রমজান : রহমতের বসন্ত (পর্ব-১৫)
আশা করছি এ আলোচনা হবে সবারই সৌভাগ্যের পাথেয়। হে সর্বশক্তিমান ও সর্বোচ্চ করুণাময়! মহানবী (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি দরুদ পাঠানোর উসিলায় রমজানে যেন আমরা ক্রমেই মহান আল্লাহর বেশি বেশি রহমত, বরকত ও মাগফিরাত পেতে পারি।
পবিত্র কুরআন চর্চার বসন্তকাল মাহে রমজান। এ ছাড়াও বেশি বেশি আল্লাহর স্মরণ বা জিক্র্ করা, আল্লাহর দরবারে মুনাজাত, কান্নাকাটি ও তওবার এবং তাহাজ্জতের নামাজসহ নফল ইবাদতেরও বসন্ত এই পবিত্র মাস। সুরা ফাতিহা পবিত্র কুরআনের সারমর্ম ও প্রত্যেক নামাজের পাঠ্য-সুরা। এ সুরার বাক্যগুলোর অর্থ ও ব্যাখ্যা তাই ভালোভাবে জানা ও বোঝা জরুরি। গত পর্বে আমরা এ সুরার কয়েকটি আয়াতের কিছু ব্যাখ্যা তুলে ধরেছি। এ সুরার বিসমিল্লাহ শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর ছাড়া অন্য কারো ওপর ভরসা করা বা অন্য কারো সাহায্যের আশা মনের মধ্যে রাখা ঠিক নয়। প্রতিটি কাজের শুরুতেই বিসমিল্লাহ বলার অন্যতম উদ্দেশ্য এই ব্যাখ্যার মধ্যে ফুটে উঠছে। আল্লাহর পবিত্র নামগুলো উচ্চারণ বা স্মরণের সঙ্গে সঙ্গে শয়তান দূর হয়ে যেতে বাধ্য।
সুরা ফাতিহার ইয়্যাকানা'বুদু তথা 'হে আল্লাহ! আমরা একমাত্র তোমরাই ইবাদত করি'- এ বাক্যাংশ আল্লাহর একনিষ্ঠ ইবাদতকারী হওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে। ইবাদত যেন লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে বা খ্যাতি অর্জনের উদ্দেশ্যে না হয়। অন্য ইবাদতগুলোর তুলনায় রোজার মধ্যে লোক-দেখানোর সুযোগ খুবই কম। নামাজ, হজ, জিহাদ ও জাকাত-এসব ইবাদতে লোক-দেখানোর সুযোগ খুব বেশি। কিন্তু রোজা হচ্ছে এমন কিছু থেকে বিরত থাকা যেগুলো গোপন বিষয়। রোজাদার বিরত থাকে বৈধ পানাহার থেকে ও বৈধ যৌনাচার থেকে যার সবই গোপন ও অপ্রকাশ্য। আর অবৈধ সব কাজ ও চিন্তা থেকেও বিরত থাকতে পারাটা হচ্ছে পরিপূর্ণ রোজা। তাই প্রকৃত রোজার পুরস্কারও অনেক বড়। মহান আল্লাহ বলেছেন, রোজা আমার জন্য রাখা হয় এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব। অবশ্য নামাজ, হজ ও জিহাদ-এসবও আল্লাহরই ইবাদত এবং আল্লাহর জন্যই সম্পন্ন করতে হয়।

১৫ রমজান বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র বড় নাতি হযরত ইমাম হাসান মুজতবা (আ.)'র পবিত্র জন্ম-বার্ষিকী। মুসলিম বিশ্বের যোগ্য ইমাম হিসেবে তাঁকে গড়ে তুলেছিলেন তাঁরই নানা মহানবী (সা.), পিতা আমিরুল মু'মিনিন আলী (আ.) ও মা হযরত ফাতিমা (সালামুল্লাহি আলাইহা)। তাঁর জন্ম হয়েছিল মদীনায় হিজরি তৃতীয় সনে ও মুয়াবিয়ার ষড়যন্ত্রে তিনি শহীদ হন হিজরি ৫০ সনে। তিনি সমাহিত হন মদীনার জান্নাতুল বাকিতে। মহানবী (সা.) প্রিয় এই নাতিকে কোলে নিয়ে আদর করতেন ও তাঁর সঙ্গে খেলতেন। একবার তিনি মুনাজাতে বলছিলেন: হে আল্লাহ! আমি হাসানকে ভালবাসি, তাই আপনিও তাদের ভালবাসুন যারা হাসানকে ভালবাসে। মহানবী (সা) আরো বলেছেন, যারাই হাসান ও হুসাইনকে ভালবাসে আমিও তাদের ভালবাসি, আর আমি যাদের ভালবাসি আল্লাহও তাদের ভালবাসেন, আর আল্লাহ যাদের ভালবাসেন তাদের বেহেশত দান করবেন এবং যারা হাসান ও হুসাইনের সঙ্গে শত্রুতা রাখে তাদেরকে আমিও আমার শত্রু মনে করি, ফলে আল্লাহও তাদের শত্রু হন, আর আল্লাহ তার শত্রুকে জাহান্নামে পাঠাবেন।
মহানবী (সা.) আরো বলেছেন: হাসান ও হুসাইন বেহেশতি যুবকদের সর্দার। এরা দু'জন আমারই সন্তান; আর তারা দু'জনই মুসলমানদের ইমাম বা নেতা,তা তাঁরা তাগুতি শক্তির বিরুদ্ধে বিপ্লব করুক বা নাই করুক কিংবা ক্ষমতায় থাকুক বা না থাকুক।
সমর্থকদের নিষ্ক্রিয়তা ও আদর্শিক বিচ্যুতিসহ নানা দিক থেকে পরিস্থিতি অত্যন্ত প্রতিকূল থাকায় ইমাম হাসান (আ.) মুয়াবিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ-বিরতি চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কারণ, ইমামের প্রধান সেনাপতিসহ অনেকেই ভেতরে ভেতরে মুয়াবিয়ার কাছে বিক্রি হয়। এ সময় তিনি মুয়াবিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ অব্যাহত রাখলে ইসলাম পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত এবং সুযোগ-সন্ধানী রোমানরা বায়তুল মোকাদ্দাস দখল করে নিত। এ ছাড়াও এ চুক্তির ফলে মুয়াবিয়ার প্রকৃত চেহারা জনগণের কাছে তুলে ধরা সহজ হয়েছিল। ইমাম হাসান (আ) কয়েক বার তাঁর সম্পদের অর্ধাংশ ও পুরো অংশ দান করেছেন দরিদ্রদের। তিনি অন্তত ২৫ বার পায়ে হেঁটে হজ করেছেন।
ইমাম হাসান (আ) বলেছেন, নিশ্চয়ই কল্যাণে প্রবেশে সক্ষম চোখ হল পূর্ণ-দৃষ্টির চোখ, সতর্কবাণী শুনে তা থেকে লাভবান-হওয়া কানই হল সবচেয়ে শ্রবণ-সক্ষম কান এবং দ্বিধা-সংশয় থেকে মুক্ত অন্তরই হল নিখুঁত অন্তর।
মহান আল্লাহ আমাদের জন্য কুরআনের এবং মহানবী (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের অনুসারী হওয়ার পথ সহজ করে দিন এই মহাপুরুষদের শানে দরুদ পাঠানোর বরকতে।
অর্থসহ ১৫তম রমজানের:

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আবু সাঈদ/ ১৫
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।