ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় সর্ববৃহৎ ফরেস্ট পার্ক
বিশাল একটি দেশ ইরান। এ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য,পুরাতত্ত্ব আর সংস্কৃতির বিচিত্র সমৃদ্ধ উপাদান। গত আসরে আমরা গিয়েছিলাম ইরানের আরেকটি নামকরা প্রদেশ কোহগিলুয়ে ও বুয়ের আহমাদের দিকে।
প্রদেশের প্রধান শহর ইয়াসুজ শহর দেখার মধ্য দিয়ে শুরু করেছি সফর। বলেছি যে, এই শহরে রয়েছে বিখ্যাত লোর জনগোষ্ঠির বসবাস। ইরানের একটি প্রাচীন গোত্র হলো এই লোররা। কোহগিলুয়ে ও বুয়ের আহমাদ প্রদেশের দর্শনীয় কিছু নিদর্শনের কথাও বলেছি এবং সামান্য কিছু দেখেছিও।
বিশেষ করে চার চারটি ঝরনা এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ নিদর্শন হিসেবে পরিগণিত। ঝরনাগুলো আট মিটার থেকে পণর মিটার পর্যন্ত উচ্চতা থেকে পতিত হয়। অবশ্য এখানে পঞ্চাশ মিটার উঁচু ঝরনাও রয়েছে। তবে পর্যটকদের পক্ষে অতো উচ্চতায় গিয়ে ঝরনা উপভোগ করাটা খুব একটা সহজসাধ্য নয়। তাই দূর থেকে দেখেই ভরে নিতে হয় মন। ঝরনাগুলোর বাইরে এই এলাকার অন্যান্য দর্শনীয় ও উপভোগ্য প্রাকৃতিক নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে জলগুহা। এসব জলগুহার ভেতরে বাস করে আবাবিলের মতো এক ধরনের পাখি। ইংরেজিতে সোয়ালো বলে এগুলোকে। গুহার ভেতরেই এরা বাসা বানায়। এই গুহার পাশেই আবার ছোট ছোট পানির চৌবাচ্চা রয়েছে অনেক। সুতরাং প্রাকৃতিক এই দৃশ্যটি কেমন হতে পারে তা ভাবতেই আপনার মনে জেগে উঠবে শিল্পীর আঁকা ছবির এক নান্দনিক সৌন্দর্য।

গত আসরে আমরা তমোরাদি প্রণালীর কথা বলেছিলাম। চমৎকার এই প্রণালীটি যারঅভার এবং সভার্জ পাহাড়কে ঘিরে তৈরি হয়েছে। এখানে নিশ্চিন্তে বসবাস করে ভয়ংকর কিছু জন্তু জানোয়ার। ভালুক এবং কাঠবেড়ালির মতো প্রাণীও প্রচুর দেখতে পাওয়া যায়। প্রণালীটির ভেতরে ঢোকার পথে ঐতিহাসিক অনেক নিদর্শনও দেখতে পাওয়া যাবে।এগুলো হাখামানেশিয় যুগের ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন। আরও একটি স্থাপনা এখানে সবারই নজরে পড়বে। সেটা হলো একটি কবর। কবরটি হাখামেনশিয় বংশের কোনো এক অভিজাত ব্যক্তিত্বের। কবরস্থাপনাটি চোখে পড়ার মতো করে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে ইরানের নামকরা বীর সেনানী অরিউভারজান হাখামানেশি শাসনামলে নিজের সেনাদের সঙ্গে এই তমোরাদি প্রণালীতে এসেছিলেন এবং আলেক্সান্দারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ করেছেন।
ঝরনার কথা তো বললাম। এর বাইরেও ইয়াসুজে রয়েছে সুন্দর সুন্দর বেশ কটি ফরেস্ট পার্ক এবং উপকূলবর্তী পার্ক বা কোস্টাল পার্ক। এগুলো সেই ইয়াসুজ ফরেস্ট পার্ক এবং বাশার নদী উপকুলীয় পার্কের মতোই। ইয়াসুজ ফরেস্ট পার্ক অথবা ইয়াসুজ পার্বত্য বৃহৎ পার্ক মূল শহর থেকে উত্তর পূর্ব দিকে প্রায় এক হাজার হেক্টর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় সর্ববৃহৎ ফরেস্ট পার্ক হিসেবে পরিচিত এই পার্কটি। উঁচু নীচু এই পার্কের ভেতর থেকে পুরো শহরটির সৌন্দর্য দেখতে পাওয়া যায়।বিচিত্র উদ্ভিদে পূর্ণ পার্কটিকেও দূর থেকে বেশ সুন্দর দেখায়।

উপকূলীয় পার্ক বাশরও শহরের প্রবেশমুখেই পড়ে। ইয়াসুজের অন্যতম সুন্দর এবং উপভোগ্য একটি অবকাশযাপন কেন্দ্র এটি। পার্কের কোল ঘেঁষে বয়ে গেছে বাশর নদী। কেমন প্রশান্ত এবং নিত্য বহমান এই নদী। সুতরাং কীরকম চিত্তাকর্ষক একটা পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে এখানে একটু ভেবে দেখুন। সময় কাটানোর জন্য কিংবা ক্লান্তি শ্রান্তি ভুলে থেকে স্মৃতিময় মুহূর্ত ধরে রাখার জন্য চমৎকার একটি স্পট এটি। ইয়াসুজের সবুজ শ্যামল প্রকৃতি আর প্রান্তরের সজীবতার জলীয় উৎস হলো এই নদী। ইয়াসুজ শহর থেকে ইস্ফাহানের দিকে যেতে এক কিলোমিটারের মতো পথ অতিক্রম করলে পড়বে 'মেহরিয়ান' নামে একটি প্রণালী। এই প্রণালীর পাশেই রয়েছে ইমামজাদা হাসান (আ) এর মাজার। স্বাভাবিকভাবেই জিয়ারতকারীদের আনাগোণায় সবসময়ই মুখরিত থাকে এই মাজার অঙ্গন।
মেহরিয়ান প্রণালীতে শীতকালেও পর্যটকদের ব্যাপক আনাগোণা থাকে। বিশেষ করে এখানে রয়েছে স্কি খেলার সুন্দর ব্যবস্থা। শীতের সময় ইমামজাদার মাজারের বিপরীতে প্রস্তরের ওপর বিপুল বরফ জমে যায়। এই জমাট বরফ শীত ঋতুর শেষের দিকে ভাঙতে শুরু করে। বরফের চাক ভাঙার শব্দ বহু দূর থেকেও শোনা যায়। আর ওই বরফ ভাঙার শব্দ এলাকাবাসীর মনে বয়ে নিয়ে আসে বসন্তের আনন্দঘন আগমনী বার্তা। মেহরিয়ান নদীর স্বচ্ছতোয়া স্ফটিকজল ইয়াসুজের বাশর নদী এবং কারুন নদীতে গিয়ে মিলে যায়।
আমরা এখন আছি ইয়াসুজে। শেখ সেরকেহ গ্রাম কিংবা শেখ সাদুক গ্রামও এখানকার অন্যতম দর্শনীয় একটি এলাকা। এই এলাকা মোটামুটি শীতপ্রধান। আর শীতপ্রধান এলাকায় কাঙ্গার, রিভস এবং মাশরুমের মতো সব্জিগুলো বলা যায় সহজলভ্য। এর বাইরেও আখরোট গাছ, আপেল গাছ, আঙুর গাছ এবং পীচ ফল গাছেরও বিচিত্র সমারোহ লক্ষ্য করা যায় এখানে। শেখ সেরকেহ'র মাজারটিও এখানকার একটি টিলার ওপরে বুনো নাশপাতি বৃক্ষ পরিবেষ্টিত অঞ্চলে অবস্থিত। এখানে রয়েছে জল টৈটুম্বুর বেশ কয়েকটি ফোয়ারা। আর এইসব ফোয়ারার পানির কারণেই গ্রামটির সৌন্দর্য যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি চাষাবাদের উপযোগী হয়ে উঠেছে এখানকার ভূমি।
ইয়াসুজের আশেপাশে দেখার মতো আরও বহু নিদর্শন রয়েছে। যেমন নদী আর বহমান ফোয়ারাময় আলামুন পার্বত্য উপত্যকা। এই উপত্যকার অন্যরকম সুন্দর আবহাওয়া পুরো ইরানময় বিখ্যাত। ককন নামে একটি এলাকা রয়েছে এখানে। শীতকালে ককনে স্কি খেলার ধুম পড়ে যায়। মাজদাক দার্তা নামের একটি গ্রামের কথাও উল্লেখ না করলেই নয়। ধান চাষ এবং স্যামন মাছের জন্য বিখ্যাত এই গ্রামটি। এখানে রয়েছে প্রাচীন একটি কবরস্থান। নাম হলো 'লেমা'। ইরানের প্রাচীন ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিশেষ করে ইলামি শাসনামলের বিচিত্র ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে এই কবরস্থানটি। পুরো ইয়াসুজের মূল্যবান ঐতিহাসিক নিদর্শন ও পুরাতাত্বিক নিদর্শন দেখতে পাওয়া যাবে এখানকার মিউজিয়ামে। ইয়াসুজ শহরে তাই কেবল পর্যটক আর প্রকৃতি প্রেমিকেরাই ভ্রমণ করেন না, বেড়াতে যান পুরাতত্ত্ব গবেষকরাও। #
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ২৫
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।