সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮ ১৪:৫৪ Asia/Dhaka

‘পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব’ শীর্ষক আলোচনার এ সপ্তাহর পর্বে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। গত পর্বের ধারাবাহিকতায় আজও আমরা বিশিষ্ট ইরানি কবি ও সুফি সাধক হাকিম আবুল মাজদ মাজদউদ্দিন ইবনে অ’দাম সানায়ি গজনাভির জীবন ও তার অবদান সম্পর্কে আলোচনা করব।

গত পর্বে আমরা বিখ্যাত ইরানি মরমী কবি হাকিম সানায়ির জীবন ও অবদান সম্পর্কে প্রাথমিক কিছু আলোচনা শুনেছি।

কবি হাকিম সানায়ি ফার্সি সাহিত্যে এক শক্তিমান কবি ও যুগস্রস্টা হিসেবে বিবেচিত হন। তিনিই ফার্সি সাহিত্যে ইরফানি মাসনাভি ধারার প্রতিষ্ঠাতা। আর এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন ফার্সি সাহিত্যের ইরফানি ধারার অমর কবি মাওলানা রুমি ও ফরিদুদ্দিন আত্তার নিশাপুরির অনুপ্রেরণার উৎস।

হাকিম সানায়ি ৪৬৪ হিজরিতে গজনিতে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। সে যুগে গজনিসহ বর্তমান সময়ের গোটা আফগানিস্তান ছিল ইরানের অংশ।

হাকিম সানায়ি এক সময় দরবারি কবিদের মতই কবিতা লিখেছেন। কিন্তু তার চিন্তা-জগতে বিপ্লব ঘটার পর ইরফানি জীবনে লেখা কবিতাগুলোতে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর। এ সময়ে লেখা কবিতাগুলোতে চিন্তা ও চেতনার দিক থেকে আধমরা এবং অচেতনদের জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন কবি হাকিম সানায়ি। কবি নাসের খসরুর মত তিনিও ক্ষুরধার ভাষায় তীব্র কশাঘাত হেনেছেন দুনিয়া-পূজারি ও অনাচারে অভ্যস্ত লোকদের ওপর। এই শ্রেণীর লোকদের মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি লিখেছেন:   

پیش از آن کاین جان عذر آور فرو میرد ز نطق 
پیش از آن کاین چشم عبرت بین فرو ماند ز کار
در فریب آباد گیتی چند باید داشت حرص 
چشمتان چون چشم نرگس دست چون دست چنار

লুফে নাও উপদেশ হারানোর আগেই তোমার মুখ আর চোখের শক্তি

ছলনার এ দেশে আর কতোকাল রইবে অপেক্ষমান তোমার দৃষ্টি

যেন নার্গিস-আঁখি উদ্বেগে ম্রিয়মান?

চেনার-পাতার মত দু’টি শূন্য হাতের তালু কিসের আশায় অপেক্ষমান?

হাকিম সানায়ি তার কবি-জীবনের প্রথম দিকে যে কবিতাগুলো লিখেছিলেন সেসবের মধ্যে ফররুখি ও নাসের খসরুর মত অগ্রজ কবিদের কবিতার ভাব ও ভঙ্গী স্পষ্ট। কিন্তু পরবর্তীকালে তার কবিতাগুলোয় দেখা গেছে ভিন্ন ভাব,স্টাইল ও নতুনত্ব। তার এই অভিনব ধারার অনুসরণ করেছেন পরবর্তী যুগের খাকানি,জামি ও আমির খসরু দেহলাভির মত কবিরা। হাকিম সানায়ির কবিতার অভিনব ভাব,চিত্র-কল্প, নতুন বাগধারা ও যৌগিক শব্দ এবং মিষ্টি সুর কবি ও আরেফ-সুফিদের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়েছে। ফার্সি কবিতায় সুফিবাদী বা মরমী ধারার প্রবর্তক হিসেবে নন্দিত কবি সানায়ির কবিতায় উঠে এসেছে সংযম সাধনা,সর্বোত্তম নৈতিক চরিত্র,একত্ববাদ, আল্লাহ,রাসুল ও কুরআনের প্রশংসা। সমাজের বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে যে সুবিধাবাদী প্রবণতা,রং-তামাশা ও বিলাসিতার দিকে ঝোঁক দেখা যায় সানায়ি তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। নানা ধরনের সূক্ষ্ম উপমা,মিষ্টিমধুর কার্যকর ভাষা ও ইরফানি পরিভাষা ব্যবহার করে তিনি এইসব প্রবণতার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন এবং জীবনের ক্ষণস্থায়িত্বের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

বিশিষ্ট ইরানি কবি ও হাকিম সানায়ি গজনাভি

রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়েও সমালোচনা দেখা যায় সানায়ির কবিতায়। সমাজের সব ধরনের নোংরামির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে উচ্চকণ্ঠ হয়েছেন তিনি। ডক্টর শাফিয়ি কাদকানির মতে এক্ষেত্রে সানায়ির কবিতা অনন্য সৌন্দর্যে ভাস্বর।

