মার্চ ০১, ২০২০ ১৭:১৬ Asia/Dhaka

গত আসরে আমরা গিয়েছিলাম খুজিস্তানের একটি ঐতিহাসিক শহরের দিকে। শহরটির নাম শুশ। হাখামানেশিদের বিশাল সাম্রাজ্যের শীতকালীন রাজধানী হিসেবেও সমৃদ্ধ ছিল শুশ শহর।

শুশের দুটি প্রাচীন নিদর্শন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। একটি হলো চোগাজাম্বিল প্রার্থনালয় এবং অপরটি প্রাচীন শুশ অঙ্গন। এগুলোর বাইরেও রয়েছে অসংখ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং প্রাচীন সভ্যতার কয়েকটি সমৃদ্ধ নিদর্শন। সপ্তটিলা এবং অক্রোপুল টিলা বেশ নামকরা।

লুভার প্যারিস মিউজিয়ামের ভেতর এই অক্রোপুল টিলার মূল্যবান বহু নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। শুশ দূর্গ এবং আপাদানা প্রাসাদটির কথাও আমরা বলেছিলাম। আজকের আসরে আমরা শুশের শৈল্পিক এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাপক সম্মান, মর্যাদা ও ঐশ্বর্যের প্রতীক আরও কিছু নিদর্শন নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো।শুশের ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন নিয়ে কথা বলা ছোট্ট একটি আসরে সম্ভব নয়। আহওয়াজ শহর থেকে শুশের দিকে যেতে মূল সড়কের বাইরেও একটি বিকল্প পথও আছে।ওই পথ ধরে শুশের দিকে এগিয়ে গেলে সাক্ষাৎ মেলবে জিগুরাতের ধ্বংসাবশেষের অপর একটি বিস্ময়কর নিদর্শন চোগাজাম্বিল। এই চোগাজাম্বিল এখনও অনেকটাই তার প্রাচীন ঐশ্বর্য ধরে রাখতে পেরেছে। চোগাজাম্বিল স্থাপনাটি নিয়েই বরং আমাদের আজকের আলোচনা শুরু করা যাক।

ঐতিহাসিক চোগাজাম্বিল স্থাপনা নিয়ে কথা বলছিলাম আমরা। এটি প্রাচীন আমলের খ্যাতিময় জিগুরাত বা প্রার্থনালয়গুলোর একটি।মেসোপটিমিয়ান সভ্যতার বিখ্যাত জিগুরাতগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে মোটামুটি একইরকম স্থাপনা এগুলো। অবশ্য অবস্থানও ছিল পাশাপাশি। সুতরাং মিল থাকাটাই স্বাভাবিক।

চোগাজাম্বিলও তেমনি একটি প্রার্থনালয় টাওয়ার।পাঁচতলা বিশিষ্ট এই ইমারতটি পিরামিডের আকৃতিতে নির্মাণ করা হয়েছে।ধর্মীয় ও রাজনৈতিক এই স্থাপনাটির গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান বহু নিদর্শন আন্তর্জাতিক মিউজিয়ামগুলোতে দেখতে পাওয়া যাবে। জেনে রাখা ভালো যে চোগাজাম্বিল উপাসনালয়টি ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে ইউনেস্কার ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ লিস্ট বা বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। চোগাজাম্বিল নিয়ে বিস্তারিত বলার আর অবকাশ নেই। এবার আমরা যাবো নদীর দিকে।

নদীর নাম কারখেহ রুদ। ফার্সিতে রুদ মানে নদী। ইরানের বৃহৎ নদীগুলোর মধ্যে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে কারখেহ নদী। সবচেয়ে বড় নদী হলো কারুন নদী। তারপরে রয়েছে দেজ নদী। তারপরই কারখেহ।এই নদীটি মূলত উত্তর দিক থেকে দক্ষিণের দিকে পর্যটকের মতো বয়ে গেছে।এই পর্যটক শুশের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো দেখতে দেখতে একটু বাঁক নিয়ে চলে গেছে পশ্চিমের দিকে। যেতে যেতে গিয়ে হাজির হয়েছে ইরানের সীমানা পেরিয়ে প্রতিবেশি দেশ ইরাকের ভেতর। শুশের প্রাচীন টিলাগুলো অতিক্রমকালে পারিপার্শ্বিক যে রকম সৌন্দর্য আপনার নজরে পড়বে তাতে বিস্মিত না হয়ে পারবেন না। আরও একটি মজার তথ্য জেনে রাখা ভালো। তাহলো ইরানে মাটির তৈরি সবচেয়ে বড় বাঁধটি এই নদীর উপরেই নির্মিত হয়েছে। এই বাঁধটিই আবার বিশ্বের সর্ববৃহৎ মাটির বাঁধের একটি।

