জুলাই ০৮, ২০২০ ১১:২২ Asia/Dhaka

গত পর্বের আলোচনায় বলা হয়েছে হিজরি দশম ও একাদশ শতক বা খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতকের প্রখ্যাত ইরানি কবি আবু তালিব কলিম কাশানি ছিলেন ফার্সি কবিতায় ভারতীয় স্টাইল প্রয়োগে সফল শীর্ষস্থানীয় কবিদের অন্যতম।

ইরানি সম্রাট শাহ-আব্বাসের সমসাময়িক যুগের খ্যাতিমান ফার্সি কবি হিসেবে তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। সম্রাট শাহজানের দৃষ্টি আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছিলেন এই ইরানি কবি। তার কবিতা এই মোগল সম্রাটের কাছে খুবই ভালো লাগত বলে তিনি তাকে রাজদরবারে প্রধান কবির পদ দান করে 'মালেক উশ শোয়ারা' উপাধি দিয়েছিলেন। আমৃত্যু এ পদে আসীন ছিলেন কলিম। ১০৬১ হিজরিতে কলিম কাশানি ইন্তেকাল করেন কাশ্মির অঞ্চলে। তার বয়স হয়েছিল ৭০। তাকে দাফন করা হয়েছিল শ্রীনগরে। আজ আমরা তার সাহিত্য কর্ম তথা তার কবিতার নানা বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোকপাত করব।

কবি আবু তালিব কলিম কাশানিকে ইরানি কবি সায়েব তাবরিজি'র কাব্য বা সাহিত্য-ধারার পুরোধা বলা হয়। কবিতায় প্রাঞ্জল আর সহজ-সরল শব্দ ও বাক-ধারা ব্যবহারে কলিম কাশানির অসাধারণ দক্ষতা সাহিত্য-সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়ে আসছে।  তার কবিতার স্বচ্ছ ও প্রাঞ্জল ভাষা এবং প্রকৃতি-কেন্দ্রীকতাও প্রশংসনীয়। দ্বিপদী ছন্দে লেখা তার শাহনামা কাব্যে রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার পঙক্তি এবং অন্য একটি কাব্য সংকলনে রয়েছে প্রায় দশ হাজার পঙক্তি। কলিম কাশানি মাসনাভি বা দ্বিপদী কবিতা, কাসিদা, গজল ও আরও নানা আঙ্গিকের কবিতা লিখেছেন। বহু স্টাইলের কবিতা নিয়ে নানা ধরনের সৃষ্টিশীলতার পরীক্ষা চালিয়েছিলেন কলিম কাশানি। কিন্তু তিনি সবচেয়ে বেশি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন গজল লেখায়। কাসিদা রচনার ক্ষেত্রেও সহজ-সরল ভাষা ব্যবহার বজায় রেখেছিলেন কলিম কাশানি। 

ভারতবর্ষ ও ভারতীয় জীবন-ধারার গভীর প্রভাব দেখা যায় কবি কলিম কাশানির কবিতার ওপর। অন্য কোনো ইরানি বা ফার্সিভাষী কবি এত বেশি মাত্রায় ভারতবর্ষ ও ভারতীয় জীবন-ধারায় প্রভাবিত হননি। আর এ জন্যই কলিম কাশানির কবিতায় ব্যাপক মাত্রায় ভারতীয় শব্দ ও বাক-ধারা দেখা যায়।

 

কলিম কাশানির খ্যাতির মূল মাধ্যম হল তার গজল। তার গজলগুলো সরল ও প্রাঞ্জল ভাষার পাশাপাশি নতুন চিন্তাধারা বা বিশ্বাস ও অভিনব ভাবনায় সমৃদ্ধ।  কলিমের কবিতাগুলোর শেকড় লুকিয়ে আছে মূলত তার সামাজিক ভাবনায়। অভিনব ভাবনা ও স্বপ্নিল বা রোমান্টিক চিন্তা তার গজলগুলোকে করেছে অন‍ন্য। প্রবাদ ও কথ্য নানা পরিভাষা তার গজলগুলোকে নিয়ে এসেছে সাধারণ মানুষের ভাবনার অনেক কাছাকাছি এবং দূর করেছে তাদের সঙ্গে গজলের বিশেষ ভাষার দূরত্ব।

ফার্সি কবিতায় ভারতীয় স্টাইল প্রবর্তনের অন্যতম অগ্রদূত ছিলেন কবি কলিম কাশানি। তার সৃষ্টিশীলতা, অনবদ্য কল্পনা-শক্তি, অভিনব ভাবনা, কম শব্দে অনেক বেশি বক্তব্য তুলে ধরার ক্ষমতা, বস্তুকে মানবীয় রূপ দিয়ে প্রকাশ করা, অনন্য ও কাব্যময় ছবি তুলে ধরা এবং প্রাঞ্জল ও সহজ-সরল ভাষা ছিল তার সাহিত্য-ধারার অসাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য। অবশ্য সাফাভি যুগের আরও অনেক ইরানি কবি ও ভারতীয় স্টাইলের অনুসারী ইরানি কবিদের কবিতায়ও এসব বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।

কবি কলিম কাশানির সমসাময়িক যুগের লেখকরা এই মহান কবির নানা গুণ বা সাহিত্যের নানা দিকে তার অবদানের কথা কোনো না কোনোভাবে কখনও সংক্ষেপে বা কখনও দৃষ্টান্ত ও তুলনাসহ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন তাদের বইয়ে। এসব লেখকের মধ্যে রেজা কুলি খান হেদায়াত ও অজার বিগদেলির নানা উল্লেখ করা যায়।  কলিম তার নানা সুরুচিকে মিশিয়ে দিয়েছেন নানা ধারণা আর ভাবনায় এবং সেসবই সুন্দর কবিতা হয়ে বেরিয়েছে তার কলম থেকে। কলিমের কলম ছিল বিচিত্রময় সৃষ্টিশীল ভাবনার ঐশ্বর্যে প্রোজ্জ্বল। অনেক গদ্যময় বিষয়কেও তিনি দিতে পারতেন কাব্যিক চিত্রময়তা যা পাঠকদের করে বিমুগ্ধ, অভিভূত।

কবি কলিম কাশানির কবিতায় তার প্রখর মননশীলতা ও সৃষ্টিশীল চিত্রময়তা এবং সংক্ষিপ্ততা পাঠককে এতই মুগ্ধ করে যে তারা বার বার কলিমের কবিতা আবৃত্তি করতে বাধ্য হয়। তিনি কবিতায় কোনো একটি বিষয় নিয়ে অনেক ধরনের ছবি আঁকতে পারতেন। কলিমের প্রবল কল্পনা-শক্তিরই সাক্ষ্য বহন করে তার বহু-চিত্রময় কবিতাগুলো। তার গজলগুলো তাত্ত্বিক চিন্তা ও দার্শনিক ভাবনার দিক থেকেও বেশ সমৃদ্ধ। এসব গজল তুলে ধরেছে অনেক গভীর ভাবনা ও দার্শনিক নানা প্রশ্ন। 

তবে অনেক বড় কবির মত কলিমের কবিতারও রয়েছে কিছু দুর্বলতা। যেমন, তার কোনো কোনো কবিতায় রয়েছে স্ব-বিরোধী বা সাংঘর্ষিক নানা বক্তব্য ও চিত্র। এসব কবিতা তার হতাশ বা খেয়ালি মনের ছবিই তুলে ধরেছে। শামস লাঙ্কারুদির মত গবেষকের মতে কলিমের দিওয়ান বা কবিতা-সংকলনটি হতাশ-ভাবনা থেকে মুক্ত নয়। তার মতে সমসাময়িক অন্য অনেক কবির কবিতার তুলনায় কলিমের কবিতায় অনেক বেশি দুঃখ-বেদনা ও হতাশার প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। #