প্রখ্যাত ইরানি মনীষী বক্তা ও লেখক হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি
গত পর্বের আলোচনায় আমরা হিজরি নবম শতকের তথা খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি মনীষী, আলেম, চিন্তাবিদ, বক্তা ও লেখক মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির জন্ম ও শিক্ষা সম্পর্কে কিছু কথা বলেছি।
আমরা বলেছিলাম সে যুগের শ্রেষ্ঠ বা অন্যতম সেরা বক্তা ও ধর্ম-প্রচারক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তিনি। কাশেফির ওয়াজ-নসিহতের সভায় বিপুল জন-সমাবেশ হত এবং স্বয়ং সুলতান, মন্ত্রী-সভা ও দরবারের লোকজন এ ধরনের সভায় উপস্থিত হতেন।
মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফিকে অনেকেই মরমি কবি জামির সঙ্গে তার বন্ধুত্ব বা সাহচর্যের আলোকে তাকে নকশবন্দিয়া সুফি তরিকার অনুসারী বলে মনে করেন। কিন্তু অন্য একদল গবেষক মনে করেন এর অর্থ এ নয় যে তিনি মরমি কবি জামির মুরিদ বা খাজা আবদুল্লাহ আহরারের মুরিদ ছিলেন। বরং কাশেফি ইরফানি দিক থেকে এই তরিকার প্রতি কিছুটা ঝুঁকে ছিলেন। ইরফানের দিকে তার ঝোঁক-প্রবণতার প্রতিফলন ঘটেছে তারই কোনো কোনো রচনায়। আর এ বিষয়টিকে কাশেফির ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে বড় দিক বলে উল্লেখ করা যায়।
মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির অনেক রচনার কথা জানা যায়। তার অবস্থা সম্পর্কে নানা বর্ণনা দেখা গেলেও অসাধারণ বাগ্মী এই মনীষীর ধর্ম-বিশ্বাস ও মাজহাব সম্পর্কে অনেক অস্পষ্টতা রয়েই গেছে। কেউ কেউ তাকে সুন্নি মাজহাবের অনুসারী বলে মনে করেন। আবার অনেকেই তাকে শিয়া মুসলিম মাজহাবের অনুসারী বলে উল্লেখ করেছেন। এ অস্পষ্টতার কারণ হল সাবজাওয়ার ও হেরাত শহরে কাশেফির বসবাস। সাবজাওয়ার শহরে কাশেফির জন্ম হয়েছিল। তিনি এখানে বহু বছর ছিলেন এবং এখানেই বড় হন। শিয়া অধ্যুষিত এই শহর ও বাইহাক শহরের প্রধান কাজি বা বিচারপতিও ছিলেন কাশেফি। অন্যদিকে তিনি হেরাত শহরে ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ছিলেন। আর এ শহরের বেশিরভাগ অধিবাসীই হলেন সুন্নি মুসলমান।
তবে এটা স্পষ্ট মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি ছিলেন বিশ্বনবীর (সা) পবিত্র আহলে বাইত ও এই ধারায় জন্ম নেয়া ইমামদের অনুরাগী। তিনি সর্বত্র ও সব সময়ই এ বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। সমসাময়িক যুগের ইতিহাসবিদ রাসুল জাফারিয়ান এ বিষয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছেন যে, সে যুগে পূর্ব ইরানে সুন্নি সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি গোষ্ঠীর কথা জানা যায় যারা বারো ইমামি সুন্নি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিল।
রাসুল জাফারিয়ান লিখেছেন, হিজরি সপ্তম ও অষ্টম শতকে বারো ইমামী সুন্নিদের মধ্যে দেখা যেতো যে তারা ভাষণের শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা ও রাসুলের (সা)'ওপর দরুদ পাঠের পর প্রথমে চার খলিফা এবং তারপর মহানবীর আহলে বাইতের ১২ জন ইমামের নাম স্মরণ করত শ্রদ্ধার সঙ্গে। মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফি তার 'ফতুউয়াত নামেহ সুলতানি' তথা 'রাজকীয় ভদ্রতা ও শিষ্টাচার' ও 'রওজাতুশ শুহাদা' শীর্ষক বইয়েও এই বিশেষ পদ্ধতি বা রীতির অনুসরণ করেছেন।

'ফতুউয়াত নামেহ সুলতানি' শীর্ষক বইয়ে কাশেফি ১২ ইমামের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করাকে শিষ্টাচারের অপরিহার্য অংশ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি এ বইয়ের কেবল ভূমিকার অংশে প্রথম তিন খলিফার নাম উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে এ বইয়ে অনেক বার ১২ ইমামের নাম উল্লেখ করেছেন কাশেফি। এ বইয়ের নবম অধ্যায়ে অনুষ্ঠান বা কোনো আসরের সমাপ্তি টানার শিষ্টাচার সম্পর্কে বক্তব্য রয়েছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে দু'টি বক্তৃতা তুলে ধরা হয়েছে। এ দুটি বক্তৃতা থেকে মনে করা হয় যে কাশেফি বারো ইমামি শিয়া ছিলেন।
হিজরি নবম শতকের তথা খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি মনীষী, বক্তা ও লেখক মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির একটি বিখ্যাত বই হল রওজাতুশ শুহাদা। তার এ বইটিতে শিয়া মাজহাবের সবচেয়ে বেশি লক্ষণ দেখা যায়। বইটিতে অতীতের নবী-রাসুলদের সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরার পর বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)'র জীবনী ও ইমামদের জীবনী তুলে ধরা হয়েছে। এ বইয়ের কারবালা বিষয়ক অংশে সবচেয়ে বেশি বিস্তারিত আলোচনা দেখা যায়। আসলে কারবালার ঘটনা তুলে ধরাই ছিল এ বই লেখার প্রধান উদ্দেশ্য।
নিরলস ও অক্লান্ত ধর্ম প্রচারক কাশেফির গদ্য ও পদ্য রচনার সংখ্যা অনেক। প্রাঞ্জল ফার্সি ও আরবি ভাষায় লেখা তার বইগুলো বিচিত্রময়, মনোমুগ্ধকর ও জনপ্রিয়। তার জীবদ্দশাতেই এসব বই জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। তুর্কি ওসমানী খেলাফতের যুগে কাশেফির লেখা অনেক বই তুর্কি ভাষায়ও হয়েছে অনূদিত। এসব বই তুর্কীভাষীদের মধ্যেও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। ইসলামের নেতৃত্ব তথা ইমামত ও বেলায়াত সম্পর্কিত আলোচনার প্রাধান্য থাকা সত্ত্বেও এসব বই ফার্সি-ভাষাভাষী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল।
বিশিষ্ট গবেষক সায়িদ নাফিসি ইরানি মনীষী, আলেম, চিন্তাবিদ, বক্তা ও লেখক মাওলানা হোসাইন ওয়ায়েজ কাশেফির ৩৭টি বইয়ের নাম উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে ডক্টর গোলাম হুসাইন ইউসেফি ইসলামী বিশ্ব-কোষে উল্লেখ করেছেন যে কাশেফির ৪০টি বই তুর্কি অথবা ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে।
'ফতুউয়াত নামেহ সুলতানি' ও রওজাতুশ শুহাদা শীর্ষক দুটি বই ছাড়াও কাশেফির কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বইয়ের নাম হল: আখলাকে মোহসেনি, আসরারই কাসেমি, তাফসিরই কুরআন মাজিদ ও জাওয়াহিরুত তাফসির।#
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ০১
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।