প্রখ্যাত কবি ওরফি শিরাজির জীবন, চিন্তাধারা ও অবদান
ওরফি শিরাজির পুরো নাম মুহাম্মাদ জামাল উদ্দিন সাইয়েদি ওরফি। খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতক তথা হিজরি দশম শতকের এই কবি দীর্ঘ জীবনের অধিকারী না হওয়া সত্ত্বেও ফার্সি সাহিত্যে অমূল্য অবদান রেখে গেছেন। ওরফির জন্ম হয়েছিল ৯৬৩ হিজরিতে ইরানের শিরাজ অঞ্চলে।
তার পিতা জাইনউদ্দিন আলী বালু ছিলেন শিরাজ শহরের পুলিশ কর্মকর্তা বা দারোগা। ওরফি শিরাজের খুই শহরে সাহিত্য, চিকিৎসা, যুক্তিবিদ্যা ও ইসলামী দর্শন বিষয়ে পড়াশুনা করেন এবং চিত্রাঙ্কন, ক্যালিগ্রাফি ও সঙ্গীতেও কিছুটা দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। তিনি নাসখ্ পদ্ধতিতে ক্যালিগ্রাফি বা সুলেখন শিল্পের কাজ করতেন।
সম্রাট শাহ আব্বাস সাফাভির শাসনামলে ইরানে কবিতা ও কাব্য-চর্চার এক বিশেষ ধারা ও পরিবেশ ছিল। এমনই এক বিশেষ ধারা ও পরিবেশে শিরাজের কবি-মহলে যৌবনেই স্থান করে নিতে সক্ষম হন উরফি। তিনি খুব দ্রুত খ্যাতি অর্জন করেন এবং স্থানীয় জনগণ তাকে ওরফি উপাধি দেন। ক্ষণ-জন্মা ও বিরল প্রতিভার অধিকারী এই কবির জীবনের নানা দিকের ওপর শিল্প ও সাহিত্য গভীর প্রভাব বিস্তার করে রেখেছিল।
ওরফির বয়স যখন মাত্র বিশ বছর তখন তার শহরে ছড়িয়ে পড়ে গুটি-বসন্ত রোগ। ওরফিও আক্রান্ত হন এই মহামারিতে। এই রোগের প্রভাবে ওরফির চেহারা হয়ে পড়ে লাবণ্যহীন ও কদাকার এবং এ সময় তার এলাকার সবাই তাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করত। অনেকেই মনে করেন ওরফির কবিতা এ কারণেই হয়ে ওঠে খুবই ক্ষুরধার এবং প্রতিবাদ আর বিদ্রূপের কষাঘাতে ভরপুর।

ওরফি শিরাজি ২৬ বছর বয়সে সাফাভি যুগের অন্য অনেক প্রতিভাবান সাহিত্যিক ও কবির মত ভারতে চলে যান। এ যুগে সাফাভি সম্রাটদের দরবার কবি ও সাহিত্যিকদের জন্য তেমন একটা আকর্ষণীয় স্থান ছিল না। অন্যদিকে ভারতের মোঘল সম্রাটদের দরবার ছিল ঠিক এর বিপরীত।
ওরফি শিরাজি ভারতে যাওয়ার পর মোঘল দরবারের তৎকালীন প্রধান কবি ফৈজির অনুরক্ত ও তার বন্ধু হয়ে পড়েন। ফৈজিও তাকে সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা করতে থাকেন উদার হস্তে। মূলত ফৈজির সহায়তায় রাজ-দরবারের কবি-মহল ও ভারতের ফার্সিভাষী কবিদের মধ্যে স্থান করে নেন ওরফি। কিন্তু কিছুকাল পরই ওরফি হয়ে পড়েন অহংকারী ও দাম্ভিক প্রকৃতির। ফলে বন্ধুরা ওরফির কাছ থেকে দূরে সরে পড়েন। জীবনের নানা প্রতিকূলতা ও বিশেষ করে গুটি-বসন্ত রোগের প্রভাবে চেহারা কদাকার হওয়ার প্রেক্ষাপটে ওরফির ভাষা হয়ে পড়ে তিক্ত ও তার মধ্যে জন্ম নেয় নিজেকে বড় ভাবার প্রবণতা। তিনি নিজেকে সে যুগের শ্রেষ্ঠ কবি বলে মনে করতেন। ওরফি এমনকি নিজেকে কবি আনওয়ারি, খ'কানি ও নিজামির চেয়েও বড় কবি বলে ভাবতেন। ফলে সে যুগের অন্য কবিরা ওরফির এ ধরনের মনোভাবে কষ্ট পেতেন।
