হঠাৎ গর্জে ওঠা। ঠিক যেভাবে নমরুদের মতো একজন অত্যাচারী শোষক পৃথিবীকে গ্রাস করার পর হঠাৎ একজন ইবরাহীমের (আ.) আবির্ভাব ঘটে ও নমরুদের কাল হয়ে দাঁড়ায়।

আর আজ স্বৈরাচারী উমাইয়া সরকার স্বীয় স্বার্থসিন্ধির জন্যে সকল সাজ-সরঞ্জামে সজ্জিত হয়ে উঠে পড়ে লেগেছে। এমন কি ধর্মকে ভাঙ্গিয়েও স্বৈরতন্ত্রের ভিত গাড়তে উদ্যত হয়েছে, দুনিয়ালোভী হাদীস বর্ণনাকারীদেরকে টাকা দিয়ে কিনে তাদের সপক্ষে হাদীস জাল করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
শহীদরা হচ্ছেন সমাজে মোমবাতি। তারা নিজেদের জ্বালিয়ে পুড়িয়ে সমাজকে আলোকিত করেন। তারা যদি আলো না ছড়ান তাহলে কোনো প্রতিষ্ঠানই আলোকিত হবে না। ইমাম হুসাইন আশুরার দিনের ঘটনাগুলোর আগে তার সহযোগীদের উদ্দেশ্যে জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, সত্য অনুশীলন করা হচ্ছে না এবং মিথ্যা পরিহার করা হচ্ছে না। এমতাবস্থায় ঈমানদারকে অবশ্যই তার রবের সাথে সাক্ষাৎ করা উচিত। বর্তমান অবস্থায় মৃত্যু একটি আশীর্বাদ এবং জীবন হচ্ছে নির্যাতন। ইমাম হুসাইন (আ.) -এর এ ভাষণ তার সঙ্গী ও সাথীদের ঈমানের শক্তি আরো বৃদ্ধি করেছিল।
এদিকে ইমামের বোন হযরত যায়নাব জনসাধারণের মাঝে ইমাম হুসাইন –এর রক্ত-রঞ্জিত শাহাদাতের ঘটনা তুলে ধরায় তা প্রত্যাশিত ফল দিতে থাকে। ইবনে যিয়াদ বন্দি কাফেলা দ্রুত দামেস্কে পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হয়। তাড়াহুড়া করে এবং তুলনা মূলকভাবে স্বল্প পরিচিতি রাস্তা দিয়ে গিয়েও উমাইয়্যা বাহিনীকে দামেস্কের পথে উপহাস,বিরোধিতা,এমনকি খোদ কুফায় বিদ্রোহের সম্মুখীন হতে হয়। এসবের কিছু ঘটনা এখানে তুলে ধরব :
জনৈক অন্ধ অফিফ আজদী তার কান্যার সহায়তায় কুফায় বিদ্রোহ করেন। ইয়াযীদের যেসব লোক বন্দিদের এবং শহীদদের মাথা বহন করে নিয়ে যাচ্ছিল তাকরিতের লোকজন তাদেরকে শহরে প্রবেশ করতে দেয়নি। লাবিনাবাসী চিৎকার দিয়ে বলে : ‘হে নবীর বংশধরদের খুনীরা! আমাদের শহর থেকে বরিয়ে যাও।’ মসূলবাসী ইয়াযিদী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয় এবং যথাযথ মর্যাদায় দাফনের উদ্দেশ্যে তাদের কাছ থেকে শহীদদের মাথাগুলো ছিনিয়ে নেয়। এ খবর শুনে ইয়াযিদী বাহিনী তাদের রাস্তা পরিবর্তন করে। তাব্ দূর্গের লোকেরা তাদের পানি সরবরাহে অস্বীকার করে এবং সংঘর্ষে ৬০০ ইয়াযিদীকে হত্যা করে। সেবুর শহরের লোকেরাও তাদের বিরোধিতা করে। হামার লোকেরা তাদের নগরের দ্বার বন্ধ করে দেয়। হাইমবাসীও ইয়াযিদী বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করে এবং শহীদদের মাথাগুলো ছিনিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌছে যে,দামেস্কে বন্দিদের পরিচয় প্রকাশ করার ও সাহস হচ্ছিলনা ইয়াযীদের। তবে হযরত যায়নাব ও উম্মে কুলসুম দামেস্কের বাজারে গিয়ে তাদের পরিচয় প্রকাশ করেন এবং ইয়াযীদের দরবারে গিয়ে কারবালার গণহত্যার বর্ণনা দিয়ে ঐ তথাকথিত মুসলিম শাসকের অনৈসলামী কাজের স্বরূপ উম্মোচন করেন।

