মে ২৩, ২০১৯ ১৫:৪৪ Asia/Dhaka

আশা করছি এ আলোচনা আমাদের নিয়ে যাবে খোদায়ি কল্যাণ ও রহমতের ফল্গুধারার তীরে । হে সর্বজ্ঞানী ও সর্বোচ্চ করুণাময়! মহানবী (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি দরুদ পাঠানোর উসিলায় রমযান যেন আমাদের জন্য খোদায়ি কল্যাণ ও অশেষ রহমতের সাগর হয়ে ওঠে।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন,সব কিছুরই একটি ভিত্তি রয়েছে,আর ইসলামের ভিত্তি হচ্ছে আমাদের প্রতি তথা আমার পবিত্র বংশধর বা আহলে বাইতের প্রতি ভালবাসা। তিনি আরও বলেছেন, কুরআন ও আমার আহলে বাইত অবিচ্ছিন্ন থাকবে। এর অর্থ কুরআনের অনুসরণ করতে চাইলে মহানবীর আহলে বাইতেরই অনুসরণ করতে হবে।

রমজানের ১৭টি দিন পার হয়ে গেছে। মহান আল্লাহর অশেষ আধ্যাত্মিক এই ভোজ-সভা হতে আমরা কতটা খাবার নিয়েছি? বস্তুগত খাবারের বিপরীতে এখানে বেশি খেলে বদহজমের আশঙ্কা নেই। আধ্যাত্মিক খাবার যত বেশি খাওয়া যায় ততই মহান আল্লাহর নৈকট্য বা সন্তুষ্টি বেশি মাত্রায় অর্জন করবেন। তাই মাহে রমজানের বিচিত্রময় আধ্যাত্মিক ও আসমানি ভোজসভা থেকে সবচেয়ে বেশি মাত্রায় পাথেয় সংগ্রহ করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

কুরআন অধ্যয়ন রমজানে খোদায়ি মহা-ভোজসভার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। রমজানে কুরআনের কেবল এক আয়াত তিলাওয়াতে পুরো কুরআন তিলাওয়াতের সাওয়াব পাওয়া যায়। কিন্তু নিছক তিলাওয়াতই যথেষ্ট নয়, কুরআনের আয়াতের অর্থ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করা বেশি জরুরি। কুরআন এমন অসীম সাগর যার রয়েছে আধ্যাত্মিক মনি-মুক্তা, হিরা-পান্না ও জ্ঞানের কোনো অন্ত নেই। যতই এতে ঘোরা যায় ততই অমূল্য সম্পদের নতুন নতুন জগত খুলে যায়! কুরআন মানুষের আত্মার প্রশান্তির মাধ্যম।  কুরআন অধ্যয়নে বিনম্র হয় মন ও বেড়ে যায় খোদা-প্রেম। কুরআন পড়ার পর চারপাশের নানা বস্তু ও অবস্তুগত বিষয়গুলোর মধ্যে দেখা যায় মহান আল্লাহর অশেষ করুণা আর তুলনাহীন ক্ষমতার নিদর্শন। ফলে জোয়ার জাগে কৃতজ্ঞতা ও বিনম্রতার। কুরআন অধ্যয়ন নফল ও ফরজ নামাজে যোগায় বাড়তি আধ্যাত্মিক তৃপ্তি। তাই ঈমানকে গভীর ও মজবুত করতে পবিত্র কুরআন অধ্যয়ন খুবই জরুরি। আর রমজানই হচ্ছে কুরআন চর্চার বসন্তকাল। 

রমজানে খোদায়ি মহাভোজ-সভার আরেকটি বড় আইটেম হল নানা ধরনের দোয়া পাঠ।  ইমাম জাইনুল আবেদিনের সহিফায়ে সাজ্জাদিয়া দোয়ার এক অনন্য-সুন্দর মহাগ্রন্থ। একে বলা হয় মহানবীর আহলে বাইতের যাবুর। আধ্যাত্মিক জ্ঞানের এমন কিছু বিশেষ দিক বা বিষয় আছে যা কেবল বিশ্বনবীর পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য ও এ পবিত্র ধারার মহান ইমামদের দোয়াতেই পাওয়া যায়। এসব দোয়ায় রয়েছে অনন্য আধ্যাত্মিক জ্ঞান, বিনম্রতা ও প্রেমময় সংলাপ। শবে কদরের রাতে এ দোয়াগুলো পাঠের কথা আমাদের অবশ্যই মনে রাখা উচিত। এসব অপূর্ব দোয়ার মধ্যে সহিফায়ে সাজ্জাদিয়ার দোয়াগুলো ছাড়াও দোয়ায়ে কুমাইল, মুনাজাতে শাবানিয়্যাহ, দোয়ায়ে ইফতিতাহ, ইমাম হুসাইন ও ইমাম সাজ্জাদের দোয়ায়ে আরাফাহ, দোয়ায়ে জওশান কবির ও দোয়ায়ে জওশান সাগির এবং দোয়ায়ে আবু হামজা সুমালি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। কুফার মসজিদে উচ্চারিত হযরত আলীর মুনাজাত, দোয়াহে আহাদ ও দোয়ায়ে নুদবাহ - এসব দোয়াও বছরের যে কোনো সময়ের মত রমজান মাসেও পড়া যেতে পারে।

এ ছাড়াও রমজানে বেশি বেশি পড়া যেতে পারে নবী-রাসুল ও ইমামদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসার আকুতিতে ভরা অনেক জিয়ারত। যেমন, জিয়ারাতে আলে ইয়াসিন, জিয়ারাতে আমিনুল্লাহ, জিয়ারাতে ওয়ারিস ও জিয়ারাতে আশুরা ইত্যাদি। মহানবীর আহলে বাইতের শেখানো অনন্য-সুন্দর দোয়াগুলো পাঠে ক্লান্ত আত্মা হয় আবারও সজীব ও চাঙ্গা। শারীরিক ক্লান্তির চেয়ে মানসিক ক্লান্তি অনেক বেশি বিপজ্জনক। 

রাসূলে খোদা ( সা ) বলেছেন,যারা রমজান মাসে ঈমান ও আক্বীদা সহকারে প্রতিদান পাবার আশায় রোযা রাখবে,আল্লাহ তায়ালা তার অতীতের সব গোনাহ মাফ করে দেবেন এবং যারা শবেক্বদরে ঈমান ও আক্বীদা সহকারে প্রতিদান পাবার আশায় নামায পড়বে,আল্লাহ তায়ালা তাদেরও পেছনের সব পাপ মাফ করে দেবেন।

রাসূল (সা) আরো বলেছেন,শবেক্বদরে যারা রাতভর জেগে ইবাদত করে পরবর্তী বছর পর্যন্ত তাদের শাস্তি মওকুফ হয়তাই মহানবী এই রাতে জাগ্রত থাকার ব্যাপারে উদাসীনতাকে বিশেষ করে একুশতম,তেইশতম,পচিশতম ও সাতাশতম রমযানের রাতে ইবাদাত করার ব্যাপারে অমনোযোগী হতে নিষেধ করেছেন। তাই এই রাতগুলোকে জীবনের শ্রেষ্ঠ রাত মনে করে সব অলসতা থেকে নিজেকে দূরে রেখে ইবাদত-বন্দেগিতে ডুবে যাওয়া উচিতএ কটা রাত খাওয়া-দাওয়া যতোটা সম্ভব পরিমিত করা উচিত যাতে রাত জেগে ইবাদত করা সহজ হয়।

আজ রাতে শুরু হচ্ছে ১৯ রমজান। ৪০ হিজরির ১৮ রমজানের দিন শেষে ১৯ রমজানের ভোর বেলায় ইবনে মোলজেম নামের এক ধর্মান্ধ খারেজি ফজরের নামাজে সিজদারত আমীরুল মু'মিনিন হযরত আলীর (আঃ) মাথায় বিষ-মাখানো তরবারি দিয়ে আঘাত হানায় দুই দিন পর তিনি শাহাদত বরণ করেন। এ ঘটনা ঘটেছিল কুফার গ্র্যান্ড মসজিদে। অনেকেই মনে করেন ১৮ রমজানের দিবাগত রাত তথা ১৯ রমজানের রাত শবে কদর তথা মহিমান্বিত রাত। এ রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। আলী (আ.) সর্বত্র প্রকৃত ইসলাম ও ন্যায়-বিচার কায়েমের তথা সংস্কারের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বলেই সুবিধাবাদী,মুনাফিক এবং স্বল্প-জ্ঞানী ধর্মান্ধ ও বিভ্রান্ত শ্রেণীগুলো তাঁর শত্রুতে পরিণত হয়েছিল। যেমন, তিনি খিলাফত লাভের পর সব সাহাবির জন্য সরকার-প্রদত্ত ভাতা সমান করে দিয়ে রাসূল (সা.) সুন্নাত পুন:প্রবর্তন করেছিলেন। ফলে অনেকেই তাঁর শত্রুতে পরিণত হয়।

কোন এক বছর শাবান মাসের শেষ শুক্রবারে রমজানের ফজিলত সম্পর্কে বলতে গিয়ে বিশ্বনবী (সা.) ভাষণের শেষ পর্যায়ে কাঁদতে থাকেন। তা দেখে হযরত আলী (আ.) এর কারণ জানতে চান। জবাবে মহানবী বহু বছর পর রমজান মাসে আলী (আ.)'র মর্মান্তিক শাহাদতের ভবিষ্যদ্বাণীর কথা উল্লেখ করলেন। তিনি বললেন,"হে আলী! এই মাসে তোমার ওপর যা নেমে আসবে সে জন্য আমি কাঁদছি। আমি নিজেকে কল্পনা করছি তোমার স্থানে যখন তুমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছ এবং সামুদ জাতির কাছে পাঠানো খোদায়ী উটের পা কর্তনকারী লোকটির মতই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তিটি তোমার মাথার ওপর আঘাত হানবে এবং তাতে তোমার দাড়ি রক্তাক্ত হবে।"

নিজের শাহাদতের ভবিষ্যদ্বাণীর কথা শুনে সব কিছুর আগে হযরত আলীর (আ) মনে যে চিন্তাটির উদয় হয়েছিল তা এই বস্তু-জগত সম্পর্কিত ছিল না,বরং তা ছিল নিজের ঈমান সম্পর্কিত। তাই তিনি প্রশ্ন করলেন: " হে আল্লাহর রাসূল! সে সময় আমি কী ঈমানের ওপর অবিচল থাকব? "রাসূল (সা.) বললেন: " হ্যাঁ,সে সময় তোমার ঈমান নিরাপদ থাকবে।" বিশ্বনবী (সা.) আরো বলতে লাগলেন,

"হে আলী! যে তোমাকে হত্যা, বিরক্ত ও অবমাননা করল সে আমাকে হত্যা, বিরক্ত ও অবমাননা করল,কারণ তুমি আমার আত্মা বা প্রাণের সমতুল্য। তোমার ও আমার মানসিকতা ও স্বভাব অভিন্ন। নিঃসন্দেহে প্রশংসিত ও গৌরবান্বিত আল্লাহ প্রথমে আমাকে ও এরপর সৃষ্টি করেছেন তোমাকে,আমার পরই তিনি বেছে নিয়েছেন তোমাকে। আল্লাহ আমাকে নবুওতের জন্য ও তোমাকে মনোনীত করেছেন ইমামতের জন্য। যে তোমার ইমামতকে অস্বীকার করবে সে কার্যত আমার নবুওতকে প্রত্যাখ্যান করল। হে আলী,তুমি আমার উত্তরাধিকারী,আমার সন্তানদের তথা নাতী-নাতনীর পিতা এবং আমার কন্যার স্বামী আর আমার উম্মতের জন্য আমার জীবদ্দশায় ও আমার মৃত্যুর পর আমার প্রতিনিধি বা খলিফা। তোমার নির্দেশ হল আমারই নির্দেশ,তোমার নিষেধাজ্ঞা হল আমারই নিষেধাজ্ঞা। সেই শক্তির শপথ করে বলছি যেই শক্তি আমাকে নবুওত দান করেছেন এবং আমাকে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে তৈরি করেছেন,তুমি হচ্ছ সৃষ্টিকুলের জন্য হুজ্জাতুল্লাহ বা আল্লাহর চূড়ান্ত যুক্তি বা বিজয়ের নিদর্শন এবং তাঁর রহস্যগুলোর আমানতদার বা ট্রাস্টি ও সৃষ্টিকুলের ওপর আল্লাহর খলিফা।"

আলী (আ.) জিহাদ থেকে ফিরে আসলে মহানবী (সা.) তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে যেতেন এবং তাঁর মুখের ঘাম মুছে দিতেন নিজ হাতে। তাঁকে জিহাদ বা সফরের সময় বিদায় দিতে গিয়ে তাঁর বিজয়ের জন্য দোয়া করতেন এবং বলতেন: হে আল্লাহ,আলীর সঙ্গে এটাই যেন আমার শেষ দেখা না হয় কিংবা বলেছেন: হে আল্লাহ,আমার মৃত্যুর আগে আলীকে যেন আরো একবার দেখতে পারি।

বিশ্বনবী (সা) যখন আলী (আ)-কে এতো গভীরভাবে ভালবাসতেন তখন আমাদেরও উচিত মহানবীর (সা) পথ অনুসরণের চেষ্টা করা। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে মহানবী (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের শানে বেশি বেশি দরুদ পাঠানোর বরকতে তাঁদের প্রকৃত অনুসারী হওয়ার তৌফিক দান করুন। 

অর্থসহ ১৮ তম রমজানের দোয়া: 

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আবু সাঈদ/ ১৮

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।