বিশিষ্ট ইরানি কবি ও হাকিম সানায়ি গজনাভি (এক)
‘পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব’ শীর্ষক আলোচনার এ সপ্তাহর পর্বে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। আজ আমরা বিশিষ্ট ইরানি কবি ও সুফি সাধক হাকিম আবুল মাজদ মাজদউদ্দিন ইবনে অ’দাম সানায়ি গজনাভির জীবন ও তার অবদান সম্পর্কে আলোচনা করব।
বিশিষ্ট ইরানি কবি ও সুফি সাধক হাকিম আবুল মাজদ ইবনে অ’দাম সানায়ি ছিলেন হিজরি পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকের তথা খ্রিস্টিয় একাদশ ও দ্বাদশ শতকের মনীষী।
ফার্সি পদ্য-সাহিত্যে সানায়ির অবস্থান এতই উঁচু যে অনেক সমালোচক ফার্সি কবিতার ইতিহাসকে ‘সানায়ি-পূর্ব-যুগ’ও ‘সানায়ি-পরবর্তী-যুগ’ শিরোনামে বিন্যস্ত করে থাকেন। ডক্টর শাফয়ি কাদকানির মতে ফার্সি কবিতার অন্য কোনো দিকপাল, এমনকি সাদি, হাফিজ ও মাওলানা রুমিও ফার্সি কবিতার ধারায় এমন যুগান্তর ঘটাতে সক্ষম হননি। ফার্সি মরমি সাহিত্যের মাসনাভি বা দ্বিপদী কবিতা-ধারার জনক ছিলেন হাকিম সানায়ি। তিনি ছিলেন এক্ষেত্রে ফরিদুদ্দিন আত্তার ও মাওলানা রুমি’র পূর্বসুরি এবং তাদের মসনাভি কবিতা-ধারা তৈরির অনুপ্রেরণার উৎস।
খ্রিস্টিয় ১০৮০ সনে গজনি শহরে সানায়ির জন্ম হয়েছিল বলে মনে করা হয়। ৫২৫ হিজরির ১১ শাবান বা খ্রিস্টিয় ১১৩১ সনের ৮ মে তিনি মারা যান।
হাকিম সানায়ির শৈশব ও যৌবন কেটেছে গজনীতে যা ছিল সে যুগে শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও জ্ঞান চর্চার এক বড় কেন্দ্র । ছাত্র-জীবনে এখানেই তিনি নানা বিষয়ে জ্ঞান অর্জনে মশগুল ছিলেন এবং সে যুগের প্রচলিত সব জ্ঞানেই দক্ষতা অর্জন করেন। আরবি সাহিত্য, ইসলামী আইন, হাদিস, তাফসির, চিকিৎসা বিদ্যা, মহাকাশ বিদ্যা, দর্শন ও ইসলামী কালাম বা ধর্মতত্ত্ব ইত্যাদিতে তার ব্যাপক দক্ষতার প্রমাণ দেখা যায় তারই নানা লেখায়।
সানায়ির যুগে গজনি শহরের অবস্থা সুলতান মাহমুদ ও তার সন্তানদের শাসনামলের মতো জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না। সে যুগে এ শহরটি ছিল কবি ও দরবেশদের বড় আস্তানা। তাদের সবার মধ্যেই ছিল আনন্দ ও প্রফুল্লতা। দরবেশরা ব্যস্ত থাকতেন নির্জন সাধনায়। কবিরা তৎকালীন শাসকদের গুণ-গান গাইতে অভ্যস্ত হলেও সানায়ি এর ব্যতিক্রম ঘটান। তিনি তার পুরো জীবনকে এইসব ক্ষণস্থায়ী আনন্দে কিংবা গড্ডালিকা প্রবাহে ভাসিয়ে দেয়ার পক্ষে ছিলেন না। সানায়ির কবিতাগুলো, বিশেষ করে তার চিন্তারাজ্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসার পর লেখা কবিতাগুলোয় চোখ বুলালে বোঝা যায় যে উদাসীনতার ঘুমে অচেতন হয়ে থাকা তিনি পছন্দ করতেন না,বরং তিনি উদাসীনদের জাগিয়ে তোলারই চেষ্টা করেছেন।
হাকিম সানায়ি ছিলেন এক খাঁটি ইরানি পরিবারের সদস্য। তার বাবা ছিলেন একজন জ্ঞানী ও সুশীল ব্যক্তি। সে যুগের বিশিষ্ট ও নেতৃস্থানীয় পরিবারের সন্তানদের শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণে সানায়ির বাবা নির্ভরযোগ্য শিক্ষক হিসেবে সুনাম অর্জন করেন।
যাই হোক এমনই এক সুশীল পরিবারের সদস্য হিসেবে হাকিম সানায়ি গজনীতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন এবং বেশ তরুণ বয়সেই দরবারি কবি হওয়ার মত ব্যাপক যোগ্যতা অর্জন করেন। গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ে জ্ঞান ও ক্ষুরধার ভাষা-শক্তির অধিকারী হওয়ায় সানায়ি তার যৌবনের শুরুতেই জ্ঞানী-গুণীদের মহলে নিজের স্থান করে নিতে সক্ষম হন।