এ অবস্থায় কারবালার বন্দিদের মদীনায় ফিরে আসার ব্যবস্থা করা হয়। তবে তাদেরকে পথ বাছাইয়ের ইখতিয়ার দেয়া হয়। প্রথমে তারা কারবালায় যান। তাদের উদ্দেশ্য ছিল জনসাধারণকে বুঝানো যে,জুলুমের বিরুদ্ধে সত্যের জয় হয়েছে। পরে তারা মদীনার দিকে অগ্রসর হন।
ইমাম হুসাইন (আ.) -এর রক্ত এতই কার্যকর প্রমাণিত হয় যে,ইয়াজিদের দলবল তথা মুনাফিকরা নিজেরাই তাদের নিফাকের কথা ঘোষণা করে। কুফায় ইবনে যিয়াদ বলে : ‘আমরা বদরের প্রতিশোধ নিয়েছি।’ মদীনার গভর্নর ইমাম হুসাইন (আ.) -এর শাহাদাতের সংবাদ সংক্রান্ত চিঠি মহানবী (সা.) -এর রওজার ওপর ছুড়ে দিয়ে বলে : ‘আমরা বদরের প্রতিশোধ নিলাম।’ দামেস্কে ইয়াযীদ বলে : ‘আমি আশা করি,বদরে নিহত আমার পূর্বপুষরা দেখবেন,কীভাবে আমি প্রতিশোধ নিলাম!’
ইয়াজিদের দলবল তথা মুনাফিকরা নিজেরাই তাদের পূর্ব পুরুষদের সাথে তাদের সম্পর্কের কথা ঘোষণা করে,যারা ছিল কাফের এবং মহানবী (সা.) -এর সাথে তথা ইসলামের সাথে যাদের সংশ্রব ছিল না। ইমাম হুসাইন (আ.) -এর রক্ত মুনাফিকদেরকে দিয়ে ইসলামের সাথে তাদের কপটতার কথা ঘোষণা করিয়েছে এবং সে সম্পর্কে হযরত যায়নাব (আ.) -এর প্রচার চিরকালের জন্য কুফর ও নিফাক এবং ইসলামী মূল্যবোধের মধ্যকার পার্থক্য তুলে ধরেছে।
আশুরার দিবাগত রাত ও পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক মুহাম্মাদ মুনীর হুসাইন খান বলেছেন:
'ইমাম হুসাইন (আ)'র শাহাদাতের ফলে তাঁর অসহায় নিঃসঙ্গ পরিবার ও আহলুল বাইতের ওপর ভয়াবহ বিপদাপদ, শোক ও দুঃখ-কষ্ট নেমে আসে। তাঁদের ওপর নেমে আসে বন্দিত্ব, তাঁদের সর্বস্ব লুট করা হয় এবং তাঁদের তাঁবুগুলোতেও দেয়া হয় আগুন। বিধর্মী যুদ্ধবন্দি, নারী-পুরুষ ও শিশুদের যেভাবে বাঁধা হয় ঠিক সেভাবে ইমাম হুসাইনের পরিবার ও আহলুল বাইতের পুরুষ আর নারী ও শিশুদেরকে বেঁধে ইমাম হুসাইনের বধ্যভূমির সামনের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের ওপর চাবুক মারা হয় এবং ইমাম হুসাইন (আ) ও অন্যান্য শহীদদের লাশের ওপর ঘোড়া চালিয়ে সেইসব লাশকে পিষ্ট করা হয়। শহীদদের লাশ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে সেগুলোকে বর্শার আগায় বিদ্ধ করা হয়। আর এসবই হচ্ছে নবী-পরিবারের ওপর আরোপিত মুসিবতের সামান্য কিছু দৃষ্টান্ত যা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।
ইমাম হুসাইন (আ) ছাড়া জগতের আর কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে এমন মুসিবত আপতিত হয়নি বিধায় বলা হয় 'লা ইয়াওমুন কাইয়াওমিকা ইয়া আবা আবদিল্লাহ। অর্থাৎ হে আবু আবদিল্লাহ ইমাম হুসাইন! আপনার শাহাদাতের দিবসের মত আর কোনো বিপদ-সঙ্কুল দিবস নেই। এ বাক্যটি কেবল ইমাম হুসাইনের (আ) ক্ষেত্রেই প্রসিদ্ধ ও প্রযোজ্য। আর এ কথা শত্রু-মিত্র সবাই স্বীকার করেছেন।
ইমাম হুসাইন (আ)'র শাহাদাত দিবসে অবর্ণনীয় মুসিবতের কথা স্মরণ করে মহানবী (সা), হযরত ফাতিমা জাহরা (সা. আ), হযরত আলী (আ) ও হযরত ইমাম হাসান (আ) ক্রন্দন করেছেন এবং ইমাম হুসাইনের মুসিবত বা বিপদাপদকে নিজেদের ওপর আপতিত বিপদাপদের চেয়ে অনেক বড়, ভয়াবহ ও করুণ বলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে বলেছেন, 'হে আবু আবদিল্লাহ, কোনো বালা-মুসিবতের দিবসই তোমার শাহাদাতের দিবসের বালা-মুসিবতের দিবসের মত নয়।' যেহেতু শামে গারিবানে অর্থাৎ আশুরার দিবাগত সন্ধ্যা ও রাতে নবী-পরিবারের ওপর বালা মুসিবত, দুঃখ-কষ্ট, শোক-বেদনা ও নির্যাতন চরম পৌঁছেছিল সেহেতু এ সন্ধ্যায় মজলুম শহীদ ইমাম হুসাইন এবং তাঁর পরিবারের বন্দি নারী ও শিশুদের স্মরণে শোক প্রকাশ ও আযাদারি ইমাম হুসাইন এবং আহলুল বাইতের প্রতি ভক্ত-অনুরাগীদের আন্তরিক ভক্তি, শ্রদ্ধা, মুহব্বত ও ঈমানেরই পরিচায়ক।'
ইমাম হোসাইনের (আ.) প্রতিটি কথায় মনুষ্যত্ব ও মানবতার ইজ্জত সম্মান এবং মর্যাদা প্রতিফলিত হয়েছে। -
অর্থাৎ,‘‘সম্মানের মৃত্যু অপমানের জীবনের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।’’
অন্য এক বাণীতে ইমাম হুসাইন বলেছেন : যারা দুনিয়া নিয়ে মত্ত এং দুনিয়ার দাসত্ব করে তারা আসলে জানে না যে, এসব কিছু‘লুমাযাহ’র মতো। মানুষের দাঁতের ফাঁকে গোস্ত কিংবা বেঁধে যাওয়া খাদ্য টুকরোকেই ‘লুমাযাহ’ বলে। ইমাম হোসাইনের (আ.) চোখে ইয়াযিদ, ইয়াযিদের হুকুমত, ইয়াযিদের দুনিয়া সবকিছুই ঐ এক টুকরো লুমাযাহর মতো।
কারবালার পথে অনেকেই ইমাম হুসাইনকে (আ.) বলেছে যে, এ পথ বিপজ্জনক? আপনি বরং ফিরে যান। ইমাম হুসাইন (আ.) তাদের জবাবে এ কবিতা পড়েনঃ
‘‘আমাকে যেতে নিষেধ করছো? কিন্তু আমি অবশ্যই যাবো। আমাকে মৃত্যুর ভয় দেখাও? ... শ্রেষ্ঠতম কাজ অর্থাৎ সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে যে মৃত্যু ঘটে তা অপমানের হতে পারে না! ... কিন্তু জেনে রেখো যে জীবনের জন্যে সবচেয়ে অপমান হলো কেউ বেঁচে থাকবে বটে, কিন্তু লোকে তার কান ধরে উঠাবে আর বসাবে।’’ ‘তোমরা চোখে দেখছো না যে সত্যকে মেনে চলা হচ্ছে না ও বাতিলের বিরুদ্ধেও কেউ কিছু বলছে না?’ ‘‘আমি মৃত্যুকেই আমার জন্যে কল্যাণকর এবং জালেমদের সাথে বেঁচে থাকাকে অপমানজনক ও লজ্জাজনক বলে মনে করি।’’
ইমাম হুসাইন (আ)'র শাহাদতের মুহূর্ত যতই ঘনিয়ে আসছিল ততই তাঁর চেহারা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। এ সময় সম্পর্কে ইয়াজিদ বাহিনীর এক সেনা পরে বলেছিলেন, ইমামের চেহারায় প্রশান্তি ও ঔজ্জ্বল্যের দীপ্তি আমাকে অনেকক্ষণ এমনই মুগ্ধ করে রেখেছিল যে আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে তাঁকে জবাই করা হচ্ছে!

