সারপোলে জাহাব শহরের ঐতিহাসিক নিদর্শন
বিশাল একটি দেশ ইরান। এ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য,পুরাতত্ত্ব আর সংস্কৃতির বিচিত্র সমৃদ্ধ উপাদান।
গত আসরে আমরা গিয়েছিলাম ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দর প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ শহর কেরমানশাহে। কেরমানশাহ প্রদেশের দুটি ঐতিহাসিক স্থাপনার সঙ্গেও আমরা খানিকটা পরিচিত হয়েছিলাম। একটি 'জিয মানিযেহ'নামক একটি প্রাচীন দূর্গ। হাজার বছর আগের এই দূর্গটি পাথর দিয়ে বানানো হয়েছে। এটি একটি শাহী দূর্গ। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও মন কেড়ে নেয়া সুন্দর। এখানে গেলে কেরমানশান প্রদেশ বেড়াতে যাওয়াটা সার্থক বলে মনে হবে যে-কোনো পর্যটকের কাছে।
আরেকটি হলো সারপোলে জাহাব শহর। কেরমানশাহ প্রদেশ সফরে গিয়ে কেউ যদি সারপোলে জাহাব শহরে বেড়াতে না যায় সেটা হবে খুবই দু:খজনক। কেননা এই শহর এবং শহরের আশেপাশে যেসব সুন্দর সুন্দর এবং দর্শনীয় নিদর্শন রয়েছে সেগুলো না দেখাটা ঠিক হবে না। সারপোলে জাহাব শহরটি গড়ে উঠেছে প্রাচীন হালাভন শহরের ধ্বংসাবশেষের কাছে। এরই পাশে রয়েছে সাসানীয় শাসনামলের ধ্বংসপ্রাপ্ত দূর্গটি। সারপোলে জাহাব ছিল সীমান্ত ঘাঁটি এবং কেল্লা। এখানেই রয়েছে বিখ্যাত দালাহু পর্বতগুলো এবং রিজাব নামক সুন্দর এলাকা।
সারপোল শহরের আশেপাশে যেসব ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে সেসবের মধ্যে প্রথমেই বলতে হবে বিখ্যাত ‘অনুবনিনি’ শিল্পকর্মের কথা।এটি পাথরে খোদাই করা একটি ঐতিহাসিক শিল্পকর্ম। লুলুবিয়ানদের বাদশাহ ছিলেন অনুবনিনি। তাঁর আমলের শিল্পকর্ম এটি। খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে একটি উপজাতী ছিল লুলুবিয়া নামে। সেই সময়কার এই উপজাতীদের বাদশা ছিলেন অনুবনিনি। এই উপজাতিটি জাগরোস পর্বতমালার পাদদেশে বসবাস করতো এবং আর্যদের আগে মানে ফার্স এবং মাদদের আগে অর্থাৎ চার হাজার আট শ বছর আগে এই এলাকায় বসবাস করতো তারা। পাথরে খোদাই করা অনুবনিনির একটি ছবি ‘মিয়নকোল’ নামক পাথুরে পাহাড়ের গায়ে এখনও লক্ষ্য করা যাবে।
দারিয়ুশের সঙ্গে অনুবনিনির অনেক মিল থাকার কারণে অনেকেই মনে করেন বিস্তুন শিলালিপিটি অনুবনিনির শিল্পকর্মের প্রভাব বা প্রেরণাতেই বিস্তুন পাহাড়ের বুকে খোদাই করা হয়ে থাকতে পারে। আমরা সারপোল জাহব শহরের ভেতরে ফিরে গেলে দেখবো সেখানে রয়েছে একটি মাজার। আহমাদ বিন ইসহাকের মাজার। ইমাম হাসান আসকারি (আ) এর বিখ্যাত মুহাদ্দিসদের অন্যতম ছিলেন তিনি। ২৫০ হিজরি সনে সারপোল জাহব শহরে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান তিনি। মৃত্যুর পর তাঁর কবরস্থানটি জিয়ারতগাহে মানে মাজারে পরিণত হয়েছে। মাজার স্থাপনাটি চারটি বাহু বিশিষ্ট স্থাপত্যশৈলীর মতো। স্থাপনার উপরে রয়েছে গোলাকার একটি সুদর্শন গম্বুজ।
আজ আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি কেরমানশাহ প্রদেশের ঐতিহাসিক শহর সারপোল জাহব এবং তার আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায়। এরইমধ্যে আমরা বেশ কিছু স্থাপনার সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। অনুবনিনি’র ঐতিহাসিক দেয়ালচিত্রের কথা বলেছি আমরা। যাদের সুযোগ আছে অবশ্যই ঐতিহাসিক এই নিদর্শন দেখতে ভুলবেন না আশা করি। দেয়ালচিত্রের পর আমরা দেখেছি আহমাদ বিন ইসহাকের মাজার। এই মাজারের স্থাপত্যশৈলী নিয়েও আমরা খানিকটা কথা বলেছি। আপনারা জানেন যে ইরানে ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের পর ইরাকের সাদ্দাম সরকার আধিপত্যবাদীদের প্ররোচনায় ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল। ওই যুদ্ধ আট বছর ধরে চলে। সে সময় এই সারপোল জাহব শহরটি বেশ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছিল।
তবে গর্ব করার মতো বিষয় হলো এই শহরের বীরত্বপূর্ণ মানুষেরা চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ কোনোভাবেই মেনে নেয় নি এবং শত্রুর সামনে মাথানত করে নি। আগ্রাসী বাহিনীর পাশবিক আগ্রাসনের মুখেও তারা ব্যাপক সাহসিকতা ও বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে। সেই যুদ্ধের, সেই বীরত্বের বহু গাথা, বহু নিদর্শন, ধ্বংসাবশেষ এখনও সারপোল জাহব শহর এবং তার আশেপাশে দেখতে পাওয়া যাবে। এইসব নিদর্শন যে কেবল ক্ষয়ক্ষতির কথাই মনে করিয়ে দেয় তা নয়, বরং এগুলো সারপোল জাহবের জনগণের সাহসিকতা ও বীরত্বের কথাও বলে যায় নির্দ্বিধায়। হাতে হাত মিলিয়ে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, পায়ে পা মিলিয়ে সদর্পে স্বদেশিরা নিজেদের দেশমাতৃকার সীমান্ত প্রহরী হিসেবে আন্তরিকতা দিয়ে রক্ষা করেছে। তাদের সেই বীরত্বের কথা এখনও এলাকাবাসীদের মুখে মুখে ঘুরছে। ধ্বংসলীলা ছাড়িয়ে বীরত্বের মহিমাই সেখানে জ্বলজ্বলে ঐশ্বর্যে মহীয়ান হয়ে উঠেছে।
কীরকম বীরত্ব দেখিয়েছে তারা? বলাই বাহুল্য।ইরাকি আগ্রাসী সেনাদেরকে তারা কোনোভাবেই সারপোল জাহব শহরে ঢুকতে দেয় নি। শত্রুর পদভারে অপবিত্র হতে দেয় নি মাতৃভূমির মাটিকে। সারপোল জাহব শহরটি বেশ উষ্ণ। তবে এই এলাকায় মানে শহরে কিংবা শহরের আশেপাশে রয়েছে প্রচুর খেজুর বাগান। ওই খেজুর বাগান ছুঁয়ে আসে চমৎকার বাতাস। সেই বাতাসের স্পর্শে শহরের উষ্ণতা তেমন একটা অনুভূত হয় না। সীমান্ত প্রহরীরা ওই বাগানগুলোকে মমতা দিয়ে,যত্ন দিয়ে সরক্ষা দেয়। দেশের প্রতি ভালোবাসা আর মমত্ববোধ দৃঢ় থাকলে মাতৃভূমির প্রতি ইঞ্চি মাটির মতো প্রকৃতির প্রতিটি উপকরণও একান্ত আপন মনে হবে-সেটাই স্বাভাবিক।#
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ২৪
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।