রমজান : রহমতের বসন্ত (পর্ব-১০)
আশা করছি এ আলোচনা হবে সবার জন্য সৌভাগ্য ও সাফল্যের মাধ্যম। হে পরম করুণাময়! মহানবী (সা) ও তাঁর পবিত্র বংশধরদের প্রতি দরুদ পাঠানোর উসিলায় রমজানে যেন আমরা সর্বোচ্চ শুদ্ধি, সম্মান ও উন্নতি অর্জন করতে পারি।
রমজানের ধারাবাহিক আলোচনায় আত্মসংশোধন ও পাপ-বর্জনের পন্থা সম্পর্কে আমরা কথা বলছিলাম। মহাপুরুষরা বলেন মানুষের অন্তর হলো আয়নার মত উজ্জ্বল ও পরিষ্কার । কিন্তু ক্রমাগত দুনিয়ার মায়া আর পাপের প্রভাবে সে আয়না হয়ে পড়ে অন্ধকার। রোজার মাধ্যমে মানুষ কামনা-বাসনা ও ভোগ-বিলাসকে দূরে সরিয়ে রাখে এবং আল্লাহ ছাড়া আর সবকিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে। কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে রোজা রাখলে এর পুরস্কার হিসেবে খোদার করুণা বর্ষিত হতে পারে এবং বান্দার হৃদয়ের আয়না থেকে কলুষ ও অন্ধকার দূর হওয়ায় দুনিয়াবি আনন্দ থেকে সে মুখ ফিরিয়ে নেবে। আর ক্বদরের রাতে এই বান্দা হয়ে উঠবে আলোকিত, যা আল্লাহর ওলী আর প্রকৃত মুমিনেরা অর্জন করেন। এ ধরণের রোজার পুরষ্কার হলেন স্বয়ং আল্লাহ । তিনি বলেছেন: "রোজা আমার জন্য এবং আমিই এর পুরস্কার।” আর কোনো কিছুই এমনকি বেহেশতি বাগানও এমন রোজার পুরস্কার হতে পারে না।
কেউ যদি ভাবে রোজার মানে একদিকে অনাহার ও অন্যদিকে গীবত আর পরচর্চাও চালিয়ে যাওয়া, তবে এমন রোজা হবে অর্থহীন ও নিস্ফল। এমন রোজাদারতো খোদার উৎসবে যোগ দেয়ার ন্যূনতম ভদ্রতাও জানে না। সে তার দয়াময়ের হক নষ্ট করেছে। অথচ দয়াময় আল্লাহ মানুষ সৃষ্টির আগেই তার জীবন যাপন ও প্রবৃদ্ধির সব উপকরণ যুগিয়েছেন। তিনি পথ দেখাতে পাঠিয়েছেন নবী-রাসুল ও আসমানি কেতাব। আল্লাহ মানুষকে দিয়েছেন মহত্বের উৎস ও আলো তথা আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার শক্তি এবং দিয়েছেন ইন্দ্রিয়,বুদ্ধিমত্তা ও তাঁর রহমত পাবার সম্মান। এখন আল্লাহ নিজের দাসদেরকে তাঁর মেহমানখানায় প্রবেশের দাওয়াত দিয়েছেন, যেন মানুষ সেখানে খোদার শোকর-গুজার হয় এবং তাঁর যথাসম্ভব প্রশংসা করে। যে দাস খোদার পক্ষ থেকে এমন মহাসুযোগ পায় ও যে খোদারই অফুরন্ত রিজিক গ্রহণ করছে– সেই প্রভু, সেই মেজবানের বিরোধিতা করা কি দানের হাতেই কামড় মারা বা মেহমান হয়েও মেজবানকে গালি দেয়ার মত চূড়ান্ত অকৃতজ্ঞতা নয়?

রমজানের অতিথিদের অবশ্যই জানতে হবে কে তার মেজবান ও কী তাঁর মর্যাদা! রোজার রীতিনীতিও জানতে হবে। সদগুণাবলীর বিপরীত কাজ করে খোদাদ্রোহিতা করা যাবে না। পরম সত্তার অতিথিদের জানতে হবে আলো ও মহত্বের উৎস তথা মহিমান্বিত প্রভুর সান্নিধ্য কী– যা পেতে নবী-রাসুল (আ.) ও ইমামরা (আ.) ছিলেন সদা-সচেষ্ট। তারা মুনাজাতে বলতেন: আমাদের অন্তরের দৃষ্টিকে তোমার দিকে তাকানোর মাধ্যমে আলোকিত করে দাও,যতক্ষণ না আমাদের অন্তর্দৃষ্টি আলোর পর্দাকে ছিন্ন করে মহত্ত্বের উৎসের সাথে মিলিত না হয়।”
রমজানে আল্লাহর দেয়া এই সভা-ই হলো সেই আলো ও ‘মহত্ত্বের উৎস যাতে যোগ দিতে সদা-প্রশংসিত খোদা তাঁর বান্দাদেরকে দাওয়াত দিয়েছেন। কিন্তু বান্দা যদি সব ধরণের দয়া ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তির এই সভার জন্য যোগ্য ও প্রস্তুত না হয়, তবে সে এই মহান অবস্থানে পৌঁছানো তো দূরে থাক্ তাতে প্রবেশই করতে পারবে না। এটা কী করে সম্ভব যে, দেহ ও মনের পাপ, আধ্যাত্মিক অবিশুদ্ধতা ও নিচতা নিয়ে কেউ তার প্রভুর মেহমানখানায় প্রবেশ করবে তাঁরই সান্নিধ্য পেতে!!?
অন্ধকারের পর্দায় ঢাকা দূষিত হৃদয় নিয়ে কোনো ব্যক্তি রমজানেও এই আধ্যাত্মিক তাৎপর্য ও সত্যগুলো উপলব্ধি করতে পারবে না। তাই আল্লাহর সাথে অন্তরের মিলিত হবার পথে বাধা ও পর্দাগুলোকে অবশ্যই ছিন্ন করতে হবে। বস্তু-জাগতিক দুনিয়ার সবই হলো অন্ধকার পর্দা। আর দুনিয়া যদি হয় মহাসত্যের দিকে মনোযোগী হবার ও পরকালীন সম্মানজনক আবাসে উপস্থিত হবার উপকরণ,তাহলে অন্ধকার পর্দাগুলো আলোর পর্দায় রূপান্তরিত হয়। “আর আল্লাহ ছাড়া সবকিছু থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার”অর্থ হলো সব অন্ধকার ও এমনকি আলোর পর্দাগুলোকেও ছিন্ন করা যতক্ষণ না খোদায়ী মেহমানখানায় প্রবেশ করা যাচ্ছে। খোদায়ী মেহমানখানা হলো ‘মহত্ত্বের উৎস বা আল্লাহরই বিশেষ নৈকট্য। তাই মুমিনরা খোদার কাছে অন্তরের দৃষ্টি এবং ঔজ্জ্বল্যের জন্য নিবেদন করেন যাতে মুনাজাতকারী আলোর পর্দাগুলোকেও ছিন্ন করে মহত্ত্বের উৎসের কাছে পৌঁছে যায়। কিন্তু যে ব্যক্তি এখনও অন্ধকারের পর্দাগুলোই ছিঁড়তে পারেনি সে কিভাবে আলোর পর্দা ছিঁড়বে?
- মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে উচ্চতর খোদাপ্রেম দান করুন মহানবী (সা) ও তাঁর পবিত্র বংশধরদের শানে দরুদ পাঠানোর উসিলায়।
দশম রমজানের দোয়া ও তার অর্থ:

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আবু সাঈদ/ ১০
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।