বাদশাহ আকবরের দরবারের প্রধান কবি ফৈজির সহায়তায় তার দরবারে স্থান পেয়েছিলেন ওরফি শিরাজি। এরই সুবাদে অন্য কবিদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পাওয়ায় ওরফির কবিতার মান অনেক গুণ বেড়েছিল। এক পর্যায়ে তিনি কবিতায় অন্য অনেক কবির চেয়ে এগিয়ে যান। ফলে অনেকের হিংসার শিকার হয়েছিলেন ওরফি। তাদের হিংসার আগুন এতই বেড়ে যায় যে অবশেষে প্রতিদ্বন্দ্বী কবিরা বিষ-প্রয়োগ করে ওরফিকে পরকালে পাঠিয়ে দেন।
হিজরি ৯৯৯ সালে বিষ-প্রয়োগের ফলে সূচিত পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান ওরফি। তাকে দাফন করা হয় লাহোরে। মৃত্যুর ত্রিশ বছর পর তার লাশ উঠিয়ে এনে পবিত্র নাজাফ শহরে দাফন করা হয়।সাফাভি যুগে গজলের মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছিল নতুন ধারা ও নতুন প্রাণ। এ সময় কাব্যিক কল্পনার ময়দানও হয়েছিল প্রশস্ত। নিত্য-নতুন সুন্দর ভাবনা, নতুন স্টাইল ও বাক-ধারা এবং কল্পনা ও অর্থের সূক্ষ্মতা –এসবই গজলকে দেয় নতুন জীবন। গজলের এই ধারা ভারতীয় বা ইস্ফাহানি ধারা নামে খ্যাতি অর্জন করে। আর গজলের এই নতুন ধারার পথিকৃৎ ছিলেন ওরফি শিরাজিসহ ভারত ও ইরানে বসবাসকারী কয়েকজন ইরানি কবি।
ওরফি শিরাজির একটি কাব্য-সংকলন বা দিওয়ানের পঙক্তি সংখ্যা ছিল প্রায় ছয় হাজার। কিন্তু কাব্যটি সে যুগেই হারিয়ে যায়। ফলে ওরফি কয়েক বছর পর আরও একটি কাব্য-সংকলন রচনা করেন। তার মৃত্যুর পর এই কাব্যটি ছাপাখানা থেকে প্রকাশ করা হয়। কাসিদা ও গজলের কাব্য লেখা ছাড়াও ওরফি দু'টি দ্বিপদী ছন্দের বা মাসনাভি কাব্যও লিখেছেন। এ দুই কাব্যের একটি লিখেছিলেন শিরিন ও খসরু কাব্যের জবাবে। ওরফি তাতে নিজামির মাখজানুল আসরার বা রহস্যের খনি শীর্ষক কাব্যের ছন্দরীতি অনুসরণ করেন। ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ অ্যাডওয়ার্ড ব্রাউনের মতে ওরফি ছিলেন সার্বিক বিবেচনায় তার যুগের সবচেয়ে খ্যাতিমান ও জনপ্রিয় কবি এবং হিজরি দশম শতকের সেরা তিন কবির অন্যতম।
কাব্য ও কবিতার ক্ষেত্রে অভিনবতা ও নতুন স্টাইল ছিল ওরফির সাফল্যের প্রধান চাবিকাঠি। তাকে শব্দ-বিন্যাস ও ছন্দের জাদুকরও বলা যেতে পারে। #
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/১৬
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।