অক্টোবর ১৪, ২০১৮ ১৬:৪৪ Asia/Dhaka

ফার্সি সাহিত্যের বড় কবি আনওয়ারি আবিরুদির জন্ম হয়েছিল আনুমানিক খ্রিস্টিয় ১১২৬ সনে তুর্কিস্তানের আবিরুদ অঞ্চলের বাদানাহ গ্রামে।

তার বাবার পরিবার ছিল সাহিত্যমোদী এক ধনী পরিবার। আবিরুদ অঞ্চলটি ছিল প্রাচীন খোরাসানের নাসা ও  সারাখস শহরের মাঝামাঝি স্থানে। বর্তমানে আবিরুদ অঞ্চলটি তুর্কমেনিস্তানের অংশ।

 

আনওয়ারি পড়াশুনা করেছেন ইরানের তুস শহরের মানসুরিয়া কলেজে। সাহিত্য ও বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে দক্ষ আনওয়ারি কবি হিসেবে সুখ্যাতি অর্জনের পাশাপাশি একজন বড় জ্যোতির্বিদ ও জ্যোতীষীও ছিলেন। তার বাবা একজন জমিদার বা বড় ধরনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছিলেন। ফলে পড়াশুনা বা জ্ঞান অর্জনের পথে তার কোনো ধরনের আর্থিক অসঙ্গতি ছিল না।

প্রশংসাসূচক কবিতা লেখার সুবাদে সালজুক রাজবংশের শাসনামলে সুলতান সানজারের দরবারি কবি হয়েছিলেন আনওয়ারি। তার বেশিরভাগ কবিতাই কাসিদাধর্মী ও সুদীর্ঘ। সভাকবি ছাড়াও তিনি সুলতান সানজারের রাজ-জ্যোতির্বিদের দায়িত্বও পালন করতেন। আনওয়ারি সানজারের মোট তিনজন সুলতানের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিলেন।

 

আনওয়ারির কবিতাগুলো দিওয়ান নামের এক সংকলনে দেখা যায়। এতে রয়েছে প্রশংসাসূচক নানা ধরনের কবিতা ও ব্যাঙ্গ-কবিতা। চতুর্পদী ও দ্বিপদী ধারার কবিতাসহ এই কাব্যে রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার পংক্তি। সমসাময়িক যুগের নানা সমস্যা ও সংকট সম্পর্কে এবং সত্য, ন্যায় আর সব ধরনের ভালো গুণের পক্ষে বক্তব্য দেখা যায় তার কবিতায়। আবার কখনও কখনও হতাশা, নেতিবাচক মনোভাব, অতিরঞ্জন আর স্ববিরোধীতাও দেখা গেছে আনওয়ারির কবিতায়।

 

এক সময় প্রশংসাসূচক কবিতা লেখা বন্ধ করে দেন আনওয়ারি। এর কারণ, প্রতিদ্বন্দ্বি ব্যক্তি বা কবিদের প্রতিহিংসা কিংবা তার প্রতি সুলতানের অপর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা। আনওয়ারি হয়তো ভাবতেন যে সুলতান তার শিল্পকর্ম ও তার প্রতিভাকে যথাযোগ্য গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তার লেখা ব্যাঙ্গ কবিতাগুলোর ক্ষুরধার ভাষাও এই কবির শত্রু সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে করা হয়।   

 

‘খোরাসানের কান্না বা অশ্রু’ আনওয়ারির একটি বিখ্যাত কাসিদা। তার লেখা চমৎকার শোক-গাঁথা জাতীয় এই কবিতা ১৭৮৯ সনে ইংরেজিতে অনুদিত হয়। খোরাসানে খ্রিস্টিয় ১১৫৩ থেকে ১১৫৬ সালে সংঘটিত ঘুজ বা ওগুজ গোত্রের তুর্কম্যান মঙ্গলদের পরিচালিত গণহত্যা সম্পর্কে আনওয়ারির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা হয়েছে এই কবিতা। তার লেখা কবিতাগুলোর মধ্যে এটাই সবচেয়ে দীর্ঘ কবিতা।

 

সে সময় তুর্কম্যান মঙ্গলরা গোটা খোরাসান তছনছ করেছিল। তারা সানজারের সুলতানকে বন্দি অবস্থায় আটকে রাখে। তিন বছর পর তাকে মুক্ত করা সম্ভব হয়। এ সময় তিনি আবারও সিংহাসন ফিরে পান। আর তখনই সুলতান আহমাদ সানজারকে ‘খোরাসানের কান্না বা  অশ্রু’ শীর্ষক কবিতাটি উপহার দেন আনওয়ারি। ঘুজ বা ঘুঝদের আক্রমণে খোরাসানের যে ব্যাপক বিপর্যয় ঘটেছিল তারই পূর্ণাঙ্গ ছবি পাওয়া যায় আনওয়ারির এই সুদীর্ঘ কবিতায়। তিনি লিখেছেন:

 

হায়রে ঝড়ের তাণ্ডবলীলা এ সমরকন্দে

এখানের লোক একদা ছিল যে মহানন্দে !

