ইরানের পণ্য-সামগ্রী: ইরানি মূল্যবান খনিজ পাথর
রত্নবিদরা ইরানকে নাম দিয়েছেন 'গুপ্ত বেহেশত'। কারণ ইরান নামক ভূখণ্ডের বিভিন্ন প্রান্তে মূল্যবান বিচিত্র সব পাথরের মজুদ রয়েছে বলে তাদের বিশ্বাস। মূল্যবান পাথর বলতে সেইসব পাথরকে বোঝানো হচ্ছে যেগুলো ইরানের বিভিন্ন খনিতে পাওয়া যায়। আমরা এইসব মূল্যবান পাথরের সঙ্গে আজকের আসরে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবো।
মূল্যবান পাথর বলতে যা বোঝায় মানুষ ঠিক কবে থেকে সেসব ব্যবহার করতে শুরু করেছে তার সঠিক সময়কাল পাওয়া যায় না। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা ছয় থেকে সাত হাজার বছর আগে মানুষের জীবনে এইসব পাথর স্থান করে নিয়ে থাকতে পারে। মুক্তা কিংবা প্রবাল সামুদ্রিক জিনিস। এগুলোও বেশ মূল্যবান। এসবের বাইরে খনিজ মূল্যবান পাথর রয়েছে বিচিত্র প্রজাতির। এগুলো দিয়েও অলংকার বানিয়ে ব্যবহার করতে শিখেছে মানুষ। তবে শুরুর দিকে মুক্তা ছাড়াও হাড়, শিকার করা জন্তুর দাঁত কিংবা পালক, পশম এবং হাতির দাঁত ইত্যাদি ব্যবহার করেছে মানুষ। যেখানে বসবাস ছিল মানুষের সেখানকার প্রাকৃতিক জিনিসপত্রই ছিল অলংকারের উপাদান। আবার সেই এলাকার সাংস্কৃতিক অবস্থার ওপরও নির্ভর করতো অলংকারের ধরণ।
সাংস্কৃতিক অবস্থার কথা বললাম এজন্য যে তখনকার লোকেরা ভাবতো ওইসব অলংকার ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে প্রাকৃতিক বিচিত্র দুর্যোগ থেকে নিজেদের রক্ষা করা যাবে। বিচিত্র রোগ-ব্যাধি, অসুখ-বিসুখ, বালা-মুসিবৎ থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখা যাবে এবং শারীরিক শক্তি সামর্থও এইসব ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে বৃদ্ধি পাবে। এ ধরনের বিশ্বাস পোষণ করতো তখনকার দিনের মানুষেরা। এইসব জিনিসকে জাদুটোনার কাজেও ব্যবহার করা হতো এক সময়। বিশ্বাস করতো যে এগুলোর সাহায্যে জাদু করা যায় আর জাদুর শক্তি দিয়ে চিকিৎসা করা যায়। ধীরে ধীরে এসবের ব্যবহার পারিবারিক এবং সামজিক পদমর্যাদা এমনকি সম্পদশালী ও ধনবান মানুষের প্রতীকে পরিণত হয়। অর্থাৎ অলংকার ব্যবহার যারা করতো না তাদেরকে সমাজে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হতো না।
استفاده از سنگ فیروزه در جواهرات ایران باستان
استفاده از سنگ ها در جواهرات دوره هخامنشی
استفاده از سنگ ها در جواهرات دوره اشکانیان
استفاده از سنگ ها در جواهرات دوره ساسانی
ইতিহাসের বিভিন্ন নিদর্শন থেকে প্রমাণ হয় যে, প্রাথমিক পর্যায়ে মূল্যবান পাথরগুলো সৌন্দর্য বৃদ্ধির উপকরণ অলংকারেই ব্যবহার করা হতো। সে ধরনের পাথর কমবেশি প্রায় সকল জাতি ও গোত্রের মাঝেই ছিল। ইরানিরাও এমন একটি জাতি ছিল যারা খনিতে প্রাপ্ত মূল্যবান প্রাকৃতিক পাথরকে বিভিন্ন আঙ্গিক দিয়ে চমৎকার সব অলংকার তৈরি করে পরতো। তারা তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে ব্যাপক নৈপুণ্য অর্জন করেছে এবং সক্ষম হয়েছে অলংকারবিদ্যার স্থপতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে। প্রাচীন লিপিকর্ম কিংবা প্রাচীন যেসব নিদর্শন রয়েছে সেগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে ইরানিরা সেই প্রাচীনকাল থেকেই এইসব মূল্যবান পাথরের সঙ্গে সুপরিচিত ছিল। আবু রায়হান বিরুনি (৯৭৩-১০৪৮), জাবের ইবনে হাইয়্যান (অষ্টম ও নবম শতাব্দি), মুহাম্মাদ বিন জাকারিয়া রাজি (নবম এবং দশম শতাব্দি) এবং বু আলি সিনা ( দশম ও একাদশ শতাব্দি) প্রমুখের মতো ইরানি মনীষীরা খনিজ এইসব পাথর এবং সেগুলোর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে খুব ভালো জ্ঞান রাখতেন।

সেই প্রাচীনকালেই এইসব খনিজ পাথর কীভাবে উত্তোলন করতে হবে কীভাবে সেগুলোকে কেটে ছেঁটে পরিষ্কার করে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা হবে সেসব বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান তারা রাখতেন। এমনকি ওইসব পাথর দিয়ে তৈরি অলংকার সামগ্রির বিপননেরও চমৎকার দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন তারা। অলংকার বিষয়ক বিদ্যার ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া সে সময়কার একটা অনন্য সাধারণ পেশা ছিল। ওই প্রশিক্ষণ দেয়ার ফলে সৃষ্ট অলংকারবিদেরা বিচিত্র ডিজাইনের অলংকার তৈরি করে বাজারকে করে তুলেছিলো জাঁকজমকপূর্ণ। পাথরের বিভিন্ন সাইজ ও ডিজাইনও ছিল দেখার মতো। ওইসব চোখ ধাঁধানো পাথরের চাকচিক্য দেখলে যে কেউই বলে উঠবে ইরান হলো মূল্যবান সব খনিজ পাথরের বেহেশত।
الماس صورتی
انگشتر یاقوت سرخ
یاقوت کبود
زمرد
মূল্যবান এইসব পাথরকে উনবিংশ শতাব্দির মাঝামাঝিতে দুই শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে। এক শ্রেণীতে পড়েছে মহামূল্যবান পাথর অপর শ্রেণীতে পড়েছে তুলনামূলকভাবে কম মূল্যবান পাথর। মূল্যবান পাথরের শ্রেণীতে পড়েছে হীরা, লাল ইয়াকুত, নীল ইয়াকুত, পান্না ইত্যাদি পাথরগুলো। এইসব পাথর যেহেতু দুর্লভ সেজন্য এগুলোর মূল্য স্বর্ণের মতোই মূল্যবান। হীরা হলো সর্বাপেক্ষা মূল্যবান একটি রত্ন যা গহনা তৈরিতে বহুলভাবে ব্যবহার করা হয়। বর্ণহীন এই রত্নটি একটি মাত্র বিশুদ্ধ উপাদান কার্বন থেকে সৃষ্ট। অন্যভাবে বলা যেতে পারে হীরা কার্বনেরই একটি বিশেষ রূপ মাত্র। লাল ইয়াকুত বা চুনি এবং নীল ইয়াকুত বা চুনির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য অর্থাৎ এগুলোও বেশ মূল্যবান পাথর। তবে প্রবাল তুলনামূলকভাবে হীরার মতো মূল্যবান নয়।#
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/ ১৬
খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন