রমজান : রহমতের বসন্ত (পর্ব-২৩)
আশা করছি এ আলোচনা আমাদের হৃদয়কে করবে প্রশান্ত এবং মুক্ত ও উর্ধ্বগামী। হে সর্বোচ্চ দয়াময়! মহানবী (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি দরুদ পাঠানোর উসিলায় এই রমযান যেন আমাদের আত্মাকে করে নিস্কলুষ ও খোদামুখী।
পবিত্র রমজান দোয়া ও আল্লাহর স্মরণের বসন্ত। রোজাসহ সব ইবাদতে নিষ্ঠার গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা কিছু কথা বলেছি গত পর্বে। এ পর্বে আমরা নিষ্ঠার কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরব। অতীতে যুগে কোনো এক ব্যবসায়ী এক বালক দাস কিনে নিয়ে আসেন। ব্যবসায়ী ওই বালককে প্রশ্ন করেন তোমার নাম কি এবং আমি তোমাকে কোন্ নামে ডাকতে পারি? বালক দাসটি বলল, আমার নাম কি ছিল তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, আপনি আমার জন্য যে নাম পছন্দ করবেন আমি তাতেই সাড়া দেব ও সন্তুষ্ট থাকব! এরপর ব্যবসায়ী মালিক বললেন, তোমাকে কোথায় থাকতে দেব ও কি পোশাক আর কি খাবার দেব? দাসটি বলল, আপনি যেখানেই রাখবেন আমি সেখানেই থাকব ও যে পোশাক দেন তা-ই পরব, নতুন পোশাক না দিলেও চলবে, আপনি যে খাবারই দিবেন তা-ই খাব! মালিক এরপর বললেন, আচ্ছা, তোমাকে বেতন কত দিতে হবে? সে বলল, মোটেই ভাববেন না, আপনি কিছু দিলে আমি নেব না দিলেও আপত্তি নেই। বালকের এসব কথা শুনে মালিক কি যেন ভেবে কাঁদতে লাগলেন! বালক দাসটি বলল: হে মালিক আমি কি আপনার মনে কোনো কষ্ট দিয়েছি?
মালিক বললেন, না, বরং আমি কাঁদছি এ কারণে যে, আল্লাহর একজন দাস হিসেবে আমারও তো উচিত ছিল চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপারে তোমার মতই হওয়া! কিন্তু এতকাল ধরে আমি আল্লাহর সামনে অবাধ্য ও উদ্ধত দাসের মতই আচরণ করেছি! আল্লাহর একনিষ্ঠ দাস হওয়ার ব্যাপারে এই বালক দাসের দৃষ্টান্ত আমাদের সবারই মনে রাখা উচিত।
এবারে একটি প্রশ্ন। ঈমানবিহীন লোক বা অমুসলমানদের সৎকর্মের প্রতিদান কেমন হবে? তারা কি পরকালে কোনো প্রতিদান পাবে? কাফের-মুশরিকদের সৎকাজগুলোর কোন পরকালীন প্রতিদান আল্লাহ দিবেন না। কারণ তারা তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে চায় না,তারা তো তাদের প্রকৃত প্রভুকেই চিনতে পারেনি, তারা শুধু বাহ্যিকভাবে দুনিয়াবি বা বস্তুগত সুবিধা চায়। তাই আল্লাহ তাদের ভালো কাজের প্রতিদান দুনিয়াতেই সীমাবদ্ধ করে দিয়েছেন।

আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদের স্ত্রী যুবাইদা মক্কা শরিফের মরু-প্রান্তরে খাল খনন করে পানির প্রবাহ সৃষ্টি করেছিলেন। বাহ্যিকভাবে এ কাজ খুবই প্রশংসনীয়! কিন্তু ন্যায়বিচারের আলোকে এ কাজের জন্য কোন সাওয়াব রানী যুবাইদা হয়ত পাবে না। কারণ যুবাইদা জনগণের তথা বায়াতুলমালের টাকা খরচ করে সে খাল খনন করেছিল। সে জনগণের অর্থ জনগণের কল্যাণেই ব্যয় করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হল সে কি চেয়েছিল যে তার এ কাজের ফলে ইতিহাসে তার নাম লেখা হবে এবং সবাই তার প্রশংসা করবে? নাকি সত্যিকারভাবে সে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যেই ঐ কাজ করেছিল? আল্লাহই তার মনের খবর ভাল জানেন।
বলা হয় কোন এক ব্যক্তি যুবাইদাকে স্বপ্নে দেখেছিল। প্রশ্ন করল হে যুবাইদা, তোমার বানানো খাল কি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করেছিল? যুবাইদা জবাব দিল, “সে কাজের সমস্ত সাওয়াব তাদের মাঝে ভাগ করে দেয়া হয়েছে যারা ছিল সেই খাল খননে ব্যয় করা টাকার মালিক ।”
একদল লোক মসজিদ নির্মাণ করছিল। তারা বলছিল, কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টিই তাদের এ কাজের লক্ষ্য। বহলুল নির্মাতাদের আন্তরিকতা যাচাই করতে অতি গোপনে মসজিদের সদর দরজায় একটা টাইলস বসায় যাতে লেখা হল “বহলুলের মসজিদ”। মসজিদ নির্মাতারা পরে তা দেখে তো রেগে আগুন! বহলুল বলল,তোমরা বলেছিলে, মসজিদটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নির্মাণ করছ? যদিও মানুষ পরবর্তীতে ভুলে যেতে পারে যে মসজিদটি কে নির্মাণ করেছে। কিন্তু আল্লাহ তো ভুলে যাবেন না! তাই এতে অন্যের নাম থাকলেও তোমাদের উদ্দেশ্য তো ঠিকই হাসিল হচ্ছে!
ইখলাস বা নিষ্ঠার অভাবে এরূপ অনেক মসজিদ,মাদ্রাসা,হাসপাতাল ও আরো অনেক প্রতিষ্ঠানের নির্মাতারা আল্লাহর কাছে কোন প্রতিদানই পাবে না। আমাদের নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, জিহাদ ও হিজরতসহ সব কাজই হতে হবে পরিপূর্ণভাবে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিবেদিত। আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়াও যদি এসব কাজের উদ্দেশ্যে বা নিয়তে অন্য কোনো স্বার্থের ছোঁয়া থাকে তবে তা হবে এক ধরনের শির্কের মিশ্রণ।
হে আল্লাহ! মহানবী (সা) ও তাঁর আহলে বাইতের প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ ও তওবার উসিলায় আমরা যেন কুরআনের এই আয়াতের অনুসারী হতে পারি যেখানে আপনি বলেছেন: হে রাসুল! আপনি বলুনঃ আমার নামায,আমার কুরবানি এবং আমার জীবন ও মরন বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহরই জন্যে।
অর্থসহ ২৩ তম রোজার দোয়া:

পার্সটুডে/আমির হুসাইন/আবু সাঈদ/২৩
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।