কারখেহ ঝুলবারান্দা আরেকটি বিস্ময়কর নিদর্শন। সাসানি শাপুরের মাধ্যমে নির্মিত এই বারান্দাটি কারখেহ নদীর ডান দিকের উপকূলে দেখতে পাওয়া যাবে। আরও মজার ব্যাপার হলো এই ঝুলবারান্দার ডিজাইন পূর্ব ইউরোপীয় গির্জাগুলোর স্থাপত্যশৈলিতে খুব সহজেই পরিলক্ষিত হয়। কারখেহ'র সৌন্দর্য কিন্তু এখানেই শেষ নয়। কারখেহ নদীটি সবুজ একটি পার্কের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলে গেছে। এই পার্কে বিদ্যমান বিচিত্র উদ্ভিদ আর গাছ গাছালি নদীর আর্দ্রতা এবং গরমের কারণে চমৎকৃতি লাভ করেছে। ইরানের হলুদ গাভাজ্‌ন্ বা শিংওয়ালা হরিণ এই পার্কে প্রচুর দেখতে পাওয়া যাবে।

অবশ্য একমাত্র কারখেহ নদীই যে শুশ অতিক্রম করেছে তা নয় বরং সুন্দর সুন্দর আরও নদী আছে এখানে। কয়েকটি ঝরনার প্রবাহিত পানি এসে একত্রিত হয়ে নদীর আকৃতি ধারণ করেছে। এই নদীও বয়ে গেছে শুশ শহরের বুক চিরে। এই নদী বেয়ে এগিয়ে গেলে বমদেজ নামে বৃহৎ জলাশয়ের সাক্ষাৎ মিলবে। এই জলাশয়টি ইকোট্যুরিজম পর্যটকদের ভীষণভাবে আকৃষ্ট করে। এর কারণ হলো এই বমদেজ জলাশয়ে অতিথি পাখির ব্যাপক আনাগোণা থাকে। পূর্ব আফ্রিকা এবং সাইবেরিয় অতিথি পাখির আতিথেয়তায় সদা মশগুল থাকে এই জলাশয়টি। যাই হোক, শহরের পাশ থেকে মূল শহরের ভেতরে গেলে এই নদীর পূর্ব অংশে যে ঐতিহাসিক ও পবিত্র স্থাপনাটি নজরে পড়বে তা হলো বিখ্যাত একজন নবীর মাজার।                                                          

নবীর মাজারের কথা বলছিলাম। এই নবী হলেন হজরত দানিয়েল (আ)। বনী ইসরাইলের একজন নবী ছিলেন তিনি। সাদা রঙের কৌণিক একটি গম্বুজ রয়েছে মাজার স্থাপনাটির। ভেতরে সবুজ বাতি আর আয়নার কারুকাজে অন্যরকম আলোময় যে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে তা এককথায় অনন্য এবং পবিত্র। বলা হয়ে থাকে যে হজরত দাউদ (আ) এর বংশের নবী ছিলেন তিনি। ব্যাবিলনের বাদশাহ তাঁকে গ্রেফতার করে এই শহরে নিয়ে এসেছিল। পরবর্তীকালে দানিয়েল (আ) বাদশাহর একটা স্বপ্নের ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে তাঁর নবুয়্যতের সত্যতা প্রমাণ করেছিল। তিনি এই শহরেই মৃত্যুবরণ করেন। মুসলমানদের বাইরেও ইহুদি এবং খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের লোকজন হজরত দানিয়েল (আ) এর কবর জিয়ারত করার উদ্দেশ্যে এই শহরে ভিড় জমায়।

কেবল দানিয়েল নবীই নয় আরও অনেকের মাজার রয়েছে এখানে। বিখ্যাত শিয়া কবি দাবাল খাজায়ির মাজারও এই শহরে। আব্বাসীয় আমলের ওই মাজারটিকে শিয়াগণ দীর্ঘদিন গোপন রেখেছিলো। শহরের বাজারে যদি একবার ঢোকা হয় তাহলে সেখানে শুশের হস্তশিল্পের সঙ্গে সহজেই পরিচয় ঘটতে পারে। স্বতন্ত্র একটি হস্তশিল্প হলো কাপুবফি। এটি আসলে খেজুর পাতা দিয়ে তৈরি বিচিত্র তৈজস। সাজি, বাটি, বাটির নীচে দেয়ার মতো বিভিন্ন ডিজাইনের ম্যাট, বিভিন্ন রকমের পাত্রের ঢাকনা ইত্যাদি। এ এলাকার লোকজনের মূল পেশা কিন্তু কৃষি। অন্তত তিনটি নদী এখানে থাকায় কৃষিকাজের সুবিধাটা রয়েছে ভালোই। তারপরও এসব হস্তশিল্প তারা তৈরি করে থাকে। #

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ১

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।