দাতাগঞ্জ বখশ (র)’র জীবন, চিন্তাধারা ও অবদান
আজ আমরা খ্রিস্টীয় একাদশ শতকের তথা হিজরি চতুর্থ ও পঞ্চম শতকের প্রখ্যাত ইরানি চিন্তাবিদ ও আরেফ বা সুফি সাধক আলী বিন ওসমান হুযুইরি তথা দাতাগঞ্জ বখশ (র)’র জীবন, চিন্তাধারা ও অবদান সম্পর্কে আলোচনা করব।
আলী বিন ওসমান হুযুইরি (র) ইরান ও ভারত উপমহাদেশের চিন্তাবিদ এবং সুফি বা আরেফ জগতের এক উজ্জ্বল তারকা। দাতাগঞ্জ বখশ নামে খ্যাত এই মহান ব্যক্তিত্ব সুফি বা আরেফ-প্রেমিক মুসলমানদের কাছে এক মহান আদর্শ ও জনপ্রিয় নাম। লাহোরে তাঁর পবিত্র মাজার লাখ লাখ অনুরাগী মানুষের জিয়ারত-কেন্দ্র।
দাতাগঞ্জ বখশের পুরো নাম আবুল হাসান আলী বিন ওসমান হুযুইরি। হিজরি চতুর্থ শতকের শেষের দিকে অথবা হিজরি পঞ্চম শতকের গোঁড়ার দিকে গজনভী শাসনামলে গজনীর হুজুইর নামক এলাকায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এ সময় গজনীর বাদশাহ ছিলেন সুলতান মাহমুদ। হুজুইরির সুনির্দিষ্ট জন্ম-তারিখ ও সন কোথাও পাওয়া যায়নি। নানা লক্ষণ বা আভাস-ইঙ্গিত থেকে মনে করা হয় তার জন্ম-সনটি ৩৮১ থেকে ৪০১ হিজরির কোনো এক বছর।
দাতাগঞ্জ বখশের বাবাও একজন সুফি দরবেশ ও আলেম ছিলেন বলে জানা যায়। সততা ও ধার্মিকতার জন্য গজনীতে তাঁর খ্যাতি ছিল। স্থানীয় জনগণ দাতাগঞ্জ বখশের উপস্থিতিকে তাদের অঞ্চলের জন্য সম্মানজনক ও বরকতময় বলে মনে করতেন।
দাতাগঞ্জ বখশের মাও ছিলেন ধার্মিক ও খোদাভীরু। দাতাগঞ্জের মামাকে তাজে আউলিয়া বা ওলিকুল শিরোমণি বলে অভিহিত করা হত এবং বহু অনুরাগী গজনীতে তার মাজার জিয়ারত করতেন।
কোনো কোনো গবেষক মনে করেন যে দাতাগঞ্জ (র) জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অবিবাহিত ছিলেন। আবার কেউ কেউ কাশফুল মাহজুব নামক গ্রন্থের কিছু বিচ্ছিন্ন বর্ণনার আলোকে মনে করেন যে দাতাগঞ্জ তার পরিবারের ইচ্ছা অনুযায়ী খুব কম বয়সে বিয়ে করেছিলেন এবং বিয়ের কিছুকাল পর তার স্ত্রী মারা যান। একই বইয়ের এক বর্ণনায় বলা হয়েছে স্ত্রীর মৃত্যুর ১১ বছর পর দাতাগঞ্জ (র) এমন এক নারীর প্রতি আকৃষ্ট হন যাকে তিনি কখনও দেখেননি এবং এক বছর পর্যন্ত তার অনুরাগের জালে বন্দি ছিলেন। অবশ্য এরপর তিনি মহান আল্লাহর ইচ্ছায় ওই নারীর আকর্ষণ ও স্মরণ থেকে নিজ অন্তরকে মুক্ত করতে সক্ষম হন।
দাতাগঞ্জ বখশ বেশিরভাগ প্রচলিত শাস্ত্রের জ্ঞান অর্জন করেছিলেন তৎকালীন কয়েকটি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে। তিনি কুরআন, হাদিস, ইসলামী আইন ও কালাম শাস্ত্র পড়েন গজনীতে। এরপর যৌবনেই গজনী থেকে বেরিয়ে পড়ে দীর্ঘ সফর শুরু করেন। তার এই দীর্ঘ সফরের কারণে জন্মভূমি গজনী পরিত্যাগ করতে হয়েছিল তাকে। অবশ্য এই সফরের পটভূমি সম্পর্কে নানা কথা শোনা যায়। যেমন, বলা হয় যে সুলতান মাসুদ নিহত হওয়ার ফলে গজনীর সৃষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতি হুযুইরি পরিবারের নিরাপত্তার জন্য অনুকূল বলে মনে করতেন না দাতাগঞ্জের পিতা। ফলে তিনি সপরিবারে গজনী ত্যাগ করেন। আবার কেউ কেউ বলেন, দাতাগঞ্জ যৌবনেই নানা জ্ঞানে খ্যাতি অর্জন করায় কোনো কোনা ব্যক্তির সঙ্গে মজহাবি বিতর্ক ও মতভেদের পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং এর ফলেই তার পরিবার গজনী ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়। আবার অনেকে বলেন, খোরাসান, মার্ভ, সারাখ্স, নিশাপুর, তুস, হেরাত ও আরও কয়েকটি বড় শহরের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোর খ্যাতির আকর্ষণ এবং এসব শহরের বিখ্যাত জ্ঞানী, সুফি ও চিন্তাবিদদের সঙ্গে সাক্ষাতের টানেই গজনী থেকে হিজরত করেছিলেন দাতাগঞ্জ।