কবি হাকিম সানায়ি ইরফানি বা খোদা-পরিচিতির সঙ্গে সম্পর্কিত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বহু আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়কে চমৎকার ভাষায় এবং রীতি-সম্মত পন্থায় বর্ণনা করেছেন। একইসঙ্গে এইসব বিষয়কে অত্যন্ত দরদ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন তিনি তার কবিতায়। তার আগে সূক্ষ্ম ইরফানি কিছু বিষয় খাজা আবদুল্লাহ আনসারি, আবু সায়িদ আবুল খাইর ও আহমাদ জামি কবিতায় তুলে ধরলেও সানায়ি এ জাতীয় বিষয় আরও ব্যাপক মাত্রায় এবং পুরোপুরি কাব্যিক ভাষায় নজিরবিহীন দক্ষতার সাথে তুলে ধরতে সফল হন। সানায়ির এ জাতীয় কবিতার মাধুর্যের সঙ্গে তার আগের ও পরের কোনো কবির কবিতার তুলনা হয় না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। আর এ কারণেই তিনি হলেন যুগস্রষ্টা কবি।

নতুন ধারার প্রবর্তক কবি হিসেবে হাকিম সানায়িই প্রথমবারের মত ইরফানি বিষয় নিয়ে মাসনাভি পদ্ধতির বা দ্বিপদী স্টাইলের একটি বড় কাব্য ফার্সি সাহিত্যে উপহার দিতে সক্ষম হয়েছেন। আর তার ওই কাব্যটি হল ‘হাদিকাত আল হাকিকাত’ যা খোদা-তত্ত্ব বা ‘এলাহি নামেহ’ নামেও পরিচিত।

 

কবি হাকিম সানায়ি ফার্সি গজল ও কাসিদার ক্ষেত্রেও অভিনবত্ব বা নতুন স্বাদ আনতে সক্ষম হন।

সানায়ির আগে ফার্সি ভাষায় ইরফানি ও সংযম সাধনা বিষয়ক অভিজ্ঞতাগুলো মূলত গদ্যেই লেখা হয়েছে। ‘রিসালাতুল কাশিরিইয়্যাহ’ ও ‘এহ্‌ইয়ায়ে উলুমে দীন’ হল এ জাতীয় দুটি বই। সানায়ি এ জাতীয় অভিজ্ঞতাগুলোকে ফার্সি পদ্যে স্থান দিয়ে ফার্সি সাহিত্যের প্রথাগত কাঠামোয়  মৌলিক তথা বড় ধরনের এক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হন। 

ফার্সি সাহিত্যের কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করেন ফার্সি সাহিত্যে হাকিম সানায়ির মাধ্যমে ইরফানি ধারা সৃষ্টির ফলেই পরবর্তী যুগে এই ধারার পথ বেয়েই মহাকবি হাফিজ তার স্বর্গীয় গজলগুলো উপহার দিতে সক্ষম হন। এ জাতীয় কবিতায় সমন্বিত হয়েছে পার্থিব বা ইহকালীন বাস্তবতার পাশাপাশি ঐশী বা আসমানি বাস্তবতা।

 

ইরফান ও আধ্যাত্মিক দর্শন বিষয়ক এমন কোনো মৌলিক চিন্তাধারা নেই যার প্রতিফলন হাকিম সানায়ির কবিতায় দেখা যায়নি। আর তাই ফার্সি ভাষায় ইরফান ও এমনকি দর্শন বিষয়ক চিন্তাধারার ব্যাখ্যায় সবচেয়ে বেশি মাত্রায় ব্যবহৃত হয় সানায়ির কবিতা।

ফার্সি কবিতায় পূর্ণাঙ্গ বা পুরোপুরি আদর্শ মানুষের ধারণা প্রথমবারের মত তুলে ধরেছিলেন হাকিম সানায়ি। আল্লাহ, বিশ্বজগত ও মানুষ- এই তিন মৌলিক বিষয়কে ভিত্তি করে তিনি সবচেয়ে সূক্ষ্ম ইরফানি চিন্তাধারাগুলোকে তুলে ধরেন এবং তার গজল ও কাসিদাগুলোয় এক পরিপূর্ণ ইরফানি ব্যবস্থা ব্যাখ্যা করেছেন। তার কাব্য ‘হাদিকাত আল হাকিকাত’ সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। পরবর্তী যুগে সানায়ির এই বিশ্ব-দৃষ্টিভঙ্গীই আরও বিশদভাবে এবং চূড়ান্ত মাত্রায় ফুটিয়ে তুলেছেন মরমী কবি রুমি ও আত্তার।#
 

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ৩০

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন।