রংধনু আসর : দুই রাজা ও রাজপুত্রদের গল্প
রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, কেমন আছো তোমরা? আশা করি যে যেখানে আছো ভালো ও সুস্থ আছো। আজকের আসরে তোমাদের স্বাগত জানাচ্ছি আমি গাজী আবদুর রশিদ এবং আমি আকতার জাহান।
আজকের আসরে আমরা দু’জন রাজার গল্প শোনাব। গল্পের পর থাকবে একটি গান ও ভারতের এক নতুন বন্ধুর সাক্ষাৎকার। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান। তো প্রথমেই শোনা যাক দয়ালু রাজাকে নিয়ে গল্প 'আধখানা কম্বল'।
অনেককাল আগে এক দেশে ছিলেন এক দয়ালু রাজা। অনেকদিন দেশ চালানোর পর একসময় তিনি বুড়ো হলেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি সবকিছু বুঝিয়ে দিলেন একমাত্র ছেলেকে। বুড়ো রাজার আকাঙ্ক্ষা- ছেলে তার চেয়েও বেশি জনপ্রিয় হবে।
ছেলেকে রাজা হিসেবে দায়িত্ব দেয়ার সময় দুটি অনুরোধ করলেন। দেশের সব মানুষের যাতে ভালো হয়, তারা যেন সুখে শান্তিতে থাকতে পারে, সে ব্যাপারে দিনরাত কাজ করতে হবে। দ্বিতীয় অনুরোধটি হলো- বুড়ো বয়সে যেটুকু যত্ন সেবা দরকার, সেটুকু যেন পাওয়া যায়।
নতুন রাজা কথা দিলেন- বাবার সামান্য দুটি অনুরোধ তিনি রাখবেন। প্রতিশ্রুতি পেয়ে আশ্বস্ত হলেন পিতা। রাজ্য ভালোই চলছে। নতুন রাজা প্রজাদের দেখভাল করেন আন্তরিকতা নিয়ে। বাবার উপদেশ-পরামর্শ মেনে চলেন অক্ষরে অক্ষরে।
কিন্তু একসময় পরিস্থিতি পালটে গেল। নতুন রাজা বিয়ে করলেন। রানি আসার পর সবকিছু কেমন ওলটপালট হতে শুরু করল। রানি বুড়ো রাজাকে পছন্দ করলেন না। ছেলে যে এত বাপ অন্তপ্রাণ- এটা তার সহ্য হয় না। নতুন রাজা বউয়ের চাইতে বাবার কথার বেশি গুরুত্ব দেন- এটা মেনে নিতে পারেন না নতুন রানি।
স্বামীকে বলেই ফেলেন, খাবার টেবিলে তোমার বাবা সব সময়েই কাশতে থাকেন। খুকখুক কাশি শুনতে শুনতে আমার কান ঝালাপালা। খাওয়া-দাওয়ার কোনো রুচি থাকে না। সবসময় উনি তোমাকে শিশু ভাবেন। নানারকম জ্ঞান দিতে থাকেন। এখন তুমি রাজা। দেশ চলবে তোমার হুকুমে।
রানির এসব হিংসুটেপনা নতুন রাজার মোটেই ভালো লাগে না। কিন্তু তিনি নিরুপায়। বউয়ের কথার প্রতিবাদ করবেন, সেই সাহসও নেই। রোজ রোজ এমন ঘ্যানর ঘ্যানর কত ভালো লাগে? বড্ডো বিরক্ত তিনি।
একসময় তিনি বুড়ো বাবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হলেন। বুড়ো রাজাকে মাটির নিচের বদ্ধ একটা ঘরে নজরবন্দি করা হলো। দিনরাত প্রহরী দাঁড়িয়ে থাকে সেই ছোট্ট কুঠুরির বাইরে। বদ্ধ ঘরের পরিবেশ মোটেই সুবিধের নয়। নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে। ভীষণ ঠাণ্ডাও। পোষা কুকুর-বেড়ালকেও মানুষ এর চেয়ে ভালো অবস্থায় রাখে। বৃদ্ধ রাজার কপাল মন্দ। বিনা দোষে এসব অত্যাচার ও নির্যাতন তাঁকে সইতে হচ্ছে। প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা বা সম্ভাবনা নেই।
