ঐশী দিশারী (পর্ব ২১): বিশ্বনবীর (সা.) কাছে হযরত আলীর (আ.) গুরুত্ব
গত আসরে আমরা আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)-এর জীবনী নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ইসলামের প্রচার ও প্রসার এবং কাফের ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এই মহান ব্যক্তিত্বের অবদান নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজকের আসরে আমরা এই আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের জীবনীর আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে আলোচনা করব।
বিশ্বনবী (সা.)-এর জীবদ্দশায় তাবুক ছিল মদীনা থেকে সবচেয়ে দূরের স্থান যেখানে নবীজীর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী ইসলামের প্রসার ঘটানোর উদ্দেশ্যে গিয়েছিল। আল্লাহর রাসূলের তাবুক গমনের খবর টের পেয়ে মুনাফিকরা তাঁর অনুপস্থিতিতে মদীনায় নিজেদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের উপযুক্ত সময় মনে করে। কিন্তু তারা একথা বুঝতে পারেনি যে, রাসূলুল্লাহ তাবুকে গেলেও হযরত আলী (আ.)কে মদীনায় রেখে যাচ্ছেন। নবীজী (সা.) হযরত আলীকে বলেন, তুমি না হয় আমি যেকোনো একজনকে মদীনায় থাকতে হবে।
মদীনায় হযরত আলীর উপস্থিতির ফলে মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়ে যায়। কিন্তু এ অবস্থায় মুনাফিকরা নতুন ফন্দি আঁটে। তারা এ গুজব রটিয়ে দেয় যে, বিশ্বনবী (সা.) আলীকে তাবুক যুদ্ধে নিয়ে যেতে চাইলেও তিনি সে নির্দেশ অমান্য করে মদীনায় রয়ে গেছেন। এই রটনা বিশ্বনবী (সা.)-এর কানে পৌঁছালে তিনি বলেন, হযরত মুসা (আ.)-এর কাছে হারুনের যে মর্যাদা ছিল আমার কাছে আলীর মর্যাদা ঠিক তেমন। পার্থক্য হচ্ছে আমার পরে আর কোনো নবী আসবে না।
বিশ্বনবীর মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের নয় বছর পর গোটা আরব উপত্যকার প্রায় সব জায়গা থেকে মূর্তিপূজা উঠে গিয়ে এক আল্লাহর ইবাদত চালু হয়ে যায়। কিন্তু কিছু কিছু স্থানে গোঁড়া ও মূর্খ আরবরা তখনো সত্যের ধর্ম গ্রহণ না করে মূর্তিপূজা চালিয়ে যাচ্ছিল। এ কারণে বিশ্বনবী (সা.) শিরক ও কুফরের মূলোৎপাটন করে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন। পাশাপাশি তিনি হজের মতো আল্লাহর ডাকে সাড়া দেয়ার একটি বিশাল আয়োজনে যেসব কুসংস্কার এতদিন চালু ছিল সেগুলো দূর করে খাঁটি একত্ববাদী হজ প্রতিষ্ঠা করে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তাও উপলব্ধি করেন। এ কারণে রাসূলুল্লাহ (সা.) সূরা তওবার প্রথম কয়েকটি আয়াতসহ হযরত আলী (আ.)কে মক্কায় পাঠিয়ে দেন যাতে মুশরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঐশী নির্দেশ সবাইকে জানিয়ে দেয়া যায়।

হযরত আলী (আ.) মক্কায় পৌঁছে হাজিদের উদ্দেশ্যে আল্লাহর রাসূলের নির্দেশাবলী উচ্চস্বরে ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, আজ থেকে কোনো মূর্তিপূজক কাবাঘরে প্রবেশ করতে পারবে না। কাবাঘরের সম্মান রক্ষা করতে হবে এবং জাহিলিয়্যাতের যুগের মতো কেউ নগ্ন হয়ে কাবা তাওয়াফ করতে পারবে না। এখন থেকে কোনো মূর্তিপূজক হজের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের অধিকার রাখবে না। মুশরিক ও কাফের সর্দারদেরকে ইসলামি শাসনব্যবস্থার মোকাবিলায় নিজেদের অবস্থান ঘোষণার জন্য চারমাস সময় দেয়া হলো। এ সময়ের মধ্যে তারা মূর্তিপূজা ও বহু খোদার উপাসনা বাদ দিয়ে এক আল্লাহর ইবাদতে শামিল হতে পারবে। হযরত আলী (আ.)-এর এ ঘোষণার পর অল্পদিনের মধ্যেই সবাই দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে এবং দশম হিজরির মাঝামাঝি সময়ে আরব উপত্যকায় পরিপূর্ণভাবে ইসলামের পতাকা উড্ডীন হয়। আর এই মহান কাজটি সম্পন্ন হয় হযরত আলী (আ.)-এর মাধ্যমে।
এরপর নবীজী (সা.) আরব উপত্যকার বাইরের অঞ্চলগুলোতে ইসলামের শান্তির বাণী পৌঁছে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি হিজাজ ও ইয়েমেনের মধ্যবর্তী স্থান নাজরানের বিশপের কাছে পত্র লিখে তাদেরকে ইসলাম গ্রহণ করার আহ্বান জানান। নাজরানের বিশপ পত্র পাওয়ার পর পাদ্রীদের বৈঠক ডাকেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় ইসলামের নবীর যথার্থতা যাচাইয়ের জন্য ৬০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল মদীনায় পাঠানো হবে। এই প্রতিনিধিদল মদীনায় পৌঁছে দ্বীন সম্পর্কে যুক্তিপূর্ণ আলোচনা বাদ দিয়ে উল্টো তর্ক শুরু করে দেয়। এ সময় ওহীর ফেরেশতা মুবাহিলার আয়াত নিয়ে নবীজীর কাছে আসেন এবং খ্রিস্টান প্রতিনিধিদেরকে মুবাহিলায় অংশ নেয়ার আহ্বান জানাতে বলেন। মুবাহিলা অর্থ হচ্ছে, বিতর্কে অংশ নেয়া প্রতিটি দল তার ঘনিষ্ঠতম ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে অপর দলকে অভিশাপ দেবে। খ্রিস্টান পাদ্রীরা আল্লাহর রাসূলের এ প্রস্তাবে রাজি হয়। মুবাহিলার জন্য প্রস্তুতি নিতে সেদিনের বিতর্ক শেষ হয়।

এরপর নির্ধারিত দিনে রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আলী (আ.), হযরত ফাতিমা জাহরা সালামুল্লাহি আলাইহা, হযরত হাসান ও হযরত হোসেইনকে সঙ্গে নিয়ে মুবাহিলায় অংশ নিতে রওনা হন। অন্যদিকে খ্রিস্টান নেতারা পরস্পরকে বলেন, যদি দেখা যায় ‘মুহাম্মাদ’ সেজেগুজে সশস্ত্র অবস্থায় এসেছেন তাহলে তার নবুওয়াতের ব্যাপারে সন্দেহ করতে হবে। আর যদি তিনি সাধাসিধে পোশাকে সাধারণ মানুষের মতো আসেন তাহলে বুঝতে হবে তিনি সত্যিই আল্লাহর নবী। খ্রিস্টান প্রতিনিধিরা যখন একথা বলাবলি করছিল তখন নিজের চার ঘনিষ্ঠজনকে সঙ্গে নিয়ে নবীজী (সা.) সেখানে উপস্থিত হন। তারা বিশ্বনবীকে নিজের কন্যা, জামাতা ও মাসুম বাচ্চাদের সঙ্গে নিয়ে মুবাহিলায় অংশ নিতে আসতে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। নাজরানের বিশপ বলেন, আমি এখানে এমন কিছু চেহারা দেখতে পাচ্ছি যারা আল্লাহর কাছে দোয়া করলে আমরা সবাই ধ্বংস হয়ে যাব। এ অবস্থায় তারা মুবাহিলায় অংশ নেবে না বলে বিশ্বনবীকে জানিয়ে দেয় এবং আল্লাহর রাসূল তাদের প্রস্তাব মেনে নেন।
এরপর যতই দিন যেতে থাকে ইসলামের মান-মর্যাদা-সম্মান তত বৃদ্ধি পেতে থাকে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এবার ইয়েমেনের জনগণকে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় দেয়ার জন্য মুয়াজ বিন জাবালকে ওই অঞ্চলে পাঠান। কিন্তু মুয়াজ ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েও ইয়েমেনের জনগণকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হন। তিনি মদীনায় ফিরে এসে আল্লাহর রাসূলকে একথা জানালে তিনি খালিদ বিন ওয়ালিদকে ইয়েমেনে পাঠান। খালিদও ছয়মাসের প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে মদীনায় ফিরে আসেন। এবার রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আলী (আ.)কে ইয়েমেনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি হযরত আলীকে বলেন, যুক্তিপূর্ণ আলোচনা এবং সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেবে।
হযরত আলী (আ.) ইয়েমেন সীমান্তে পৌঁছে মুসলিম যোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে ফজরের নামাজ জামায়াতে আদায় করেন। এরপর ইয়েমেনের সবচেয়ে বড় গোত্র হামদানের লোকজনকে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের সামনে নবীজীর বাণী পড়ে শোনান। হযরত আলী (আ.) হামদ ও সানা পাঠ করার পর এমন সুন্দর ও আকর্ষণী পন্থায় ইসলামের মুক্তি ও সাম্যের বাণী তুলে ধরেন যে, হামদান গোত্রের সব মানুষ অভিভূত হয়ে যায়। তাদের সবাই একদিনের মধ্যে মুসলমান হয়ে যান। হযরত আলী (আ.) এ ঘটনা চিঠির মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সা.)কে জানালে আল্লাহর রাসূল অত্যন্ত খুশি হন এবং আল্লাহর শোকর আদায়ের জন্য সেজদাবনত হন। #
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ/ ১৭
খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন