মে ২৮, ২০১৯ ১৩:০২ Asia/Dhaka

আশা করছি এ আলোচনা আমাদের জন্য হবে মুক্তি ও সৌভাগ্যের সোপান। হে সর্বোচ্চ দয়াময়! মহানবী (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি দরুদ পাঠানোর উসিলায় এই রমযান যেন হয় চূড়ান্ত মুক্তি ও সৌভাগ্যের সিঁড়ি।

রমজান দোয়া ও মুনাজাতের বসন্ত। গত পর্বে আমরা দোয়ার গুরুত্ব নিয়ে কিছু কথা বলেছি। দোয়া কবুল হওয়া ও না হওয়ার রয়েছে নানা ব্যাখ্যা। মহান আল্লাহর প্রতি সুধারণা ও দৃঢ়-বিশ্বাস দোয়া কবুলের অন্যতম শর্ত। আস্থাহীন মনে দোয়া করলে তা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা কম। জালিম ও বাবা-মায়ের অবাধ্য সন্তানের দোয়া কবুল হয় না। নবী-রাসুল, নিষ্পাপ ইমাম ও আওলিয়ার উসিলা ধরে দোয়া চাইলে ও তওবা করলে দোয়া ও তওবা শিগগিরই কবুল হয়।    

ইয়াতিম, মজলুম, মুসাফির ও অসুস্থ ব্যক্তির দোয়া বেশি কবুল হয়। তাই এই শ্রেণীর মানুষের সেবাকারীর নেক বাসনাও আল্লাহ সহজেই কবুল করেন। অনেক সময় দৃশ্যত মানুষের দোয়া সরাসরি ও শিগগিরই কবুল না হলেও অনেক পরে কবুল হয়। কারণ তার ওই দোয়া দেরিতে কবুলের মধ্যেই তার জন্য বেশি কল্যাণ রাখেন মহান আল্লাহ। কারো কোনো কোনো দোয়া হয়ত এই দুনিয়ায় একেবারেই কবুল হয় না। কিন্তু এ জন্য অনেক ক্ষেত্রে পরকালে তাকে বহুগুণ প্রতিদান দেয়া হয়। এটাও করা হয় দোয়াকারীর স্বার্থেই।

বলা হয় পরকালে অনেক মানুষই দুনিয়ায় তাদের কবুল-না-হওয়া অনেক দোয়ার কল্পনাতীত প্রতিদান পেয়ে বিস্মিত হবে এবং বলবে: হায় ! দুনিয়ায় আমাদের করা অনেক বা সব দোয়াই যদি কবুল না হত!

আবু বাসির নামের এক ব্যক্তি ছিলেন জন্মান্ধ। তিনি মহানবীর আহলে বাইতের কোনো একজন সদস্য তথা কোনো এক ইমামকে বললেন দোয়া করে তার অন্ধত্ব দূর করতে। অন্ধত্ব দূর হওয়ার পরই ইমাম বললেন, তুমি যদি অন্ধই থাক তাহলে বিনা হিসেবে বেহেশতে যেতে পারবে। তখন আবু বাশির আবারও অন্ধত্ব কামনা করে অন্ধ হয়ে গেলেন। এ থেকে বোঝা যায় কিসে মানুষের বেশি কল্যাণ তা অনেক মানুষই জানে না। হয়তো কোনো রোগ, শোক ও বিপদই তার জন্য বেশি কল্যাণকর। তাই দোয়ায় বলা উচিত: হে আল্লাহ! আমার জন্য যা কল্যাণকর তুমি তা-ই কর এবং বর্তমান অসুস্থতা ও বিপদ যদি আমার জন্য কল্যাণকর হয় তবে তা-ই বজায় রাখা হোক। মহান আল্লাহর প্রেমিক বান্দারা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা বিপদ-আপদগুলোকে ঈমানের পরীক্ষা হিসেবে ধরে নিয়ে সেসবে ধৈর্য ধরেন ও সেসবকে উপভোগ করেন!

নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, কুরআন তিলাওয়াত ও অন্য অনেক ইবাদত মানুষের হয়ে দোয়ার কাজ করে। এসবই কিয়ামতের দিন মানুষের মুক্তির সুপারিশকারী হবে। সৎকর্ম, পরোপকার ও দান-খয়রাত অনেক নেক-বাসনা পূরণে মৌখিক দোয়ার চেয়েও অনেক বেশি কার্যকর হয়। ইসলামী বর্ণনায় এসেছে ইয়াতিম মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করলে বেশ কয়েকটি হজের সাওয়াব পাওয়া যায়। কোনো এক ব্যক্তি ওমরাহ হজ করতে যাচ্ছিলেন। কাফেলা থেকে দূরে দিয়ে এক জায়গায় দেখলেন যে এক মা তার ইয়াতিম সন্তানদের জন্য মৃত এক হাস রান্নার আয়োজন করছে। অর্থের অভাবে বাধ্য হয়েই শিশুদের এই হারাম খাদ্য দিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানায় ওই মা। মর্মাহত ওই ব্যক্তি ওমরাহ হজের সিদ্ধান্ত ত্যাগ করে ওমরাহর জন্য সঙ্গে আনা সব অর্থ দিয়ে দেন ওই মাকে। কাফেলার অন্য হজযাত্রীরা ভাবল তাদের ওই সহযাত্রী পরে আসবেন বা পিছিয়ে পড়েছেন। কিন্তু তারা মক্কায় এসে দেখল যে ওই সহযাত্রী তাদের অনেক আগেই এসে ওমরাহ সম্পন্ন করছেন!  পরে তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, কই আমি তো ওমরাহ করতেই আসিনি! অনেক আগেই তোমাদের কাফেলা ছেড়ে বাড়ীতে ফিরে এসেছিলাম!