এভাবে কয়েক বছর কেটে গেল। বৃদ্ধ রাজার বন্দিদশা কাটেনি। হয়তো বাকি জীবনে কাটবেও না।
এদিকে নতুন রাজার একটি ছেলে হয়েছে। তার স্বভাবচরিত্র বেশ ভালো। বন্দি বুড়ো রাজার ভীষণ ভক্ত সে। প্রতিদিনই দাদুর সঙ্গে অনেকটা সময় কাটায়। বৃদ্ধ রাজার কাছে রাজকুমারের আসা-যাওয়ার ব্যাপারটি তার মায়ের ভীষণ না-পছন্দ। ছেলেকে অনেক বারণ করেছেন। ফল হয়নি কোনো। দাদুর কাছে সে যাবেই। দাদুকে যেসব খাবার দেওয়া হয়, তা মোটেও ভালো না। সে নিজে খাবারদাবার নিয়ে যায় তাই।
একদিন দাদু বললেন, প্রচণ্ড শীতে কষ্ট পাচ্ছি আমি। দাদুভাই যদি পারো, আমাকে একটা কম্বল এনে দিয়ো।
ভালো একটা কম্বল জোগাড় করা হলো। কম্বল পেয়ে একটানে ছিঁড়ে দুই টুকরা করে ফেলল রাজপুত্র। ব্যাপারটা খেয়াল করলেন তার বাবা। ছেলেকে রাজা জিজ্ঞেস করলেন, এই কম্বল দিয়ে কী করবে তুমি? আর কম্বলটাকে দুই টুকরাই বা করলে কেন?
রাজকুমার জবাব দেয়, তোমার বাবার ঘরে ভীষণ ঠাণ্ডা। উনার বিছানায় পেতে দেব বলে আধখানা কম্বল নিয়ে যাচ্ছি।
এ কথা শুনে রাজা অবাক হয়ে ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, আর বাকি অর্ধেকটা? সেটা দিয়ে কী করবে?
রাজকুমার বলল, বাকি অর্ধেকটা রেখে দিচ্ছি তোমার জন্যে। ভবিষ্যতে আমি যখন রাজা হবো, এই আধখানা কম্বল তখন তোমার কাজে লাগবে।
ছেলের কথা শুনে নতুন রাজা অবাক হয়ে গেলেন। ছেলের মাধ্যমে নিজের বাবার সাথে নির্দয় আচরণের উচিত জবাব পেয়ে রাজাকে বেশ চিন্তিত মনে হলো।
‘ছয় রাজপুত্র ও রাজহাঁসের গল্প’
অনেকদিন আগের কথা। এক রাজার গল্প বলছি, তার শখ ছিল ঘোড়ায় চড়ে শিকার খোঁজা। একবার ঘোড়ায় চেপে শিকার করতে করতে কখন যে সন্ধ্যা হয়ে গেছে সেদিকে খেয়ালই করেননি। পেছনে তাকিয়ে দেখেন ভৃত্যরাও তার পাশে নেই। রাজা ভৃত্যদেরকে জোরে জোরে ডাকতে লাগলেন। কারো কোনো সাড়া শব্দ নেই। রাজা বুঝে গেলেন তিনি ভৃত্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন।
এমন সময় বয়স্ক মহিলার রূপ ধারণ করে এক ডাইনি রাজার সামনে এলো। দূর থেকে ঘোড়ায় চড়ে তাদের বাবার মতো কাউকে আসতে দেখে রাজার ছয় ছেলে আনন্দে দৌড়াতে দৌড়াতে দুর্গ থেকে বেরিয়ে এলো। বেরিয়ে আসতেই ডাইনির মেয়ে তাদের ওপর জাদুর কাপড় ছুঁড়ে দিলে তারা ছয়খানা রাজহাঁস হয়ে বনের ওপর দিয়ে উড়ে চলে গেল। ডাইনির মেয়ে জানতও না যে, রাজার সাত ছেলেমেয়ের মধ্যে ছয় ছেলে দৌড়ে দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসেছিল কিন্তু তাদের ছোট বোন তখনো দুর্গের মধ্যেই ছিল।