খোরাসানি-সুখ ডুবেছে এবার দুঃখের সাগরে-

তুরানি রাজার দুঃসহ আঘাত দেশের ওপরে।

অজগরী-শ্বাস ছিল যে তাদের নাসারন্ধ্রে

অত্যাচার আর অনাচার আনে তারা স্কন্ধে।

 

আনওয়ারির কবিতাগুলো খুব সুন্দর হলেও তার অনেক কবিতার অর্থ বোঝা বেশ জটিল কাজ বলে মনে করা হয়। ব্যাপক ব্যাখ্যা ছাড়া আনওয়ারির এইসব কবিতার অর্থ বোঝা সবার জন্য সহজ নয়। অনেকেই মনে করেন যে আনওয়ারি ইচ্ছে করেই স্টাইলের মধ্যে বৈচিত্র আনার জন্য দুর্বোধ্যতা, অস্পষ্টতা ও জটিলতাকে স্থান দিয়েছিলেন তার অনেক কবিতায়। আর এই ধারণার প্রমাণ হল তার অনেক প্রাঞ্জল ও সরল কবিতাও রয়েছে।

 

আনওয়ারির কবিতায় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এবং হযরত আলী (আ)’র প্রশংসা দেখা যায়। এ ছাড়াও তিনি খেলাফতের অধিকারী প্রথম তিন খলিফার প্রশংসাও করেছেন তার কবিতায়।

   

‘দ্যা ক্যামব্রিজ হিস্টোরি অব ইরান’ শীর্ষক বইয়ে আনওয়ারিকে ফার্সি সাহিত্যের অন্যতম বড় দিকপাল হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

আনোয়ারির জ্যোতিষি চর্চা সম্পর্কে একটি কাহিনীতে জানা যায়, তিনি একবার মার্ভ শহরে অমুক তারিখে প্রচণ্ড ঝড়-তুফান ঘটবে ও তাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। সবাই সতর্ক হয়ে যায়। কিন্তু দেখা গেল সেদিন ঝড়তো দূরের কথা জোরে বাতাসও বইলো না। ফলে সম্রাট  ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে রাজদরবার থেকে বহিষ্কার করেন। কিন্তু আনওয়ারির গণনা একেবারে নিরর্থক হয়নি। কিছুদিন পর আবিষ্কৃত হয় যে ওই রাতে দুর্ধর্ষ চেঙ্গিস খানের জন্ম হয়েছিল। চেঙ্গিসের ধ্বংসলীলা ঝড়ের তাণ্ডবলীলার চেয়েও ভয়াবহ বলে বিবেচিত হয়।

আরবি সাহিত্য, সঙ্গীত, যুক্তিবিদ্যা, চিকিৎসা শাস্ত্র ও জ্যামিতি শাস্ত্রের ওপর ভালো দখল ছিল আনোয়ারির।

ইবনে সিনার দর্শন বিষয়ক বই ইশারাত-এর ওপর একটি ব্যাখ্যামূলক বই লিখেছিলেন আনওয়ারি। বইটির নাম ‘আলবাশারাত ফি শারহিল ইশারাত’।  ছন্দ ও কবিতা বিজ্ঞান  সম্পর্কেও আনওয়ারির একটি পুস্তিকা রয়েছে। তিনি ইবনে সিনার দর্শন বিষয়ক বই ‘উয়ুন আল হিকমার’ও পুনলির্খন করেছিলেন তথা ওই বইটিতে নিজের অনেক বক্তব্য যুক্ত করে বইটি পরিবর্ধন করেন।

 

 আনওয়ারির লেখা আরেকটি বইয়ের নাম ‘কিতাবে মুফিদ’। জ্যোতির্বিদ্যা অথবা চিকিৎসা বিষয়ে এটি লেখা হয়েছিল বলে মনে করা হয়। 

 

ক্যালিওগ্রাফার বা সুলেখন শিল্পী হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেছিলেন আনওয়ারি। ‘ক্বাতরান তাব্রিজি’ নামের  আনওয়ারির অগ্রজ একজন কবির একটি কাব্য যা তেহরানে সংরক্ষিত রয়েছে তা খোদ আনওয়ারির হস্তলিপি বলে বেশ জোরালো সম্ভাবনার কথা বলেন অনেকেই।

 

 আনওয়ারি মারা যান আনুমানিক খ্রিস্টিয় ১১৮৯ সন থেকে ১২০০ সালের মধ্যে খোরাসানের বালখে যা বর্তমানে আফগানিস্তানের অংশ। #

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/  ১৪

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন