রমজান : রহমতের বসন্ত (পর্ব-১২)
আশা করছি এ আলোচনা হবে সবার জন্য প্রশান্তি ও সৌভাগ্যের মাধ্যম। হে পরম করুণাময়! মহানবী (সা) ও তাঁর পবিত্র বংশধরদের প্রতি দরুদ পাঠানোর উসিলায় রমজানে যেন আমরা ক্রমেই মহান আল্লাহর বেশি বেশি ক্ষমা ও সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি।
মৃত্যুর প্রাক্কালে ও শেষ নিঃশ্বাস নেয়ার সময় পর্যন্ত ঈমানে অবিচল থাকা ও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ ও সন্তুষ্ট থাকা একটি অতি জরুরি ও সৌভাগ্যের বিষয়। এ জন্য সব সময়ই আল্লাহর কাছে দোয়া করা ও প্রস্তুত থাকা ভালো। মৃত্যুর সময় আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞ বা অসন্তুষ্ট হওয়া ও ঈমান হারানোর অর্থ হল অতীতের সব সুকীর্তি ও সৎ কাজ ব্যর্থ হয়ে যাওয়া। তাই অশেষ রহমতের মাস ও দোয়া কবুলের বিশেষ মাস রমজানে এ জন্য বিশেষ দোয়া ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনে মগ্ন থাকা উচিত।
ভোগবাদীরা আল্লাহদ্রোহী হয়ে,খোদায়ী উপস্থিতির প্রতি শত্রুতা পোষণ করে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়। এমনই ধারার এক লোক মৃত্যুর সময় বলেছিল,“খোদা আমার ওপর সবচেয়ে বেশি জুলুম করেছেন! খোদা এখন আমায় এই সন্তানদের থেকে আলাদা করতে চান, যাদেরকে বড় করতে আমি এত কষ্ট সহ্য করেছি!?”

কেউ যদি নিজেকে পরিশুদ্ধ না করে,দুনিয়া থেকে নজর ফিরিয়ে না নেয় এবং অন্তর থেকে দুনিয়ার মায়াকে বিতাড়িত না করে,তাহলে আশঙ্কা থেকে যায় যে,খোদার প্রতি এবং তাঁর আওলিয়ার প্রতি উপচে-পড়া রাগ ও ঘৃণা নিয়ে সে দুনিয়া ত্যাগ করবে। তাকে ভয়ানক পরিণাম বরণ করতে হবে। এ ধরণের লাগামহীন বেপরোয়া মানুষকে কি সৃষ্টির সেরা জীব বা আশরাফুল মাখলুকাত বলা উচিত নাকি বলা উচিত 'আসফালাস সাফিলিন' তথা নিকৃষ্টদের মধ্যে নিকৃষ্টতম?
“সময়ের শপথ। নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু তারা নয়,যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে উপদেশ দেয় সত্যের এবং তাকিদ করে সবরের।” (সূরা আল-আসর্)-কুরআনের এই সূরার আলোকে সবাই-ই ক্ষতিগ্রস্ত, কেবল ব্যতিক্রম হলো সৎকর্মশীল মুমিনরা। আর সৎকাজ অবশ্যই আত্মার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। অথচ সাধারণ মানুষের বেশিরভাগের কাজই আত্মার সাথে নয় বরং দেহের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। তারা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলে না। যদি আমরা দুনিয়া ও আত্মপ্রেমের টানে চলি আর এই মায়া যদি আমাদেরকে আধ্যাত্মিক সত্য ও বাস্তবতাগুলো অনুধাবনে বাধা দেয়, বাধা দেয় নির্ভেজালভাবে আল্লাহর রাহে কাজ করতে, সৎকাজের আদেশ দিতে ও সবরের তাকিদ করতে, তাহলে আমরা সঠিক পথের দিশা না পেয়ে হব পথভ্রষ্ট। পথভ্রষ্ট হয়ে আমরা হারিয়ে যাব এই দুনিয়ায় ও পরকালেও। কারণ আমাদের যৌবন আমরা শেষ করে ফেলব এই দিশাহারা অবস্থায়। ফলে বঞ্চিত হব স্বর্গীয় সুখ ও পরকালীন অন্যান্য সৌভাগ্য থেকে, এমনকি দুনিয়াবি সৌভাগ্য থেকেও।
কারো মধ্যে দুনিয়া ও আত্মপ্রেম খুব বেশি হয়ে পড়লে শয়তান তার ঈমান কেড়ে নেয়। শয়তানের সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টা হলো মানুষকে ঈমানহারা করা। ঈমানের গ্যারান্টির দলিল বলে কিছু নেই। কারো ঈমানটা যদি দৃঢ় না হয় তাহলে শেষমেষ শয়তানের চেলা হয়ে সে এই দুনিয়া ত্যাগ করবে মহান আল্লাহ ও তাঁর ওলিদের প্রতি শত্রুতা নিয়ে। আবার হয়ত কেউ জীবনভর খোদায়ি দয়া পেয়েও শেষ জীবনে এসে হতাশ হয়ে ঈমান ত্যাগ করবে ও দুনিয়া ছাড়বে খোদা-বিরোধী হয়ে। খোদাপ্রেমিকদের দৃষ্টিতে বাহ্যিক জাঁকজমকের এই দুনিয়া এতই তুচ্ছ যে, সে ভালোবাসা পাবার যোগ্য নয়।
ধরা যাক্ কেউ দুনিয়াদার মানুষদের মত আরামদায়ক বিলাসী জীবন পেয়ে জীবনটাকে ভোগ-বিলাস ও পানাহারে কাটিয়ে দিল। কিন্তু জীবন-শেষে মনে হবে জীবনটা এক সুখ-স্বপ্নের মত পার হয়ে গেছে। কিন্তু এই জীবনের প্রতিফল ও দায়বদ্ধতাগুলো ঠিকই সাথেই থাকবে। অনন্ত শাস্তির তুলনায় এই সংক্ষিপ্ত কথিত সুখকর জীবনের কী মূল্য আছে? দুনিয়াপ্রেমিক মানুষের শাস্তি কখনো কখনো অনন্তকালের জন্য। দুনিয়ালোভীরা ভাবে যে, তারা দুনিয়াবি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে লাভবান হয়েছে। কিন্তু আসলে তারা ব্যর্থ। তারা ভুলের মধ্যে আছে। সবাই দুনিয়াকে নিজের পরিবেশ-পরিস্থিতির জানালা দিয়ে দেখে ভাবে যে, সে যেটুকু দেখেছে, সেটাই হলো দুনিয়া। কিন্তু বস্তুজাগতিক দুনিয়া তার চেয়ে অনেক বেশি বড়। গোটা এই জগত সম্পর্কে বর্ণনা আছে যে, “আল্লাহ কখনো এর দিকে দয়ার দৃষ্টিতে তাকান নাই।”(বিহারুল আনওয়ার,অধ্যায় ১২২, হাদিস ১০৯) তবে সেই অপর জগতটি কেমন, যার দিকে মহান আল্লাহ দয়ার দৃষ্টিতে তাকিয়েছেন? যে মহত্বের উৎসের দিকে তথা আল্লাহর পরম সান্নিধ্যের দিকে মানুষকে আহ্বান জানানো হয়েছে,তার উৎসকে প্রকৃতরূপে উপলব্ধি করার যোগ্যতাই মানুষের নেই।
কেউ যদি নিজের নিয়ত ও কাজকে বিশুদ্ধ করে,অন্তর থেকে পদ-পদবির প্রতি আকর্ষণ,আত্মপ্রেম ইত্যাদি দূর করে,তবে তার জন্য এক উচ্চ মর্যাদার স্থান তৈরি হবে। আল্লাহর সৎ বান্দাদের এই উচ্চ মর্যাদার তুলনায় গোটা দুনিয়া ও এর বাহ্যিক সব বিষয়ের এক পয়সাও মূল্য নেই। কিন্তু প্রকৃত খোদাপ্রেমিক এমনভাবে আত্মোন্নয়ন করেন যে তারা এই সুউচ্চ অবস্থান অর্জনের দিকেও নজর দেন না। তারা খোদাকে ডাকেন,মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে তাঁকে সেজদা করেন, কারণ তিনিই ইবাদতের একমাত্র যোগ্য ও সর্বশক্তিমান। এভাবেই উচ্চস্তরের সাধক ও খোদাপ্রেমিকরা আলোর পর্দা ছিন্ন করে মহত্ত্বের উৎসকে লাভ করেন। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে এমন সৌভাগ্য দান করুন মহানবী (সা) ও তাঁর পবিত্র বংশধরদের শানে দরুদ পাঠানোর উসিলায়।
১২তম রমজানের দোয়া ও তার অর্থ:

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আবু সাঈদ/ ১২
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।