ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০২০ ১৮:৫২ Asia/Dhaka

আশা করছি আপনারা প্রত্যেকে ভালো আছেন। গত আসরে আমরা আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীর হাত থেকে খোররামশাহর রক্ষায় একজন ইরানি নারীর অবদান নিয়ে আলোচনা করেছি। আজ আমরা ইরাকি বাহিনীর আগ্রাসনের মোকাবিলায় ইরানের যুদ্ধ প্রস্তুতি এবং ইরানি জওয়ানদের প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পর্কে ইরাকের তৎকালীন সাদ্দাম সরকারের ভুল হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে আলোচনা করব।

ইরানে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে নবগঠিত একটি সরকার যখন বিপর্যস্ত দেশ গঠনের কাজে সবেমাত্র হাত দিয়েছে তখন তেহরানকে অপ্রস্তুত করে দিয়ে আগ্রাসন চালায় ইরাকের তৎকালীন সাদ্দাম বাহিনী। বাগদাদ ভেবেছিল অল্প কয়েকদিনের মধ্যে গোটা ইরান দখল করে নেয়া যাবে। কিন্তু যুদ্ধের প্রথম কয়েকদিনে খোররামশাহর রক্ষার যুদ্ধে ইরানের বিমান ও নৌবাহিনী যে বিস্ময়কর রণকৌশল প্রদর্শন করে তা দেখে ইরাকি বাহিনী বিশেষ করে খোদ প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হতচকিত হয়ে যায়। আগ্রাসনের কয়েকদিনের মাথায় ইরানের নৌবাহিনী ইরাকের আলামিয়াহ এবং আল-বকর নামের দু’টি তেল প্ল্যাটফর্ম ধ্বংস করে দেয়।

এর ফলে পারস্য উপসাগর দিয়ে ইরাকের তেল রপ্তানিতে মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হয় এবং ১৯৮৮ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত ওই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি ইরাক। এ ছাড়া, ইরাকি বাহিনী আগ্রাসন চালানোর পরপরই ইরানের বিমানবাহিনী একসঙ্গে ১৪০টি জঙ্গিবিমান নিয়ে এক অভিযান চালিয়ে ইরাকের কৌশলগত ও স্পর্শকাতর কিছু স্থাপনায় হামলা চালায়। ওই হামলার ফলে ইরাকি বাহিনীর গোটা যুদ্ধ পরিকল্পনা ওলটপালট হয়ে যায়।

ওই বিমান হামলায় ইরানের বিমান বাহিনীর ক্ষমতা সম্পর্কে সাদ্দাম সরকার এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে তার দোসরদের ধারণা সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। ইরানি পাইলটরা সেদিন প্রমাণ করেন, তারা আমেরিকার প্রশিক্ষক ছাড়াই সর্বাধুনিক জঙ্গিবিমান নিয়ে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম। ইরানের নৌ ও বিমান বাহিনীর এ সাফল্য এবং সীমান্ত এলাকাগুলোতে সামরিক ও বেসামরিক মানুষ তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার ফলে সাদ্দাম বাহিনী এ কথা উপলব্ধি করে যে, ইরানের সামরিক শক্তি সম্পর্কে তাদের সব হিসাব নিকাশ ভুল ছিল।

ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান ১৯৮০ সালের ২৭ আগস্ট এ সম্পর্কে লিখেছে, “ইরাকি সশস্ত্র বাহিনীর জন্য গত সপ্তাহটি খুব ভালো যায়নি। তারা যেমন বড় ধরনের কোনো বিজয় অর্জন করতে পারেনি তেমনি ছোটখাট কোনো যুদ্ধে জয়লাভ করাও তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।”  জার্মান ডয়েচে ভেলে রেডিও এ সম্পর্কে এক সংবাদভাষ্যে বলেছে, “ইরানের (ইমাম) খোমেনী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে চলমান যুদ্ধে ইরাক এখন পর্যন্ত কোনো সাফল্য পায়নি। বাগদাদের ধারনার বিপরীতে এ যুদ্ধ ইরানের অবস্থানকে যথেষ্ট শক্তিশালী করেছে।”

টাইম ম্যাগাজিন ১৯৮০ সালের ১ অক্টোবর লিখেছে: “ইরানের আপামর জনসাধারণ যে সেদেশের নব্য প্রতিষ্ঠিত ইসলামি সরকারের পাশে দাঁড়িয়ে যাবে সেকথা সাদ্দাম সরকার ঘুনাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেনি।” ইরাকের একজন সেনা কমান্ডারও পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সে সময় বলেছিলেন, “আমাদের উচিত ছিল ইরানে হামলা করার আগে তাদের শক্তি সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করা। কিন্তু আমরা যে ধারনা নিয়ে হামলা করেছিলাম এবং আমাদের কাছে ইরানের শক্তি সম্পর্কে যে গোয়েন্দা তথ্য ছিল তা ভুল প্রমাণিত হয়।”

ইরানি জনগণের প্রবল প্রতিরোধ, ইরানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতার কারণে এদেশে আগ্রাসন চালানোর প্রথম কয়েকদিনের মধ্যেই খেই হারিয়ে ফেলে আগ্রাসী ইরাকি বাহিনী। দেশটির সেনা ইউনিটগুলো ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজিস্তান প্রদেশের বিস্তীর্ন প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়লেও উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। ইরাকি সেনাবাহিনীর থার্ড ডিভিশন খুজিস্তান প্রদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত ‘বাহমান শির’ নদী অতিক্রম করার বহু চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। এ ছাড়া, যে পরিমাণ সেনা নিয়ে হামলা করা উচিত ছিল তা না নিয়েই আগ্রাসন শুরু করেছিল সাদ্দাম বাহিনী। ফলে ইরানি যোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে তারা নিজেদের সংখ্যার অপ্রতুল অবস্থা উপলব্ধি করে।

ফলে সামনে অগ্রসর হওয়া তো দূরের কথা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখাই কষ্টকর হয়ে পড়ে ইরাকি সেনাদের। এ কারণে ইরানে আগ্রাসন চালানোর এক সপ্তাহের মাথায় ইরাকের তৎকালীন স্বৈরশাসক সাদ্দাম আর সামনে অগ্রসর না হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু আগ্রাসন চালাতে গিয়ে পরাজয়ের কথা ঘোষণা করা থেকে তিনি বিরত থাকেন।  মুখরক্ষার জন্য তিনি ১৯৮০ সালের ২৮ আগস্ট ঘোষণা করেন, “আমরা ইরানের যতটুকু ভূমি দখলে নিতে চেয়েছিলাম তা নেয়া হয়ে গেছে। এখন আর যুদ্ধ নয় আমরা তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চাই।” এ কথা বলে সাদ্দাম সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন।

এদিকে, এই এক সপ্তাহের আগ্রাসনে যখন বেশিরভাগ ফ্রন্টে ইরাকি বাহিনী ধীরে হলেও সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল তখন এ যুদ্ধ সম্পর্কে পর্যবেক্ষক ও সমরবিদদের বিশ্লেষণ ছিল অন্যরকম। তারা বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর আগ্রাসনে ইরাকের রণকৌশল ব্যর্থ হয়েছে।  সাদ্দামের পক্ষ থেকে একরতফাভাবে যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয় তাও এই বাস্তবতার সত্যতা বহন করে।  একজন ইরাকি সেনা কমান্ডার এ সম্পর্কে বলেন, সাদ্দাম ১৯৮০ সালের ২৮ আগস্ট যখন যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন তখন তিনি প্রকারান্তরে একথা মেনে নেন যে, ইরানে আগ্রাসন চালিয়ে তিনি যে লক্ষ্য অর্জন করতে চেয়েছিলেন তা অর্জন করা ইরাকি সেনাবাহিনীর পক্ষে সম্ভব নয়।

ইরাকি স্বৈরশাসকের পক্ষ থেকে একতরফা যুদ্ধবিরতির ঘোষণা সম্পর্কে ইকোনোমিক টাইমস ১৯৮০ সালের ১৮ অক্টোবর এক বিশ্লেষণ প্রকাশ করে। তাতে লেখা হয়, ট্যাকটিক্যাল এবং কৌশলগত উভয় দিক থেকে ইরাক-ইরান যুদ্ধ একটি অচলাবস্থার সম্মুখীন হয়েছে। এ কারণে ইরাক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে যেকোনো উপায়ে এ সংঘাতের অবসান ঘটানোর চেষ্টা করছে। জার্মানি থেকে প্রকাশিত ম্যাগাজিন এসপাইগেল এ সম্পর্কে লিখেছে, সাদ্দাম যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে প্রকারান্তরে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরাজয় মেনে নিয়েছেন। সেইসঙ্গে এই ঘোষণার মাধ্যমে তিনি একথা বুঝিয়েছেন যে, ইরানি যোদ্ধাদের মোকাবিলা করার লক্ষ্যে সেনা সংগঠনের জন্য তার আরো বেশি সময় প্রয়োজন।

ম্যাগাজিনটি আরো লিখেছে, সাদ্দামের আকাঙ্ক্ষা ছিল ইরানে আগ্রাসনের কয়েকদিনের মধ্যে তেহরান সরকারের পতন হবে। তার আরো আশা ছিল, ইরানে হামলা হলে খুজিস্তান প্রদেশের জনগণের মধ্যে আরব জাতীয়তাবাদ জেগে উঠবে এবং তারা ইরান সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে। ফলে ইরাকের পক্ষে খুব সহজেই ইরান দখল করা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে তার কোনোটিই হয়নি। ইরাকি সেনারা সীমান্ত এলাকায় মাসের পর মাস ধরে উদ্দেশ্যহীনভাবে গোলাবর্ষণ করে যাচ্ছে। এর ফলে অপ্রস্তুত ইরান প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগ পেয়েছে। ইরানের নবগঠিত ইসলামি সরকার দেশের পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এনে যুদ্ধ করার প্রয়োজনীয় শক্তি পুরোপুরি অর্জন করেছে বলে ম্যাগাজিনটি জানায়।#

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ৪

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।