দাতাগঞ্জ (র) আনুষ্ঠানিক সুফি ও খানকাহধারী ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন ভ্রাম্যমান সুফি। সফরের সুবাদে তিনি অনেক বড় বড় আলেম ও সুফির সাক্ষাৎ এবং সাহচর্য পেয়েছিলেন। কোনো কোনো বড় মুর্শিদ বা সুফি ওস্তাদের মুরিদ ও সঙ্গী হয়ে দাতাগঞ্জ বহু শহর ও দেশ সফর করেছিলেন এবং তিনি ওইসব মুর্শিদের মৃত্যুর সময় পর্যন্ত তাদের সঙ্গে ছিলেন।
গবেষক ডক্টর আবেদির মতে দাতাগঞ্জের সফর শুরু হয়েছিল ৪৪০ হিজরির পর থেকে। দাতাগঞ্জ ৪৪০ হিজরিরও আগে একবার নিশাপুর ও তুসে গিয়েছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক আবু সায়িদ আবুল খায়েরের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য। কিন্তু সে সময় তিনি তার সাক্ষাৎ পাননি।
দাতাগঞ্জ ইরাক ও ইরানের অনেক প্রধান বা কেন্দ্রীয় শহরগুলো সফর করেন। এরপর তিনি যান তুর্কিস্তানে। এ অঞ্চল সফরের পর দাতাগঞ্জ ফারগানার সবচেয়ে পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত শহরগুলোর কোনো একটি শহরে যান। উজকান্দ বা উযজেন নামের এ শহরটি বর্তমানে কিরঘিজিস্তানের অংশ। এ অঞ্চলে তিনি 'বাব ওমর বা বাবা আম্র' নামের এক প্রখ্যাত সুফি সাধকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দাতাগঞ্জ কিছুকাল তার সঙ্গে থাকেন।
এরপর ফারগানার শেইখের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দাতাগঞ্জ মার্ভে ফিরে আসেন। এখানে তিনি প্রখ্যাত সুফি সাধক আহমাদ নাজ্জার সমরখন্দির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি যুবক দাতাগঞ্জ তথা হুযুইরিকে নানা বিষয়ে উপদেশ দেন। দাতাগঞ্জের এসব সফরে কেটে যায় বহু বছর। এরপর দাতাগঞ্জ আসেন তুস ও নিশাপুরে। এখানে তিনি প্রখ্যাত সুফি সাধক আবুল কাসেম কুশাইরিসহ খ্যাতনামা আরেফ ও আলেমদের সঙ্গে সময় কাটান। দাতাগঞ্জ এখানে কুশাইরির মূল্যবান বই রেসালেহ কুশাইরিয়েহও অধ্যয়ন করেন। দাতাগঞ্জ তুস ও নিশাপুরে আসেন ৪৪০ হিজরির পর। ৪৪০ হিজরিতেই মারা যান এ অঞ্চলের প্রখ্যাত সুফি সাধক আবু সায়িদ আবুল খাইর। এ সময় এ অঞ্চলে এসেছিলেন শেইখ আবুল ফজল খাতলি নামক খ্যাতিমান সুফি সাধক। লেবাননের এই আরেফ আবু সায়িদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তার কবর জিয়ারতের সুযোগ পান মাত্র। দাতাগঞ্জ এই লেবাননি আলেমের সঙ্গে পরিচিত হয়ে জুনাইদিয়া তরিকার অনুসারী হন এবং তার সঙ্গী হয়ে সিরিয়ায় আসেন। এ অঞ্চলে থাকার সময় তিনি দেখেছেন ও শুনেছেন অনেক কিছু। আর এসবেরই কিছু অংশ তিনি তুলে ধরেন কাশফুল মাহজুব নামক বইয়ে। আবুল ফজল খাতলি সিরিয়ার দামেস্কে দাতাগঞ্জের কোলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
এরপর দাতাগঞ্জ তথা হুযুইরি আবারও ফিরে আসেন খোরাসানে। এখানে কিছুকাল বড় বড় সুফি সাধকদের সান্নিধ্যে থাকেন তিনি। অতীতের তুলনায় বেশ কিছু বেশি সময় এখানে তথা নিশাপুর ও তুসে থাকার পর দাতাগঞ্জ গজনী ও মার্ভ সফর করেন এবং পূর্ব ইরানের দিকে রওনা হন। তার সফরের শেষ মঞ্জিল ছিল লাহোর। ভারত ও খোরাসানের সীমান্তবর্তী এই শহরে তিনি তার কাশফুল মাহজুব বইটি লেখা শেষ করেন। দাতাগঞ্জ তার কোনো কোনো বই গজনীতে রেখে আসায় ভারতে কাশফুল মাহজুব বইটির সংকলন ও রচনা সম্পূর্ণ করার সময় ওই বইগুলো ব্যবহার করতে পারেননি।#
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/১৮
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।