সানায়ির জীবনের একটা অংশ কেটেছে নানা অঞ্চল সফরে। তিনি সফর করেছেন বালখ্, সারাখস্, হেরাত ও নিশাপুরসহ খোরাসানের অন্যান্য শহর। এইসব সফরে তিনি পরিচিত হন বড় বড় আরেফ ও আলেমদের সঙ্গে যাদের মধ্যে রয়েছেন মুহাম্মাদ মানসুর সারাখসির মত খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব।
হাকিম সানায়ির প্রথম দিকের কিছু কবিতা ছিল মূলত কয়েকজন শাসকের গুন-গান। অন্য অনেক কবির মত তিনিও যৌবনের প্রথম দিকে রং-তামাশা ও আনন্দ-ফূর্তিতে মেতে ছিলেন। এ ধারা বেশ কিছুকাল অব্যাহত রাখার পর গজনির সুলতান বাহরাম শাহের সঙ্গে ভারত সফরকালে সুফি-প্রশিক্ষক লাইখুরের সাক্ষাৎ পান। আর এরই প্রভাবে হঠাৎ সানায়ির জীবনের গতি ঘুরে যায় এবং তিনি আল্লাহর ঘর জিয়ারতের তথা হজ করার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে সানায়ি বালখ থেকে পবিত্র মক্কার দিকে রওনা হন। হজ করার পর বালখে ফিরে এসে বদলে যান সানায়ি। তার চিন্তারাজ্যে ঘটে আমূল পরিবর্তন। দরবারি কবির পেশা ছেড়ে ধার্মিকতায় মশগুল হন তিনি। বদলে যায় তার কবিতাও। এ সময়ই তিনি ধর্মীয় ও দরবেশি-সাধনার চেতনায় সমৃদ্ধ বহু কবিতা লেখেন যা তাকে ক্লাসিক কবিদের চেয়েও বড় কবির মর্যাদা দেয়। তার সেইসব কবিতা সুর করে গাওয়া হত বালখে।
কবি হাকিম সানায়ি নানা সফর শেষ করার পর আধ্যাত্মিক ও আত্মিক দিক থেকে পুরোপুরি বদলে যাওয়া ব্যক্তি তথা এক নতুন সানায়ি হিসেবে নিজ শহর গজনিতে ফিরে আসেন। গজনিতে এসে তিনি নিঃসঙ্গতার জীবন বেছে নেন এবং নিজের রচিত আধ্যাত্মিক বা এরফানি ও নৈতিক শিক্ষামূলক কবিতাগুলো সংগ্রহের কাজে মশগুল হন।
হাকিম সানায়ির রয়েছে গজল, কাসিদা ও রোবাইয়াত বা চতুর্পদী কবিতার একটি সংকলন যাতে রয়েছে ১৪ হাজার পংক্তি। এ ছাড়াও তার আরও কয়েকটি কবিতা সংকলন বা কাব্য রয়েছে।

সানায়ির শিল্প-কর্ম বিষয়ক তুর্কি গবেষক অধ্যাপক আহমাদ অতাশের মতে সানায়ি তার কবিতার সংকলন নিজেই বিন্যস্ত করেন। এরপর আহমাদ বিন মাসউদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সানায়ি বইটি আবারও বিন্যস্ত করেন। সম্ভবত এরপর তিনি তার সমগ্র কাব্য নিয়ে একটি সংকলন বা কাব্য-সমগ্র তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন যাতে তার বিখ্যাত কাব্য ‘হাদিকাত আল হাকিকাত’ও ছিল। কিন্তু তিনি এই সংকলন কিংবা ‘হাদিকাত আল হাকিকাত’ শীর্ষক কাব্যটির সংকলন শেষ করার আগেই মারা যান।
অধ্যাপক আহমাদ অতাশের মতে সানায়ির কাব্যগুলো সংকলনের অসমাপ্ত কাজ শেষ করেন তারই গুনগ্রাহী বন্ধু ও শিষ্যরা এবং এ কাজ করতে গিয়ে তারা নতুন আঙ্গিকে সানায়ির ওই দুই কাব্য সংকলন করেন। সানায়ির কাব্যগ্রন্থগুলোর বিষয়বস্তু ও ক্রম-বিন্যাসের মধ্যে ব্যাপক অমিলের ব্যাখ্যা হয়তো এখানেই লুকিয়ে আছে। সানায়ির কাব্য সমগ্রের একটি প্রাচীন সংস্করণ দেখা যায় এবং ওই সংস্করণের নমুনা অন্য কবিদের কাছেও নজিরবিহীন।
সানায়ির প্রধান রচনা বা বইগুলো হল, ‘হাদিকাত আল হাকিকাত’ তথা সত্য বা -বাস্তবতার প্রাচীরবেষ্টিত বাগান (যা এলাহি নামেহ বা খোদাতত্ত্ব নামেও খ্যাত), ‘সিইরাল ইবাদি ইলাল মায়াদি’ তথা পরকালের দিকে বান্দাহর সফর, ‘করনামেহ বালখ’ বা বালখের নানা অর্জন বা সাফল্যের খতিয়ান, ‘তারিক আততাহকিক’ বা গবেষণার পদ্ধতি ও সানায়ির চিঠিপত্র। জীবনী লেখকদের মতে সানায়ির কাব্য সংকলন বা দিওয়ানে ছিল ত্রিশ হাজার পংক্তি।
‘আকল্ নামে’ ও ‘এশক নামে’ নামের দু’টি কাব্যকেও সানায়ির রচনা বলে কেউ কেউ উল্লেখ করেন। তবে অনেকেই মনে করেন এ দু’টি কাব্য ও ‘তারিক আততাহকিক’ সানায়ির রচনা কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। #
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ২৩