নভেম্বর ১৮, ২০১৮ ১৬:৫৪ Asia/Dhaka

গত কয়েক আসর ধরে আমরা মৌলানা রুমির জীবন ও কর্ম এবং তাঁর কবিতা বা সাহিত্যকর্মের বিষয়বস্তুসহ এসব সাহিত্যের কিছু মৌলিক উপাদানের দিকে ইঙ্গিত করেছিলাম। আজকের আসরে আমরা তার সাহিত্য-কর্মের আরও কিছু দিক ও বৈশিষ্ট সম্পর্কে আলোচনা করব।

কবিরা বেহেশতি বাগিচার বুলবুল ও সত্যের দর্পন। আরেফ ও রহস্যবাদী সুফি কবি মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি ছিলেন এমনই এক মহাকবি। তাঁর অনন্য সাহিত্য-কর্ম মসনভি কাব্যের খ্যাতি প্রায় ৮০০ বছর পর আজও প্রখর সূর্যের মতই জ্বলজ্বল করছে বিশ্ব-সাহিত্য অঙ্গনে। বিশ্বের বহু গবেষক এই কাব্যকে মানব সভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে চিন্তা-উদ্দীপক ও দিক-নির্দেশনামূলক বইয়ের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় বলে মনে করে থাকেন। আল্লামা ইকবাল লাহোরি এবং হেগেলসহ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বহু দার্শনিক দর্শন বিষয়ে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন রুমির সূক্ষ্ম দর্শন-চিন্তামূলক এই মহাকাব্য থেকে। মসনভির মিষ্টি শরবত পান করে ধন্য হয়েছেন অনেক খ্যাতনামা ইরানি আরেফ ও আধ্যাত্মিক সাধক। তারা এর মধ্যে পেয়েছেন আধ্যাত্মিক বেহেশতি বাগানের ফুলেল সৌরভ।

রুমির মসনভি কাব্য সম্পর্কে এই বিখ্যাত উক্তিটি হয়তো অনেকেই জানেন- যাতে বলা হয়েছে: মাসনাভিয়ে মানাভিয়ে মৌলাভি, হাস্তে কুরআন দার জাব'নে পাহলাভি। অর্থাৎ মৌলাভির আধ্যাত্মিক মসনভি কাব্যটি হচ্ছে ফার্সি ভাষার কুরআন। অনেক গবেষক মনে করেন, এই মন্তব্যটি করেছিলেন প্রখ্যাত ইরানি মরমি কবি মাওলানা আবদুর রহমান জামি।

যদিও আসমানি কিতাব কুরআনের সঙ্গে তুলনা করার মতো কোনো মহাগ্রন্থ বিশ্বে নেই এবং তেমন কিতাব রচনা করা মানুষের সাধ্যাতীত তবুও রুমির মসনভিতে কুরআনের শিক্ষার ব্যাপক প্রতিফলন দেখা যায় বলে কবি জামির এই মন্তব্যটিকে অনেকাংশে যথাযথ বলা যায়।

রুমির মসনভি কাব্যের সঙ্গে পরিচয় নেই এমন শিক্ষিত মুসলিম ব্যক্তি খুব কমই রয়েছেন। ফার্সি ভাষাভাষী অঞ্চল ছাড়াও ভারত উপমহাদেশেও ওয়াজ-নসিহতের মজলিশ বা যে কোনো জ্ঞানগত আলোচনায়  মসনভির শ্লোকগুলো থেকে উদ্ধৃতি দেয়ার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। এসব শ্লোক অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় নীতি-বাক্য বা প্রবাদ বাক্য হিসেবেও। যেমন, বলা হয় সোহবতে সা'লেহ তুরা সা'লেহ কুনাদ/ সোহবতে তা'লেহ তুরা তালেহ কুনাদ/ হামজেন্‌স বা হাম জেন্‌স কুনাদ পারওয়াজ/ কাবুতার ব কাবুতার বা'জ ব বা'জ। এই শ্লোকটিরই ভাবার্থ দেখা যায় 'সৎসঙ্গে স্বর্গবাস অসৎসঙ্গে সর্বনাশ' ও 'সমধর্মীরা একসঙ্গে চলে'  কিংবা 'বড় রসুনের কোষগুলোর উপরের অংশ আলগা বা বিচ্ছিন্ন থাকলেও সেসবের গোড়া একই স্থানে যুক্ত'- এ জাতীয় প্রবাদ বাক্যে।

صحبت صالح ترا صالح كند
صحبت طالح ترا طالح كند
هم جنس با هم جنس كند پرواز
كبوتر با كبوتر ، باز با باز.

খোদা-পরিচিতি তুলে ধরার সময় ভারত উপমহাদেশে অঞ্চলের আলেমদের মুখে শোনা যায় রুমির  মসনভির আরেকটি অমর শ্লোক যাতে বলা হয়েছে:

মান নাগুঞ্জাম দার জামিন ও আসমান লেকেগুঞ্জাম দার ক্বলবে মোমেনান।

অর্থাৎ আল্লাহ বলছেন, আকাশ ও জমিন আমাকে ধারণ করে না, বরং মু'মিনের হৃদয়ই ধারণ করে আমাকে।  

রুমির মসনভি ফার্সি সাহিত্যের অন্যতম সেরা দ্বিপদী কাব্য। এতে রয়েছে প্রায় ২৫ হাজার দ্বিপদী শ্লোক তথা ৫০ হাজার পংক্তি বা লাইন। বলা হয় রুমি এই কাব্য রচনা করেছিলেন তার প্রিয় শিষ্য হিসামুদ্দিন চালাবির অনুরোধে। চালাবি আত্তার ও সানায়ির মতই কাব্য রচনা করতে অনুরোধ করেছিলেন রুমিকে। আর সেই অনুরোধেরই ফসল হিসেবে ফার্সি সাহিত্য-সম্ভারে যুক্ত হয়েছে মসনভির মত এক অনন্য ও অমর কাব্য। তাই রুমি নিজেও তার কবিতায় চালাবিকে স্মরণ করেছেন শ্রদ্ধাভরে ও কৃতজ্ঞ চিত্তে।   

মসনভি কাব্যের মূল লক্ষ্য হল মানুষকে নানা বিষয়ে আসল বাস্তবতার শিক্ষা দেয়া। মানব-জীবনের নানা পর্যায় ও চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে তাদেরকে সচেতন করতে চেয়েছেন জালালুদ্দিন রুমি। মসনভিতে নৈতিকতা ও প্রশিক্ষণের ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছেন এই মহান কবি। আর এ জন্য অনেক সুন্দর গল্প ও উপমা ব্যবহার করেছেন সূক্ষ্মদর্শী রুমি। মানুষকে সুরুচি ও সুশিক্ষার সঙ্গে অভ্যস্ত করতে চাইতেন রুমি। নানা গল্প ও উপমার মধ্য দিয়ে রুমি মানুষের চিন্তা-চেতনায় এইসব সুশিক্ষার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়েছেন। 

আমরা আগেই ইঙ্গিত করেছি যে রুমির মসনভি হচ্ছে পবিত্র কুরআন ও ইসলামী শিক্ষা বা হাদিসের বাহক। কুরআন ও হাদিসেরই নানা শিক্ষা এবং নবী-রাসুলদের কাহিনী এই মহাকাব্যে নানা আঙ্গিকে বহু গল্প আর উপমার শৈল্পিক উপস্থাপনায় তুলে ধরা হয়েছে। আর এ জন্যই মসনভি হয়েছে কালোত্তীর্ণ এক অমর কাব্য। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতদের অমর অনেক উক্তি বা সেসবের ভাবার্থ কখনও সরাসরি আবার কখনও সারাংশ বা নির্যাস-আকারে তথা পরোক্ষভাবে স্থান পেয়েছে রুমির শৈল্পিক ভাষায়।

মাওলানা রুমি তার কাব্যে গল্প ও উপমা ব্যবহারে যে অসাধারণ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন তা তার আগে তার মত সরল অথচ মিষ্টি ভাষায় খুব কম ইরানি কবি বা লেখকই তুলে ধরতে পেরেছেন। রুমির কবিতাগুলো এক্ষেত্রে আজও অনন্য এবং স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর।  রুমির ভাষা ছিল সাধারণ মানুষের ভাষার মতই সহজ সরল ও সাবলীল অথচ সব ধরনের কাব্যিক সৌন্দর্যে ভরপুর।

রুমির মসনভির গল্পগুলোর বিন্যাস ও গাঁথুনি এমনই যে তা পাঠককে গল্পের শেষ অধ্যায় পর্যন্ত টেনে নিতে বাধ্য করে। আর তার গল্পের একটা অধ্যায় শেষ না হতেই পাঠক হুমড়ি খেয়ে পড়েন পরের অধ্যায়ে কি হয়েছে তা জানার জন্য। এ বিষয়টাকে অনেকাংশে অনুসন্ধানী সিরিজ গল্প বা শিহরণ-জাগানো অ্যাডভেঞ্চারের রহস্য-ভরা উপন্যাসের অনিবার্য আকর্ষণের সঙ্গেই তুলনা করা যায়।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/   ১৮

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন