এপ্রিল ২৮, ২০১৯ ১২:৪৬ Asia/Dhaka

আপনারা জানেন যে, ইরানের জলে-স্থলে, ক্ষেত-খামারে, বাগ-বাগিচায়, কল-কারখানায় উৎপাদিত হয় বিচিত্র সামগ্রী। এর পাশাপাশি খনি থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন সামগ্রী এবং ইরানি নরনারীদের মেধা ও মনন খাটিয়ে তৈরি করা হয় বিভিন্ন শিল্পপণ্য। গত আসরে আমরা ভবন নির্মাণ সামগ্রী ও সিরামিক শিল্পে ইরানের অগ্রগতি নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছি।

ভবন নির্মাণ সামগ্রির উল্লেখযোগ্য একটি পণ্য ইরানে তৈরি হয়। এই পণ্যটি হলো ফসেট বা প্লাম্বিং ফিটিংস। বাথরুম ফিটিংস কিংবা কিচেনের ট্যাপ, সিঙ্ক, প্লাম্বার, শাওয়ার ইত্যাদিও এই পণ্যের অন্তর্ভুক্ত। আসলে পানিকে বলা যায় বিভিন্ন সভ্যতা গড়ে ওঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাথমিক উপাদান। প্রাচীন যেইসব সভ্যতা নিয়ে বিশ্ব গর্ব করে সেসব সভ্যতার বেশিরভাগই গড়ে উঠেছে নদীর তীরবর্তী এলাকায়। যেমন নীলনদ, দজলা, ফোরাত, সিন্ধ, গঙ্গা, হোয়াংহো ইত্যাদি নদীর তীরে গড়ে উঠেছে সভ্যতাগুলো। ধীরে ধীরে এসব সভ্যতা সমৃদ্ধি ও বিস্তৃতি লাভ করেছে। যাই হোক আমরা মূল আলোচনায় যাচ্ছি।

কেন নদীতীরে গড়ে উঠেছিল প্রাচীন সভ্যতাগুলো? এরকম একটা প্রশ্ন জাগতেই পারে। জবাব হলো কৃষিকাজের প্রয়োজনে পানির কোনো বিকল্প ছিল না। পানির জন্য সবাই মোটামুটি একই জায়গায় বসবাস করতে শুরু করেছিল এবং খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতে মানুষ মিলেমিশে কাজ করতে শুরু করে। সেইসঙ্গে একটা সামাজিক বন্ধন তৈরি হতে থাকে। সুতরাং পানির মূল্য ইরানের লোকজন সেই প্রাচীনকাল থেকেই বুঝতে শুরু করে এবং জীবনের যে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় পানি, সে ব্যাপারেও সচেতন হয়ে ওঠে। প্রাকৃতিকভাবেই মানুষের পানি প্রয়োজন। কিন্তু ভৌগোলিক দিক থেকে ইরান একটু শুষ্ক হবার কারণে এখানকার কোনো এলাকায় পানি বেশ দুর্লভ ছিল। তাই পানির চাহিদা মেটাতে ইরানিরা সেই প্রাচীনকাল থেকেই ক্যানেল বা খালের মতো নালা তৈরি করেছিল। বাসা বাড়ি নির্মাণের জন্য যেমন পানির চাহিদা ছিল বেশ তেমনি পান করার জন্যও পানির ছিল প্রচণ্ড চাহিদা। পানির সকল চাহিদা মেটাতেই ইরানিরা এই টেকনিক বা কৌশল অবলম্বন করেছিল।

আজকাল জনসংখ্যা বেড়েছে। তাই পানির প্রয়োজনও আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে খাবারের বিশুদ্ধ পানি খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে এখন। মূলত সেই সচেতনতা ও গুরুত্ব থেকেই বাসাবাড়ি কিংবা কলকারখানায় প্লাম্বিং ফিটিংসের প্রয়োজন দেখা দেয় এবং ইরান এই শিল্পক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই বেশ উন্নতি করেছে। পানির ট্যাপ একটা ধাতব বস্তু। সাপ্লাইয়ের পানি ছাড়া এবং বন্ধ করার প্রয়োজনে এই ট্যাপ ব্যবহার করা হয়। পানি ছাড়াও গ্যাস সরবরাহ করা এবং সরবরাহ বন্ধ করার জন্য ট্যাপ ব্যবহৃত হয়। ট্যাপ মৌলিক দুটি ভাগে বিভক্ত। একটি হলো কলকারখানায় ব্যবহৃত ট্যাপ। এগুলোকে বলা হয় ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভালভ। অন্য প্রকার ট্যাপ হলো ভবন বা বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত হয় যেগুলো। এই শ্রেণীর ট্যাপকে বলা হয় ফসেট কিংবা স্যানিটারি ট্যাপ। এ নিয়ে আমরা আরও কথা বলবো একটু পর মিউজিক বিরতি শেষে।

দুই প্রকার ট্যাপের কথা বলছিলাম। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভালভ এবং স্যানিটারি ট্যাপ। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভালভ ব্যবহার করা হয় কোনো তরল সরবরাহের পাইপ লাইনে। সরবরাহ চালু করা এবং বন্ধ করার জন্য ব্যবহৃত হয় এগুলো। শিল্পাঞ্চলেই এগুলোর ব্যবহার বেশি। সুয়োরেজ লাইন, ঠাণ্ডা-গরম সিস্টেম, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বাঁধ নির্মাণম তেল-গ্যাস শিল্প এবং পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের ক্ষেত্রেও এই ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভালভ ব্যবহার করা হয়। বিল্ডিং স্যানিটারি ভালভ বর্তমান বিশ্বে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি শিল্পের মর্যাদা পেয়েছে। মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতির উন্নয়ন ও পরিবর্তন, শহুরে নাগরিকের সংখ্যা বৃদ্ধি, মানুষের আয়-উপার্জন বৃদ্ধি সর্বোপরি হাউজিং শিল্পে ব্যাপক অগ্রগতির ফলে এই বিল্ডিং স্যানিটারি ভালভের প্রয়োজনীয়তা ও চাহিদা বেড়ে গেছে।  এগুলোর রকমারি ডিজাইন বাসার অভ্যন্তরীণ ডেকোরেশনেও ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে।

ট্যাপ ব্যবহারের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। ইতিহাসের বিভিন্ন নিদর্শন থেকে জানা যায় খ্রিষ্টপূর্ব সাত শ বছর আগে ফোয়ারাসহ বিশেষ বিশেষ ভবনে পানি সরবরাহের প্রয়োজনে পাইপ লাইন এবং প্লাম্বিং ফিটিংস ব্যবহার করা হতো। তবে এইসব ফিটিংস একেক যুগে একেক রকম ছিল। সিরামিক, মাটি, মর্মর পাথর, সোনা, রূপা, সিসা ইত্যাদি এমন ধরনের বস্তু ছিল যে প্রাচীনকালের মানুষেরা বিশেষ কিংবা গণহাম্মাম নির্মাণ করতে এগুলো ব্যবহার করতো। বলা হয়ে থাকে যে ট্যাপ তৈরি করার জন্য এমনকি কাঠ পর্যন্ত ব্যবহার করা হতো। এখন অবশ্য পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। এখন ট্যাপ তৈরি করা হয় বেশিরভাগ ব্রোঞ্জ দিয়ে।

ইরানে বিল্ডিং স্যানিটারি ভালভ শিল্পের ইতিহাস অর্ধ শতাব্দি পুরোনো। সর্বপ্রথম যে কারাখানাটি স্থাপিত হয়েছিল সেটিতে ব্রোঞ্জের ট্যাপ তৈরি করা হয়েছিল। ১৯৬৩ সালের ঘটনা এটি। এখন তিন শ'রও বেশি কোম্পানি বিল্ডিং স্যানিটারি ভালভ তৈরি করছে। ইরানের এই জ্ঞান ভিত্তিক কোম্পানিগুলো সম্প্রতি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে ব্যাপক উন্নত মানের বিল্ডিং স্যানিটারি ভালভ তৈরি করে যাচ্ছে। সেইসঙ্গে তারা নতুন নতুন পদ্ধতিতে নতুন ডিজাইন আবিষ্কারের কাজে নিয়োজিত রয়েছে। সেন্সর্ড ট্যাপ এ ধরনেরই উন্নত মানের একটি সংযোজন। ইলেক্ট্রোনিক স্মার্ট বিল্ডিং স্যানিটারি ভালভও এরকমই উন্নত প্রযুক্তির একটি পণ্য যা এখন ইরানে অহরহ উৎপাদিত হচ্ছে। বলা বাহুল্য এই প্রযুক্তিটি ইরানের একান্ত নিজস্ব।#

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/  ২৮