প্রখ্যাত ইরানি চিন্তাবিদ ও আরেফ বা সুফি সাধক আলী বিন ওসমান হুযুইরি
ইরানি চিন্তাবিদ ও আরেফ বা সুফি সাধক আলী বিন ওসমান হুযুইরি তথা দাতাগঞ্জ বখশ (র)’র জীবনী সংক্রান্ত গত পর্বের আলোচনায় আমরা এ মহান সুফি সাধকের জন্ম-স্থান, পড়াশুনা ও নানা দেশে সফর সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছি। পাকিস্তানের লাহোরে তাঁর মাজার লাখ লাখ মানুষের জিয়ারত-কেন্দ্র।
আলী বিন ওসমান হুযুইরি তথা দাতাগঞ্জ বখশ (র)'র বই কাশফুল মাহজুব গ্রন্থের আলোকে জানা যায় তিনি লাহোরে অবস্থানের আগে ভারত ও পাকিস্তানের বহু শহর ঘুরেছেন এবং সেখানকার জ্ঞানী-গুণীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে হিন্দুদের ধর্ম-বিশ্বাস, প্রথা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে খুব গভীর জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হন। লাহোরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করার পর এ অঞ্চলের জনগণ তার অনুরাগী ও শিষ্য হতে থাকে। লাহোরের যে স্থানে বর্তমানে তার কবর রয়েছে ঠিক সেখানেই তিনি বসবাস করতেন।
দাতাগঞ্জ নামে খ্যাত আলী বিন ওসমান হুযুইরি ঠিক কবে লাহোরে প্রবেশ করেছিলেন তা স্পষ্ট নয়। পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা বিখ্যাত কবি ও দার্শনিক আল্লামা ইকবাল লাহোরি পাঞ্জাবে দাতাগঞ্জের প্রবেশ সম্পর্কে প্রশংসাসূচক এক কবিতায় লিখেছেন:
পাঞ্জাবের জমিন তাঁর নিঃশ্বাসে হয়েছে জীবন্ত/ আমাদের প্রভাত তাঁর অনুগ্রহে হয়েছে আলোকময় প্রাণবন্ত।
তিনি সংরক্ষক উম্মুল কিতাব তথা কুরআনের / তাঁর দৃষ্টি ধ্বসিয়ে দেয় ঘর মিথ্যাচারের।
তিনি ছিলেন দূত একাধারে প্রেমিক ও প্রেম-বৈমানিকের / তাঁর ললাট হতেই ফাঁস হয় রহস্য প্রেমের।
দাতাগঞ্জ বখশ লাহোরে জনকল্যাণমূলক অনেক কাজ করেছেন। হিন্দু ঐতিহাসিকরাও ইসলাম প্রচারে দাতাগঞ্জের অবদানের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন, হিন্দু ঐতিহাসিক কানহাইলাল 'লাহোরের ইতিহাস' নামক গ্রন্থে এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে দাতাগঞ্জের 'কার্যকর ভূমিকা' থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। গিনিশ দাস এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, সে যুগে ভারতের গুজরান সম্প্রদায়ের বেশিরভাগই দাতাগঞ্জের অনুরাগী হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। এই সম্প্রদায় লাহোরে বসবাস করত। 'চিশতিয়া তরিকা' শীর্ষক গবেষণামূলক বইয়ে মৌলভি নু আহমাদ চিশতী লিখেছেন, হুজুইরি ওরফে দাতাগঞ্জ যখন লাহোরে পৌঁছেন তখন লাহোরের শাসকের প্রধানমন্ত্রী তথা লাহোরের উপ-প্রশাসক রাজা রায় তার অনুসারী হন এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
দাতাগঞ্জ ঠিক কবে ইন্তেকাল করেছিলেন তা নিয়েও ব্যাপক মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন দাতাগঞ্জ হিজরি ৪৬৫ সন থেকে হিজরি ৪৬৯ সনের কোনো এক বছরে ইন্তেকাল করেন। তবে এটা স্পষ্ট যে তিনি গজনীর সুলতান জাহিরউদদৌলা ইব্রাহিম বিন মাসউদ বিন মাহমুদের শাসনামলে ইন্তেকাল করেছিলেন। দাতাগঞ্জ বখশের মাজারও নির্মাণ করেছিলেন সুলতান ইব্রাহিম।
দাতাগঞ্জ বখশের মাজার লাখ লাখ মানুষের জিয়ারতকেন্দ্র। যুগে যুগে বড় বড় আলেম, পীর ও দরবেশরা প্রাচীন এই মাজার জিয়ারত করেছেন। জিয়ারতকারীদের সংখ্যা ও আয়তনের দিক থেকে দাতাগঞ্জের মাজার পাকিস্তানের বৃহত্তম মাজার। ১৯৬০ সালে এই মাজারকে জাতীয়করণ করা হয় এবং তা পাকিস্তানের জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ। সেই থেকেই এই মাজার পরিচালনা করছে পাকিস্তানের ওয়াকফ ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। দাতাগঞ্জ বখশের মৃত্যু-বার্ষিকী উপলক্ষে পাকিস্তান সরকার ২০১৬ সালের ২১ নভেম্বরকে পাকিস্তানে সাধারণ ছুটি হিসেবে ঘোষণা করে।