রাজা সেই বনের ভেতর দিয়ে দুর্গে এসে পৌঁছালেন তার ছেলেমেয়েরা কেমন আছে তা দেখার জন্য। এসেই তো রাজা হতবাক! তার সাত ছেলেমেয়ের মধ্যে শুধু ছোট মেয়ে রয়েছে। ছোট মেয়েকে জিজ্ঞেস করায় সে তার বাবাকে সবিস্তারে জানালো। তার ভাইয়েরা কেমন করে রাজহাঁস হয়ে উড়ে গেছে গভীর বনের দিকে। জানালা দিয়ে সে দেখেছে তার ভাইদের রাজহাঁস হয়ে উড়ে যাওয়া। এমনকি রাজহাঁস হয়ে উড়ে যাওয়ার আগে তাদের ডানা থেকে খসে যাওয়া পালকও সে কুড়িয়ে রেখেছে রাজাকে দেখাবে বলে।
পালক হাতে নিয়ে রাজা পুরো ঘটনার সত্যতা বুঝতে পেরে হতাশ হয়ে দুর্গের সামনের চাতালে বসে পড়লেন আর ভাবতে লাগলেন তার একমাত্র মেয়ের কথা।
এদিকে, রাত হলে দুর্গের মধ্যে একা থাকতে থাকতে ছোট মেয়েটার ভীষণ ভয় করতে লাগল। তার মনে হতে লাগল ভাইদের ছাড়া সে থাকতে পারবে না। সে রাতেই বনের অন্য প্রান্তে বেরিয়ে গেল, যেদিকে তার ভাইয়েরা রাজহাঁস হয়ে উড়ে গেছে।
সন্ধ্যা নামার খানিক আগেই বনের ভেতর সে একটি পোড়াবাড়ি দেখতে পেল। চুপিসারে বাড়িটির কাছাকাছি আসতেই তার চোখে পড়ল ঘরের ভেতর ছয়টি ছোট ছোট খাট। সন্ধ্যা নামার একটু আগেই ডানার ঝটপট শব্দে ঘুম ভেঙে গেল তার। চোখ খুলতেই সে দেখল ছয়টি রাজহাঁস কোথা থেকে উড়ে এসে জানালার ধারে বসে আছে।
কিছুক্ষণ পরেই তাদের সব ডানা খুলে পড়ে যেতেই ছোট মেয়ে অবাক হয়ে গেল রাজহাঁসের জায়গায় তার ছয় ভাইকে দেখে। ছোট মেয়েটি কেঁদে উঠল, সে তার ভাইদের বলল, তোমরা এই যাদুমন্ত্র থেকে মুক্ত হতে পারো না?
এ কথা শুনে ভাইয়েরা বলল, রাজহাঁস থেকে মুক্ত করার একটিই উপায় আর তা হলো ছয় বছর ধরে তাদের ছোট বোন কোনো কথা বলতে পারবে না, হাসতেও পারবে না। আর এই ছয় বছরে তাদের জন্য সাদা ঘাসের ছয়টি ছোট ছোট জামা তাকে বানাতে হবে। জামা বানাতে বানাতে এই ছয় বছরের মধ্যে যদি একটিও কথা সে বলে ফেলে কিংবা হেসে ফেলে একটুও তাহলে আবার শুরু থেকে তাকে জামা বানাতে হবে।
এসব শর্ত শুনে ছোট মেয়েটি ওই পোড়াবাড়ি ছেড়ে বনের দিকে ফিরে গেল। যেতে যেতে যেতে অনেক দূরে একটি বড় গাছের নিচে এসে সে বসে পড়ল। সে এরইমধ্যে অনেক সাদা ঘাস জোগাড় করে ফেলেছে। সেই ঘাস দিয়ে এক মনে জামা বানাতে লাগল। ঠিক করল মুখে একটিও শব্দ করবে না, আর হাসবেও না ছয় বছরের জন্য, যতক্ষণ না ভাইদের জন্য সে ঘাসের জামা তৈরি করতে পারছে।
সেই গাছের নিচে বসে ঘাসের জামা বানাতে বানাতে রাজকন্যার অনেকদিন কেটে গেল। এরমধ্যে রাজকন্যা আরো বড় হয়ে গেছে, দেখতেও ভারী সুন্দর হয়েছে। এমন সময় একদিন পাশের রাজ্যের রাজা শিকারে এলেন সেই বনে। তার দলবল শিকার করতে করতে সেই গাছের কাছে এসে পৌঁছাল, আর সুন্দরী রাজকন্যাকে দেখতে পেয়ে তার নাম জিজ্ঞেস করল।
রাজকন্যা ভাইদের জন্য জামা সেলাই শেষ না করে কথা বলতে পারবে না বলে শুধু মাথা নাড়ল। কিন্তু তাতে কিছুই বুঝতে না পেরে রাজার দলবল তার সম্পর্কে আরো জানতে ইচ্ছুক হলো। তারা আবার তাকে জিজ্ঞেস করল, সে কোথায় থেকে এসেছে, কোথায় যাবে। কিন্তু রাজকন্যা একটিও শব্দ করল না। তাকে তারা ঘোড়ায় চড়িয়ে নিয়ে এলো রাজার দরবারে।
রাজা তাকে দেখে অনেক তার সম্পর্কে প্রশ্ন করল। কিন্তু সব প্রশ্নেই রাজকন্যাকে চুপ থাকতে দেখে রাজারও ভীষণ মায়া হলো। আর রাজা ঠিক করলেন মেয়েটিকে তারই কাছে রাখবেন এবং বিয়ে করবেন। কিছুদিনের মধ্যেই রাজার সঙ্গে মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেল।
রাজার মা ছিলেন ভীষণ চালাক আর বদমাশ। কিছুদিন পর রাজকন্যা তার প্রথম সন্তানের জন্ম দিলেন। রাজার মা যেন এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। সন্তানের জন্মের পর রাজার মা রাণীর কাছ থেকে তার ছেলেকে চুরি করে লুকিয়ে রাখলেন। আর রাজাকে এসে বললেন, রাণী তার সন্তানকে মেরে ফেলেছেন।
রাজা অন্দরমহল থেকে রাণীকে ডেকে পাঠালেন ঘটনা জানার জন্য। কিন্তু মুখ থেকে একটিও শব্দ উচ্চারণ করলেন না রাণী। রাজা এবার পুত্র শোকে রেগে গিয়ে রাণীকে দোষী সাব্যস্ত করলেন আর শাস্তিস্বরূপ আগুনে পুড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করলেন।
দেখতে দেখতে মৃত্যুদণ্ডের দিন ঘনিয়ে এলো। আর সেদিনই আসলে সেই ছয় বছর ধরে কোনো কথা না বলে, এতোটুকু না হেসে রাজকন্যার সাদা ঘাসের জামা বানানোর শেষ দিনও ছিল। ছয়টি জামাও তার বানানো হয়ে গিয়েছিল। তাই যখন রাজকন্যাকে রাজার আদেশ অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের জন্য ওপরে আনা হলো তখন তার হাতে করে সে ওই ছয়টি জামাও নিয়ে এসেছিল। আর সারাক্ষণ আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছিল কখন সেই ছয়টি রাজহাঁস উড়ে আসে।
যখন রাজার আদেশ অনুযায়ী নিচে আগুন ধরানো হবে ঠিক তখনই সেই ছয়টি রাজহাঁস উড়ে এসে রাজকন্যার কাঁধে রাখা জামার কাছে এসে তাদের ডানার পালক ঘসতে লাগল। আর সাথে সাথেই তাদের সব পালক খসে গিয়ে রাজহাঁসের ভেতর থেকে সুন্দর ছয় ছয়টা রাজপুত্র বেরিয়ে এলো।
রাজা তো এসব দেখে অবাক! রাজার হুকুমে রাণীকে নিচে নামিয়ে আনা হলো, আর তারপর সে নিজে সমস্ত কথা রাজাকে খুলে বললেন।
রাজকন্যার ভাইদের ওপর থেকে সেই জাদুর মায়াও কেটে গেল। তারা আবার ফিরে পেল তাদের আগের চেহারা। আর তার সাথেই শেষ হলো তাদের দুঃখের জীবন। এরপর থেকে সেই রাজা-রাণী আর তার ছয় ভাই ওই রাজ্যে সুখে স্বাচ্ছন্দে দিন কাটাতে লাগল।
বন্ধুরা, অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে রয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার উলুবেড়িয়া থানার অন্তর্গত গদাইপুর গ্রামের বন্ধু ফাতেমাতুজ জাহরার সাক্ষাৎকার। সে ফুলকুঁড়ি কালচারাল গোষ্ঠীর সদস্য।#