জুলাই ০২, ২০২০ ১৪:৩১ Asia/Dhaka

গত পর্বের ধারাবাহিকতায় আজও আমরা হিজরি ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকের তথা খ্রিস্টীয় দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি সুফি সাধক, মুহাদ্দিস ও কবি শেখ নাজমুদ্দিন কুবরার জীবন, চিন্তাধারা ও অবদান সম্পর্কে আলোচনা করব।

কোবরুইয়া সুফি তরিকার প্রতিষ্ঠাতা অথবা এই সুফি তরিকার শীর্ষস্থানীয় মুর্শিদ তথা শেখ নাজমুদ্দিন কুবরার জীবদ্দশা ছিল সুফিবাদী নানা তরিকা বা তরিকতপন্থীদের ব্যাপক বিকাশ ও বিস্তৃতির সোনালী যুগ। তার যুগে তথা হিজরি ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকে বা খ্রিস্টীয় দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকে কাদেসিয়া, হাইদারিয়া, বেক্তাশিয়া, মৌলভিয়া, সোহরাওয়ার্দিয়া ও নাকশাবান্দিয়া তরিকাসহ আরও কয়েকটি সুফিবাদী তরিকা এ সময় ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছিল। কোবরুইয়া সুফি তরিকার ব্যাপক অনুসারী ছিল তৎকালীন ইরান, খোরাসান, ট্রান্স-অক্সিয়ানা, প্রাচীন শাম বা সিরিয়া, এশিয়া মাইনর ও এমনকি চীন ভূখণ্ডেও।

শেখ নাজমুদ্দিন কুবরার প্রধান দুই বৈশিষ্ট্য হল: প্রথমত তিনি তার সুফিবাদী বা ইরফানি গভীর চিন্তা-ভাবনা ও বিশ্বাসগুলোকে অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় তুলে ধরেছিলেন। দ্বিতীয়ত তিনি প্রাণসঞ্জীবনী ও চারিত্রিক পূর্ণতাদায়ক তার উপদেশমালাকে মুরিদ বা অনুসারীদের কাছে উন্নত জীবনের দিশারি বা পথ-নির্দেশক আদর্শ বই আকারে দিয়ে যেতে পেরেছিলেন।

শেখ নাজমুদ্দিন কুবরা আরেফ বা সুফি হওয়া সত্ত্বেও শরিয়তকে খুবই গুরুত্ব দিতেন এবং জাহের ও বাতেন তথা বাহ্যিক আর আধ্যাত্মিক অবস্থাকে বিচ্ছিন্ন দৃষ্টিতে দেখতেন না। তিনি তরিকতের আদব-কায়দা, খেরকা বা আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব প্রদান, পীর বা মুর্শিদের পরিপূর্ণ অনুসরণ, নির্জনবাস, জিকির-আজকারে মশগুল থাকা, নীরবতা ইত্যাদি বিষয়ের ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দিতেন। এইসব দিকের প্রতি গুরুত্ব দেয়া সত্ত্বেও তার তরিকাটি ছিল সামাজিক তরিকা।

কোবরুইয়া সুফি তরিকার অন্যতম প্রধান দিক হল জিক্‌রের প্রতি গুরুত্ব আরোপ। শিক্ষানবিশ খোদা-প্রেমিকদের জন্য দশটি পর্যায়ের কথা তুলে ধরে শেখ নাজমুদ্দিন কুবরা বলেছেন, এ পর্যায় বা ধাপগুলো অতিক্রম করে খোদা-প্রেমিক মহান আল্লাহর মারেফাত বা উপলব্ধির পর্যায়ে উপনীত হতে পারেন।  কোবরুইয়া সুফি তরিকায় মহান আল্লাহর সার্বক্ষণিক স্মরণ, সার্বক্ষণিক রোজা ও দেহকে সব-সময় ওজুর হালতে বা পবিত্র অবস্থায় রাখা, নীরবতা ও নির্জন-বাস এবং সব সময় একজন পীর বা ওস্তাদের দিক-নির্দেশনাধীন থাকার ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দেয়া হয়।

শেখ নাজমুদ্দিন কুবরার তরিকায় আল্লাহর নাফরমানি এড়িয়ে চলতে ও পারলৌকিক সুখ বা বেহেশতি নেয়ামতগুলোর আশায় ইবাদত না করতে পরামর্শ দেয়া হয়।

আগেই বলেছি, কোবরুইয়া সুফি তরিকার অন্যতম প্রধান দিক হল জিক্‌রের প্রতি গুরুত্ব আরোপ। অন্য সুফি তরিকাগুলোও জিক্‌রকে ব্যাপক গুরুত্ব দেয়। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহর কোনো কোনো নাম, যেমন ফাত্তাহ বা উদ্বোধনকারী, হাইয়ু বা চিরঞ্জীব, সুবাহান আল্লাহ বা পবিত্র আল্লাহ, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ তথা আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই- এসবই পবিত্রতার শীর্ষ পর্যায়ের বিষয়।  কোনো কোনো সুফি বা আরেফ বলে থাকেন যে কুরআন তিলাওয়াত ও নামাজ পড়াসহ সব ইবাদত আসলে পবিত্র আল্লাহরই স্মরণ।