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ও মানব জাতির মুক্তির দিশারী বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, হুসাইন আমা থেকে ও আমি হুসাইন থেকে। বিশ্বনবী (সা.) আরো বলেছেন, তাঁকে মহান আল্লাহ ওহির মাধ্যমে জানিয়েছেন যে শাহাদতের মাধ্যমে হুসাইন (আ.) এমন এক মর্যাদা পাবেন যে তার কাছাকাছি যাওয়া অন্য কারো জন্য সম্ভব হবে না"। মহানবী (সা.) আরো বলেছেন, নিশ্চয়ই প্রত্যেক মুমিনের হৃদয়ে হুসাইনের (আ.) শাহাদতের ব্যাপারে এমন ভালবাসা আছে যে, তার উত্তাপ কখনও প্রশমিত হবে না।" যারা হুসাইনের জন্য কাঁদবে তাদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদও দিয়ে গেছেন বিশ্বনবী (সা.)।
ইমাম হুসাইনের জন্য সর্বপ্রথম শোকগাথা রচনা করেছিলেন হযরত যায়নাব (সা.)। ইমামের শাহাদত ও নবী-পরিবারের সদস্যদের তাবুতে আগুন দেয়া এবং শহীদদের লাশের ওপর ঘোড়া দাবড়ানোর ঘটনার পর তিনি বলেছিলেন:
“ হে মুহাম্মাদ (সা.)! হে মুহাম্মাদ(সা.)! আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা তোমার ওপর দরুদ ও সালাম পাঠায়। আর এই তোমার আদরের হুসাইন, কী ভীষণভাবে লাঞ্ছিত, অবহেলিত, রক্তাপ্লুত খণ্ডিত লাশ হয়ে আছে! আল্লাহর কাছে নালিশ জানাচ্ছি। হে মুহাম্মাদ (সা.)! তোমার কন্যারা আজ বন্দিনী, তোমার জবাই করা পরিবার আজ অপেক্ষা করছে পূবের হাওয়ার জন্য,কখন ধুলো এসে তাঁদের ঢেকে দেবে!”
হযরত যায়নাব (সালামুল্লাহি আলাইহার) মর্মভেদী বিলাপ শত্রু-মিত্র সবাইকে অশ্রু সজল করে তুলেছিল। হযরত যেইনাব (সা.)’র বিলাপ ও বাগ্মীতাপূর্ণ ভাষণ কাঁপিয়ে তুলেছিল কুফায় ইবনে জিয়াদের দরবার এবং দামেস্কে ইয়াজিদের দরবার। তাঁর ভাষণ জনগণের ঘুমিয়ে পড়া চেতনায় বিদ্যুতের প্রবাহ ছড়িয়ে দেয়। ফলে ভীত-সন্ত্রস্ত ইয়াজিদ নবী-(সা.)’র পরিবারকে মুক্তি দেয়ার নির্দেশ দেয়।
আসলে আশুরার বিপ্লব উমাইয়াদের পতনের পথ খুলে দেয়। যুগে যুগে নানা ধরনের মুক্তিকামী আন্দোলন আশুরা বিপ্লবেরই সুফল। আধুনিক যুগে ইরানের ইসলামী বিপ্লব ও বিভিন্ন জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামও এ বিপ্লবেরই সুফল। তাই বলা হয় প্রতিটি কারবালার পরই জেগে ওঠে ইসলাম এবং প্রতিটি দিনই আশুরা ও প্রত্যেক ময়দানই কারবালা। #
পার্সটুডে/মু.আ.হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/ ২২
খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন