রমজান : রহমতের বসন্ত (পর্ব-১৬)
আশা করছি এ আলোচনা হবে সবারই প্রকৃত সুখ ও সৌভাগ্যের চাবি। হে সর্বশক্তিমান ও সর্বোচ্চ করুণাময়! মহানবী (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি দরুদ পাঠানোর উসিলায় রমজানে যেন আমরা ক্রমেই খোদাপ্রেমের সিঁড়িগুলো ডিঙ্গিয়ে আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য পেতে পারি।
রমজান পবিত্র কুরআন চর্চার বসন্তকাল। তাই গত কয়েক পর্বে আমরা পবিত্র কুরআনের সারমর্ম ও প্রত্যেক নামাজের পাঠ্য-সুরা সুরা ফাতিহার বাক্যগুলোর ব্যাখ্যা ও অর্থ নিয়ে কথা বলছিলাম। আমরা বিসমিল্লাহ বলা তথা আল্লাহর নাম নিয়ে কাজ শুরু করার বরকত সম্পর্কেও জেনেছি। আল্লাহর নাম শোনার সঙ্গে সঙ্গে শয়তান মানুষ থেকে দূরে সরে যায়। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম বা বিসমিল্লাহ ছাড়া পশু-পাখী জবাই করা হলে তা ব্যবহার করা বা খাওয়া মুসলমানের জন্য হারাম হয়ে যায়। আমরা সুরা ফাতিহায় বলি, 'ইয়্যাকানাস্তাইন' তথা হে আল্লাহ! আমরা একমাত্রই তোমারই কাছে সাহায্য চাই। তাই কখনও জীবনের কোনো ক্ষেত্রেই আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে আশ্রয় চাওয়া উচিত নয়। আমরা সুরা ফাতিহায় আল্লাহর নেয়ামতের কথা স্মরণ করছি 'আনআমতা' শব্দটি উচ্চারণ করে। এর শিক্ষা হল সব নেয়ামতেরই মালিক মহান আল্লাহ। সুরা ফাতিহায় আমরা বলি: হে আল্লাহ! আমাদেরকে সত্য ও সরল পথে চলার সুযোগ দিন। এই সরল ও সত্য পথে যাতে অবিচল থাকতে সচেষ্ট হতে হবে এবং সে জন্যও আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে সব সময়।
'হে আল্লাহ! যাদেরকে আপনি নেয়ামত দিয়েছেন তাদের পথে চালান'- সুরা ফাতিহায় এই আর্জি জানিয়ে আমরা সারা বিশ্বের ও সব যুগের সত্যের সেনা তথা সত্যের অনুসারীদের সঙ্গে আমাদের সংহতি ঘোষণা করি। একইসঙ্গে 'আমাদেরকে তাদের পথে চালাবেন না যাদের ওপর আপনার অভিশাপ রয়েছে বা যাদের ওপর আপনি ক্রুদ্ধ এবং যারা পথভ্রষ্ট' –সুরা ফাতিহায় এই প্রার্থনা করে আমরা সব মিথ্যা ও মিথ্যার তথা খোদাদ্রোহী শক্তির প্রতি বিচ্ছিন্নতা ও ঘৃণার কথা ঘোষণা করি।

রমজান অশেষ কল্যাণ ও খোদায়ি রহমতের আধার। মহানবী (সা) বলেছেন, মানুষ যদি জানতো রমজানের বরকত কত বেশি তাহলে তারা গোটা বছর জুড়েই রমজান থাকার আশা করত। রমজান মাসের সবচেয়ে বড় কল্যাণ হল আত্মশুদ্ধি যা রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাধ্যম। অতীতে দেখা যেত রমজানে অপকর্ম, পাপাচার, অসৎ-আচরণ – এসব কমে আসে। কিন্তু আজকাল এই ধারাটি যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। রমজানের প্রাক্কালে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা, মজুতদারি, ভেজাল খাবারের ছড়াছড়ি-এসব যেন দিনকে দিন বাড়ছে। ইফতার মাহফিল হয়ে পড়ছে ইসলাম-বিরোধী শক্তিগুলোরও জনসংযোগ ও প্রচারণার মাধ্যম!
ধনীরা যেন দরিদ্রদের ক্ষুধা ও বঞ্চনার কষ্ট উপলব্ধি করতে পারে এবং গরিবদের সাহায্যের ব্যাপারে কার্পণ্য না করে তা রোজার অন্যতম উদ্দেশ্য। রমজানে দরিদ্রদের ইফতার ও খাবার দেয়ায় রয়েছে ব্যাপক সাওয়াব। সবাই মিলে একই দস্তরখানে ইফতার করা ও খাবার খাওয়ার মধ্যেও রয়েছে ঐক্য ও আন্তরিকতা বাড়াসহ বহু বরকত। যে ব্যক্তি কৃপণ ও এমনকি রমজানেও এ রোগের চিকিৎসা করতে পারেনি তার রোজা রাখাটা মূলত পণ্ডশ্রমই হয়েছে।
মহানবী (সা) বলেছেন, 'রমজানের প্রথম দিক রহমত, মধ্যের দিক মাগফিরাত বা ক্ষমা ও শেষের দিক হল জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তিতে ভরপুর এবং বেহেশতে রাইয়ান নামের একটি দরজা আছে তা দিয়ে কেবল রোজাদাররাই প্রবেশ করতে পারেন।' মহানবী আরও বলেছেন, 'তারা কতইনা ভাগ্যবান যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত হয়। কিয়ামতের দিন বা বিচার দিবসে তারা পরিতৃপ্ত হবে। রোজার কারণে যে তার প্রিয় খাবারগুলো খায় না মহান আল্লাহ তাকে প্রতিদান হিসেবে বেহেশতি খাবার ও নানা পানীয় দিবেন।'
মহানবীর আহলে বাইতের সদস্য ইমাম জাফর সাদিক (আ) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো ওজর বা গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়াই রোজা রাখে না তার ঈমানি চেতনা হারিয়ে যায়। এই মহান ইমাম আরও বলেছেন, তোমরা নামাজ ও ধৈর্য থেকে সাহায্য নাও বলে কুরআনে মহান আল্লাহর যে উপদেশ রয়েছে তাতে ধৈর্য বলতে আসলে রোজাকে বোঝানো হয়েছে। ইমাম সাদিক আরও বলেছেন, যে রোজাদারকে ইফতার দেয় সেও রোজা রাখার সমান সাওয়াব বা পুরস্কার পায়। ইফতারের প্রাক্কালে দোয়া বেশি কবুল হয় বলে ইসলামী বর্ণনা রয়েছে।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে কুরআনের এবং মহানবী (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রকৃত অনুসারী হওয়ার সুযোগ দিন এই মহাপুরুষদের শানে দরুদ পাঠানোর বরকতে।
অর্থসহ ১৬তম রমজানের দোয়া:

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আবু সাঈদ/ ১৬
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।