দারাশিকোহ ইবরাতনামা নামক বইয়ে দাতাগঞ্জের মাজার প্রসঙ্গে লিখেছেন, প্রত্যেক শুক্রবার রাতে বিপুল সংখ্যক মানুষ দাতাগঞ্জের আলোকিত মাজার জিয়ারত করেন। কেউ যদি প্রত্যেক চল্লিশতম জুমার রাতে অথবা একাধারে চল্লিশ দিন দাতাগঞ্জের মাজারের চারদিকে প্রদক্ষিণ করেন তাহলে তার সমস্যার সমাধান হয় বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এ প্রসঙ্গে মুফতি আলাউদ্দিন বা আলিউদ্দিন লাহোরিও বলেছেন, প্রত্যেক জুমার রাতে অথবা জুমার দিন হাজার হাজার মানুষ দাতাগঞ্জের মাজারে নাজ্র বা নাজরানা দিয়ে এই মহান সুফি সাধককে ওয়াসিলা করে মহান আল্লাহর কাছে নানা ধরনের মনের বাসনা পূরণের আবেদন জানিয়ে থাকেন।
আলী বিন ওসমান হুযুইরি দাতাগঞ্জ (র) কাশফুল মাহজুব শীর্ষক বইসহ অন্তত দশটি বই লিখেছিলেন বলে জানা গেছে। তবে এসব বইয়ের কোনোটিরই অস্তিত্ব বর্তমানে নেই। তার কোনো কোনো বই চুরি হয়ে গেছে। এ ছাড়াও দাতাগঞ্জের কোনো কোনো বইকে নিজের বই বলে চালিয়ে দিয়েছেন একদল লেখক। এ ধরনের চুরি প্রতিরোধের জন্য দাতাগঞ্জ বখশ কাশফুল মাহজুব বইয়ের নানা অংশে নিজের নাম উল্লেখ করেছেন।
আলী বিন ওসমান হুযুইরি তথা দাতাগঞ্জ একটি কাব্যও রচনা করেছিলেন। কিন্তু অন্য কেউ কাব্যটি চুরি করে তা নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন বলে হুজুইরি কাশফুল মাহজুব বইয়ে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কাব্যটি কোন ভাষায় লিখেছিলেন তা উল্লেখ করেননি। তাই এটা স্পষ্ট নয় যে কাব্যটির ভাষা ফার্সি না আরবি ছিল। 'ফানা ও বাক্বা', আসরারুল খারক্ব ওয়া আলমুনাত কিংবা আসরারুল খারক্ব ওয়াল মালাওওয়ানাত দাতাগঞ্জের লেখা আরও দু'টি বইয়ের নাম। আধ্যাত্মি পথ-প্রদর্শকের পক্ষ থেকে বাহ্যিক ও আত্মিক খেরকা বা প্রতিনিধিত্ব প্রদানের আদব-কায়দা বা নিয়ম সম্পর্কে লেখা হয়েছিল এ দু'টি বই। মিনহাজউদ্দিন বা ধর্মের সিড়ি দাতাগঞ্জের আরেকটি বইয়ের নাম। তাসাওউফ বা সুফি-প্রবণতা ও আসহাবে সুফ্ফাহ নামক মহানবীর (সা) একদল সাহাবির মর্যাদা সম্পর্কে লেখা হয়েছিল এ বইয়ে। প্রখ্যাত সুফি মনসুর হাল্লাজের অবস্থার ব্যাখ্যাও দেয়া হয়েছে এ বইয়ে। কিতাবে ঈমান ও কালামে মানসুর দাতাগঞ্জের আরও দুটি বইয়ের নাম। হিজরি তৃতীয় শতকের প্রখ্যাত সুফি ও দরবেশ মনসুর হাল্লাজের কবিতার ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছিল কালামে মানসুর শীর্ষক বইটিতে। কিন্তু এ দুটি বইও বর্তমানে অস্তিত্বহীন।
দাতাগঞ্জ বখশ জীবনের শেষের দিকে পর্দাবৃতের পর্দা-উন্মোচন বা কাশফুল মাহজুব শীর্ষক বইটি লিখেছিলেন। লাহোরে অবস্থানের সময় এ বইয়ের একাংশ লিখেছিলেন তিনি। আবু সাইয়িদ নামের এক স্বদেশীর কিছু প্রশ্নের উত্তরে দাতাগঞ্জ এ বইটি লেখেন। ধর্মের নানা রহস্যময় ও গভীর বিষয়ের ওপর লেখা এ বইয়ে আরেফ ও আল্লাহর ওলিদের নানা শিক্ষা আর অবস্থার বর্ণনা রয়েছে। ইরফান ও সুফি-তাত্ত্বিক বিষয়ে এটাই ফার্সি ভাষায় লেখা প্রথম বই। ইরফান বিষয়ক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক এ বইটিকে ওলিদের কথামালার সমষ্টি মনে করাটা হবে ভুল।#
পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/২২
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।