রমজান : রহমতের বসন্ত (পর্ব-১১)
হে পরম করুণাময়! মহানবী (সা) ও তাঁর পবিত্র বংশধরদের প্রতি দরুদ পাঠানোর উসিলায় রমজানে যেন আমরা সর্বোচ্চ প্রশান্তি, আত্মশুদ্ধি ও সৌভাগ্য অর্জন করতে পারি।
রমজান আত্মশুদ্ধি, আত্ম-উন্নয়ন ও খোদাপ্রেমে আত্মহারা হওয়ার মত নানা উচ্চতর লক্ষ্য অর্জনের বাস্তব অনুশীলনের মোক্ষম মাস। প্রকৃত খোদা-প্রেমিক বাহ্যিক লাভের আশায় বা ক্ষতির ভয়ে কিংবা বেহেশত লাভ ও দোযখের ভয়ে আল্লাহর ইবাদত করেন না। প্রকৃত দাস বা প্রেমিক আল্লাহর বিধান ও ইচ্ছার মোকাবেলায় নিজের কোনো ইচ্ছাই রাখেন না। তারা কেবল ইবাদতের সময় নয় বরং প্রতিটি কাজে ও পদক্ষেপে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করেন। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করে তারা মানুষের প্রশংসা পাবারও আশা করেন না। মানুষ কখনও তার ধার্মিকতা, দানশীলতা ও সংযমের কথা জানুক বা কেউ এসবের প্রশংসা করুক-তাও তারা কখনও চাননা। প্রকৃত খোদাপ্রেমিক তার পুরো অস্তিত্বকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মশগুল রাখেন। পুরো অস্তিত্ব ও মন-প্রাণকে আল্লাহর জন্য খালেস করা সহজ কাজ নয়। প্রতিটি নিঃশ্বাস, ভাবনা ও দৃষ্টি এবং চিন্তায় মহান আল্লাহর জন্য পুরোপুরি নিবেদিত-প্রাণ হওয়ার পুরস্কার অকল্পনীয়। এ ধরনের মানুষের একটি রোজা বা এক রাকাত নামাজ অন্য সাধারণ মুমিনের হাজার হাজার রাকাত নামাজ ও হাজার হাজার রোজার চেয়েও বেশি দামি।
যে ব্যক্তির সব মনোযোগ দুনিয়ার দিকে নিবদ্ধ ও আল্লাহ থেকে বিচ্যুত, যে আধ্যাত্মিক জগতগুলো সম্পর্কে মূলতঃ বেখবর ও নিজেকে পরিশুদ্ধ করার ও আধ্যাত্মিক ক্ষমতাগুলোকে কাজে লাগানোর এবং অন্তরের কালো পর্দাগুলোকে দূর করার সিদ্ধান্ত নেয়নি– সে নিজেকে জাহান্নামের 'অতল গহবরের বাসিন্দা করে ফেলেছে। এদের সম্পর্কেই পবিত্র কুরআনের সুরা তিনে বলা হয়েছে: “অতঃপর তাকে নামিয়ে দিয়েছি নিচ থেকে নিচে।” অথচ রাব্বুল আলামিন মানুষকে সৃষ্টির সর্বোচ্চ সম্মানিত অবস্থায় ও সম্মানজনক অবস্থান দিয়ে তৈরি করেছেন। সুরা তিনে আল্লাহ বলেছেন: “নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সুন্দরতম অবয়বে সৃষ্টি করেছি।”

কেউ যদি নিজের কামনার দাস হয় এবং যখন থেকে সে নিজেকে বুঝতে শুরু করে, তখন থেক যদি নীচ দুনিয়াবি বিষয় ছাড়া অন্য কোনোদিকে মনোযোগ না দেয় ও মনে না করে যে, এই নোংরা অন্ধকার দুনিয়ার ঊর্ধ্বে অন্য কোনো জায়গা ও অবস্থান রয়েছে,তাহলে সে অন্ধকারের পর্দায় ডুবে যাবে। এমন মানুষ তাদের মতো হবে যাদের সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে: “কিন্তু সে অধঃপতিত ও নিজের রিপুর অনুগামী হয়ে রইল।”(সূরা আল আ'রাফ,৭:১৭৬)
নানা পাপে-দূষিত হৃদয় অন্ধকারের পর্দায় আবৃত হয়। নানা পাপকর্মের দরুন সেই অন্ধকার হৃদয় মহান খোদার থেকে এতই দূরে সরে গিয়েছে যে, প্রবৃত্তির উপাসনা আর দুনিয়ার পেছনে ছোটা তার বুদ্ধিমত্তা ও অন্তর্দৃষ্টিকে অন্ধ করে দেয়। এমন হৃদয়ের ব্যক্তি অন্ধকার পর্দার আবরণ থেকে মুক্ত হতে পারবে না; আল্লাহ ছাড়া আর সব কিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা তো দূরের কথা। এমন ব্যক্তির ঈমান সর্বোচ্চ এতটুকু হতে পারে যে,সে অন্ততঃ ওলি-আউলিয়ার অবস্থানকে অস্বীকার করবে না এবং আলমে বারযাখ,সিরাত, পুনরুত্থান, বিচার,কিতাব, জান্নাত-জাহান্নাম ইত্যাদিকে কল্পকাহিনী মনে করবে না।
দুনিয়ার প্রতি অন্তরের আসক্তি এবং নানান পাপের দরুন মানুষ ধীরে ধীরে জান্নাত-জাহান্নাম ও সংশ্লিষ্ট সত্যগুলোকেও অস্বীকার করে,অস্বীকার করে আল্লাহর ওলিদের অবস্থানকে।
গাফিলতির ঘুম থেকে জেগে ওঠা উচিত। খোদামুখী অভিযাত্রার পথে প্রথম পদক্ষেপ হলো জেগে ওঠা। হৃদয় ঘুমিয়ে না থাকলে ও পাপকর্মের দরুন কালো না হলে মানুষ অনুচিত কথা-কর্ম চালিয়ে যেত না। পরকালীন দুনিয়ার ভয়াবহতা নিয়ে ভাবলে মানুষ নিজ দায়িত্বগুলোর প্রতি বেশি গুরুত্ব দিত ও গিবত করত না। যে জিহ্বা গিবতে লিপ্ত কেয়ামতের দিন তা হবে পদদলিত!গীবত, বিভেদ,শত্রুতা,ঈর্ষা, সন্দেহপ্রবণতা,স্বার্থপরতা আর অহংকার-ঔদ্ধত্যের ফলাফল হলো জাহান্নাম তথা চিরস্থায়ী আগুন।
যেসব রোগে কোনো কষ্ট অনুভূত হয় না,সেগুলো বাহ্যিক কষ্টদায়ক রোগের চেয়ে আরো ভয়ানক। মানসিক অসুস্থতায় যদি ব্যথা লাগত,তাহলে সেই ব্যথার জন্য খোদার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো যেতো। কারণ মানুষ বাধ্য হয়ে শেষমেষ প্রতিকার খুঁজত।
কিন্তু অহংকার ও স্বার্থপরতার রোগের মত ব্যথাহীন ভয়ানক রোগ বা পাপগুলো মানুষের হৃদয় ও আত্মাকে দূষিত করে ফেলে। এসব রোগে ব্যথার বদলে বাহ্যিক আনন্দও পাওয়া যায়। পরচর্চার আড্ডাগুলো খুবই আনন্দের! নিজের প্রতি ভালোবাসা আর দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা,যা হলো সব পাপের মূল,তা-ও সুখময়। ড্রপসি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি পানির কারণেই মারা যায়,তবুও শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত পানি পানকে উপভোগ করে। যে রোগে মানুষ আনন্দ পায় ও তাতে ব্যথা না থাকে,তবে যতই তাকে বলা হোক,এটা প্রাণঘাতী রোগ,সে বিশ্বাসই করবে না! ভোগবাদিতা ও দুনিয়াপূজায় আক্রান্ত রোগীর কাছে দুনিয়া আর দুনিয়াবি জিনিস ছাড়া অন্য সব কিছুই ক্লান্তিকর অসহ্য! ফলে তখন সে হয় আল্লাহর শত্রু,আল্লাহর বান্দাদের শত্রু,নবী-আওলিয়া ও আল্লাহর ফেরেশতাদের শত্রু। তাদেরকে সে অপছন্দ করবে,ঘৃণা করবে। আর যখন খোদার তরফ থেকে ফেরেশতা তার জান কবজ করতে আসবে,তখন তার ঘৃণাবোধ হবে,বিকর্ষণ হবে কারণ সে দেখবে যে,খোদার ফেরেশতা তাকে তার প্রিয়বস্তু তথা দুনিয়া ও দুনিয়াবি জিনিস থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে মৃত্যুর সময়ও ঈমান ও খোদাপ্রেমে অবিচল রাখুন মহানবী (সা) ও তাঁর পবিত্র বংশধরদের শানে দরুদ পাঠানোর উসিলায়।
১১তম রমজানের দোয়া ও তার অর্থ:

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আবু সাঈদ/ ১১
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।