কিন্তু কোবরুইয়া সুফি তরিকার দৃষ্টিতে জিক্‌র অর্থ মহান আল্লাহর নামগুলোকে পুনরাবৃত্তি করা যা এক বিশেষ ধরনের ইবাদত। দোয়া ও অন্যান্য ইবাদতের সঙ্গে জিক্‌রের রয়েছে বিশেষ পার্থক্য রয়েছে। দোয়া সাধারণত আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়া, কিন্তু জিক্‌রের অর্থ হল মহান আল্লাহর নামের প্রতি মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা ও আল্লাহকে স্মরণে রাখা তথা তাঁকে ভুলে না যাওয়া। জিক্‌রের বাস্তব তাৎপর্য হল আল্লাহ ছাড়া অন্য সব কিছুকে ভুলে যাওয়া। 

দোয়া ও জিক্‌রের মাধ্যমে মহান আল্লাহর সঙ্গে যে যোগাযোগ  বা সম্পর্ক তা দ্বিমুখী। জিক্‌রকারী বা জাকেরের অন্তর সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত থাকে সচেতনভাবে। আর এ অবস্থায় তার মুখে কোনো কথা থাকতে পারে বা নাও থাকতে পারে।  সুফিরা মনে করেন আল্লাহ তায়ালা তাঁর মহান নামগুলোর মধ্যে হাজির থাকেন। এই নামগুলোর মালিকের কাছে যাবার জন্য তথা এসব নামের গভীরে প্রবেশের জন্য তাসাউফের পর্যায়গুলো পীর বা মুর্শিদের দিক-নির্দেশনার মাধ্যমে অতিক্রম করতে হবে এবং শুরু করতে হবে আল্লাহর জিক্‌র বা স্মরণ।

আল্লাহ তায়ালা হচ্ছেন অসীম সত্তা। কোবরুইয়া সুফি তরিকার দৃষ্টিতে সসীম মানুষ সরাসরি অসীমের প্রতি মনোযোগী হতে পারে না, তবে অসীমের প্রতীকের প্রতি মনোযোগী হয়ে অসীমের মধ্যে নিজ সসীম সত্তাকে ডুবিয়ে দিতে পারে। অন্য কথায় আল্লাহর  নামগুলোর আশ্রয় নিয়ে জাকের আল্লাহকেই খুঁজতে থাকেন।

মানুষের মন নানা ভাবনায় ও দুশ্চিন্তায় মশগুল থাকে। কেবল আল্লাহর স্মরণই তার চিন্তাকে ও নিজ সত্তার কেন্দ্র তথা আত্মাকে উদাসীনতার আবর্জনা থেকে পবিত্র করে। শেখ নাজমুদ্দিন কুবরা বলেছেন, আল্লাহর স্মরণ সব গাইরুল্লাহর বিরোধী, এই স্মরণ যেখানে থাকে সেখানে তাঁর বিরোধী সব কিছুকেই ধ্বংস করে দেয়। 

সুফিদের দৃষ্টিতে অন্যতম প্রধান বা গুরুত্বপূর্ণ জিক্‌র হল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহ ও মহান আল্লাহর নামের সর্বনাম 'হুয়া' তথা তিনি। কোবরুইয়া সুফি তরিকার দৃষ্টিতেও লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মের সব শিক্ষা ও একত্ববাদ বা তাওহিদের শিক্ষা জড়িয়ে আছে এই বাক্যে। মুসলমান হতে হলে এই বাক্যকে স্বীকৃতি দেয়ার পাশাপাশি মহানবীর (সা) রেসালাত মেনে নেয়ার সাক্ষ্যও দিতে হয়।

নাজমুদ্দিন কুবরার মতে আসল লক্ষ্য হল আল্লাহ, আর সেজন্য আল্লাহ ছাড়া কথিত সব উপাস্যকে অস্বীকার করতে হবে। তার মতে মানুষের পরিচিতি ধ্বংসশীল এবং আল্লাহর পরিচিতিই কেবল টিকে থাকবে। আর লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর অন্যতম অর্থ হল আল্লাহর পরিচিতি ছাড়া অন্য কিছুর কোনো পরিচিতিই নেই। তাই কোবরুইয়া তরিকার দৃষ্টিতে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' মানুষের মুক্তি ও সৌভাগ্যের মাধ্যম। মানুষ তার সৃষ্টির আদিতে মহান আল্লাহকে  প্রভু বা খোদা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু পরে তারা বিষয়টি ভুলে গেছে। অবশ্য আল্লাহর স্মরণ বা জিক্‌র সেই চুক্তি বা ওয়াদাটি স্মরণ করিয়ে দেয়।

কোবরুইয়া সুফি তরিকার দৃষ্টিতে লা ইলাহ ইল্লাল্লাহসহ অন্য সব জিক্‌র আলোতে পরিণত হয় ও অন্তরকে তার আদি নূরানি অবস্থা ফিরিয়ে দেয়। জিক্‌রের সর্বোচ্চ পর্যায় হল আত্মিক জিকরের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে মিশে যাওয়া ও আল্লাহর সাক্ষ্য হওয়া এবং এ পর্যায়ে ব্যক্তির অস্তিত্বের সব দিক আল্লাহর সঙ্গে মিশে যাওয়ায় তার অস্তিত্বের সব কিছুই আল্লাহ্‌ আল্লাহ্‌ জিক্‌র করতে থাকে।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/ ২

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।