আসলে মহান আল্লাহ ইয়াতিম শিশুদের সাহায্যের কারণে ওমরাহ করতে ইচ্ছুক ওই ব্যক্তির ওমরাহ সম্পন্ন করান একজন ফেরেশতার মাধ্যমে যার চেহারা ও আকৃতি হয়ে পড়েছিল ওই ব্যক্তিরই অনুরূপ। ফলে একই কাফেলার ব্যক্তিরা বিস্মিত হয়ে ভাবেন যে পিছিয়ে পড়ার পরও এই ব্যক্তি কিভাবে তাদের আগে মক্কায় উপস্থিতি হয়েছিলেন?!

নবী-রাসুল, ইমাম ও  আল্লাহর ওলিদের দোয়া এবং সাধারণ মানুষের দোয়া আর আশা-আকাঙ্ক্ষার মধ্যে রয়েছে আসমান-জমিন ব্যবধান। সাধারণ মানুষ সাধারণত অন্যের উপকার করে ও অন্যের জন্য দোয়া করে ওই ব্যক্তির প্রশংসা, দোয়া ও সহানুভূতি পাওয়ার আশায়। কিন্তু আল্লাহর ওলিরা এসবই করেন কেবল মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। তারা এসবের বিনিময়ে মানুষের কাছ থেকে একটা শুকনো ধন্যবাদও আশা করেন না। -নবী-রাসুল, ইমাম ও আল্লাহর ওলিদের ওসিলা করে কোনো প্রার্থনা করলে যে তা দ্রুত কবুল হয় তা নিয়ে অনেক ঘটনা ঘটেছে অতীতে। বর্তমান যুগেও দোয়া কবুল হওয়ার এই ধারা ও তাঁদের এ সংক্রান্ত কারামত ঘট্‌ছে।  

সম্প্রতি তেহরানের একটি মসজিদের ইমাম (হুজ্জাতুল ইসলাম আবদুর রহিম) জানিয়েছেন, তিনি হজ কাফেলার গাইড বা প্রধান আলেম হিসেবে একজন বা দু-জন ব্যক্তিকে বিনা-খরচে হজে নিতে পারতেন। প্রতি বছরই কোনো না কোনো পরিচিত ব্যক্তি বা আত্মীয়কে এভাবে তিনি হজে নিতেন। এক বছর তিনি এ ব্যাপারটি অর্পণ করেন মহানবীর (সা) আহলে বাইতের সদস্য নিষ্পাপ ইমাম হযরত ইমাম রেজার (আ) ওপর। তেহরানের ওই আলেম মাশহাদ শহরে এই মহান ইমামের পবিত্র মাজারে এসে গভীর রাতে ইমামকে সম্বোধন করে বলছিলেন, আজ ফজরের নামাজের পর এই মাজার থেকে বের হয়ে প্রথমেই যে মানুষকে দেখব তাকেই হজের জন্য আপনি বেছে নিয়েছেন বলে ধরে নেব হে মহান ইমাম রেজা (আ)! মাজার থেকে বের হতেই তিনি দেখলেন একজন খাদেমকে। তিনি তাকে হজের প্রস্তাব দেন। এ সময় আবেগ-আপ্লুত ওই খাদেম বলছিলেন: কিছুক্ষণ আগেই আমি বলছিলাম, হে ইমাম রেজা! ত্রিশ বছর ধরে এ মাজারে খেদমত করছি! আমাকে কি আপনি হজে পাঠাবেন না!? আর এ কথা বলার পরই দেখা হল আপনার সঙ্গে। ওয়াহাবিরা বলে নবী-রাসুল ও মৃত কারো ওসিলা ধরে কিছু চাওয়া শির্ক! অথচ এটা যে ভুল ধারণা এ ঘটনাই তার প্রমাণ!   

যে কোনো ইবাদতের জন্য ইখলাস বা নিষ্ঠা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিয়তের বিশুদ্ধতা ছাড়া নামাজ, দোয়া ও রোজা গ্রহণযোগ্য হয় না মহান আল্লাহর দরবারে। ইসলামের প্রাণই হল নিষ্ঠা বা আন্তরিকতা। নিষ্ঠাবান খোদাপ্রেমিক এতটাই উন্নত পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে,আল্লাহর আদেশ-নির্দেশ ছাড়া অন্য কারো বা অন্য কিছুর কর্তৃত্ব তাঁর ওপর নেই;তাঁর ভেতরে ও বাইরে কারো আদেশই পালিত হয় না। তাঁর ওপর নেই তাঁরই নফসের কর্তৃত্ব বা অন্য কোন মানুষের আদেশের কর্তৃত্ব; নফসের চাহিদা পূরণে সে নিজেকে ততটাই অনুমতি দেয় যতটুকু আল্লাহ অনুমতি দিয়েছেন। তবে আল্লাহ সে সীমা পর্যন্তই অনুমতি দিয়ে থাকেন যা তাঁকে উন্নতি ও পূর্ণতায় পৌঁছতে সহায়তা করে। এ কারণেই সে অন্য মানুষের আদেশ- যেমন,মা, বাবা,শিক্ষক ও অন্যান্যদের আদেশ- আল্লাহর অনুমতি-সাপেক্ষেই পালন করে থাকে। কেউ কেউ আবার এর চেয়েও উন্নত পর্যায়ে পৌঁছে যায় এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো মহব্বত তাঁর অন্তরে থাকে না;আল্লাহই তাঁর একমাত্র প্রেমাস্পদে পরিণত হয়। “যে কাউকে ভালবাসে তার সৃষ্টি ও নিদর্শনকেও সে ভালবাসে” এই নীতির ভিত্তিতে আল্লাহর প্রেমিক ব্যক্তি আল্লাহর সৃষ্টিকেও ভালবাসে। কারণ এসব আল্লাহরই সৃষ্টি এবং তাঁরই নিদর্শন যা আল্লাহকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। আবার কেউ কেউ এর চেয়েও ওপরে পদার্পণ করে,যার ফলে আল্লাহর নূর ও নিদর্শন ছাড়া অন্য কিছুই সে দেখতে পায় না। অর্থাৎ সব কিছুতেই সে আল্লাহকে দেখতে পায়;সবকিছুই তার জন্য আয়নার মত হয়ে যায়,সমগ্র বিশ্ব আয়নায় পরিণত হয়ে যায়, ফলে  সে যেদিকেই তাকায় সেদিকেই আল্লাহর মহিমা দেখতে পায়। হযরত আলী (আঃ) বলেন,এমন কোন কিছুই দেখিনি যার আগে ও যার সাথে আল্লাহকে দেখিনি। একজন ইবাদতকারী ব্যক্তি তার ইবাদতের সময় আল্লাহর সাথে যা বলে থাকে,তার জীবনে তার বাস্তবায়ন করে থাকে এবং তার সত্যতা প্রমাণ করে।

ইসলামের দৃষ্টিতে সব কাজ যেমন আল্লাহর জন্য করতে হয় ঠিক সেভাবে সৃষ্টির যেকোন খেদমতও আল্লাহর জন্যই করতে হবে। ইসলামের দৃষ্টিতে কেবল নিজের জন্য কাজ করলে তা হবে আত্ম-পূজা,কেবল সৃষ্টির জন্য কাজ করলে তা হবে মূর্তিপূজা,যদি কোন কাজ আল্লাহ ও সৃষ্টি উভয়ের সন্তুষ্টির জন্য করা হয় তবে তা হবে শিরক বা দ্বিত্ববাদ,আর যদি নিজের কাজ ও সৃষ্টির খেদমতকে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করা হয় তা হবে আল্লাহর ইবাদত। শুধু আল্লাহর নামে কাজ করলে তাকেই একত্ববাদ বলা হয়।

কুরআনে নিষ্ঠা বা ইখলাস সম্পর্কিত দুটি শব্দ রয়েছে: মুখলিস ও মুখলাস। মুখলিস হলেন তিনি যিনি তার কাজগুলো করেন পাক-পবিত্রতার সাথে শুধু আল্লাহর জন্য। অন্যদিকে মুখলাস তার সমগ্র অস্তিত্বকে পাক-পবিত্র করেন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। এটা স্পষ্ট কাজকে পাক পবিত্র করার চেয়ে নিজের সমগ্র অস্তিত্বকে পাক পবিত্র করা অনেক উন্নত পর্যায়।  আজ শুরু হচ্ছে ২৩ রমজান। আসুন আমরা সম্ভাব্য ক্বদরের এই  রাতে মুখলাস হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করি। হে আল্লাহ! আমরা যেন বেহেশেতের লোভে বা দোযখের ভয়ে তোমার ইবাদত না করি। কিংবা মনের মধ্যে লালিত দুনিয়ার কোনো স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে তোমার দিকে দোয়ার হাত না বাড়াই। কেবল তুমি ইবাদতের যোগ্য বলেই যেন তোমার ইবাদত করি ও কেবল তোমাকে চাওয়াই যেন হয় আমাদের মূল দোয়া বা একান্ত কামনা। মহান আল্লাহ আমাদের এই প্রেমময় দোয়া কবুল করুন মহানবী (সা) ও তাঁর আহলে বাইতের প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ ও তওবার উসিলায়।

অর্থসহ ২২ তম রোজার দোয়া:- 

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আবু সাঈদ/২২

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।