জুলাই ২৮, ২০২০ ১২:৩৮ Asia/Dhaka
  • কাশফুল মাহজুব বইয়ের নানা দিক

গত দুই পর্বের ধারাবাহিকতায় আজও আমরা খ্রিস্টিয় একাদশ শতকের তথা হিজরি চতুর্থ ও পঞ্চম শতকের প্রখ্যাত ইরানি চিন্তাবিদ ও আরেফ বা সুফি সাধক আলী বিন ওসমান হুযুইরি তথা দাতাগঞ্জ বখশ (র)’র চিন্তাধারা ও অবদান সম্পর্কে আলোচনা করব।

আলী বিন ওসমান হুযুইরি দাতাগঞ্জ (র) কাশফুল মাহজুব শীর্ষক বইসহ অন্তত দশটি বই লিখেছিলেন বলে জানা গেছে। তবে এসব বইয়ের কোনোটিরই অস্তিত্ব বর্তমানে নেই। দাতাগঞ্জের কোনো কোনো বইকে নিজের বই বলে চালিয়ে দিয়েছেন একদল লেখক। এ ধরনের চুরি ঠেকাতে দাতাগঞ্জ বখশ কাশফুল মাহজুব বইয়ের নানা অংশে নিজের নাম উল্লেখ করেছেন। আজ আমরা তার কাশফুল মাহজুব তথা পর্দাবৃতের পর্দা উন্মোচন বা রহস্য ফাঁস শীর্ষক বইয়ের নানা দিক নিয়ে কথা বলব।

দাতাগঞ্জ বখশ জীবনের শেষের দিকে কাশফুল মাহজুব শীর্ষক বইটি লিখেছিলেন। ইরফান ও সুফি-তাত্ত্বিক বিষয়ে এটাই ফার্সি ভাষায় লেখা প্রথম বই। ইরফান বিষয়ক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক এ বইটিকে ওলিদের কথামালার সমষ্টি মনে করাটা হবে ভুল। সে যুগের তথা খ্রিস্টিয় একাদশ শতকের তথা হিজরি চতুর্থ ও পঞ্চম শতকের সামাজিক, ঐতিহাসিক ও ভৌগলিক বিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে এ বইয়ে। ফার্সি ভাষার অনেক মৌলিক ও প্রাচীন শব্দ ব্যবহারের কারণে ও প্রাচীন ফার্সি গদ্য-সাহিত্যের নিদর্শন হিসেবে বইটির ভাষাতাত্ত্বিক বিশেষ গুরুত্বও রয়েছে।

কাশফুল মাহজুব তথা 'পর্দাবৃতের পর্দা উন্মোচন' শীর্ষক বইটিতে দাতাগঞ্জের বক্তব্য প্রত্যক্ষভাবে থাকায় এ বইয়ের তথ্যগুলো অনেক বেশি প্রামাণ্য। বইটির উর্দু, ইংরেজি, আরবি, তুর্কি ও পাঞ্জাবি ভাষার অনুবাদ দেখা যায়। এ বইটির হাতে লেখা অনেক কপি এখনও টিকে আছে। মুহাম্মাদ তাসবিহি  কাশফুল মাহজুব তথা পর্দাবৃতের পর্দা উন্মোচন শীর্ষক বইটির হাতে লেখা প্রায় ৬০টি কপির বর্ণনা দিয়েছেন।

আধুনিক যুগে লাহোর, তেহরান, সমরকন্দ, তাশখন্দ ও মস্কো থেকে বইটির মুদ্রিত সংস্করণ প্রকাশ করা হয়েছে অনেকবার। আধুনিক যুগে প্রথম যিনি দাতাগঞ্জ বখশের কাশফুল মাহজুব বইটির সমালোচনামূলক সম্পাদনা করেছেন তিনি হলেন রুশ প্রাচ্যবিদ ভ্যালেন্তিন অ্যালেক্সিভিচ ঝুকোভস্কি। তিনি এই সম্পাদনার কাজ সম্পন্ন করেন ১৯১৪ সনে। তার মৃত্যুর পর তারই এক ছাত্র কিছু তালিকা, ব্যাখ্যা ও সম্পাদনা যুক্ত করে বইটি প্রকাশ করেন ১৯২৬ সালে। বইটি ইরানে বেশ কয়েকবার অফসেট পদ্ধতিতে ছাপানো হয়েছে।

সর্বসাম্প্রতিককালে দাতাগঞ্জ বখশের কাশফুল মাহজুব বইটির সমালোচনামূলক সম্পাদনা করেছেন ফার্সি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক ডক্টর মাহমুদ অ'বেদি।  তিনি বইটির অনেক শব্দের সঠিক রূপ তুলে ধরে ও অনেক জটিলতা দূর করে বইটিকে সহজবোধ্য করে তুলেছেন। দাতাগঞ্জ বখশের কাশফুল মাহজুব বইটিতে শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারেফাতসহ ধর্মের নানা রহস্যময় ও গভীর বিষয়ে মূল্যবান আলোচনা রয়েছে।

এ ছাড়াও এ বইয়ে আরেফ ও আল্লাহর ওলিদের নানা শিক্ষা আর অবস্থার বর্ণনা রয়েছে।  বইটি সাধারণ জনগণের জন্যও জ্ঞান ও শিক্ষার অনেক খোরাক যোগায়। সত্যকে বোঝার পথে যেসব বাধা বা পর্দা রয়েছে সেসব দূর করার আলোচনার কারণেই বইটির নাম কাশফুল মাহজুব তথা পর্দাবৃতের পর্দা উন্মোচন রেখেছেন বলে দাতাগঞ্জ বখশ (র) এ বইয়ের ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন। যুগে যুগে আরেফ ও সুফি মহলের বড় ব্যক্তিরা  দাতাগঞ্জের কাশফুল মাহজুব শীর্ষক বইয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ফরিদউদ্দিন আত্তারের মত বিখ্যাত সাধক ও সুফি তার তাজকিরাতুল আওলিয়া গ্রন্থে ওলিদের অবস্থা তুলে ধরার ক্ষেত্রে দাতাগঞ্জের এ বইয়ের উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন। তিনি তার এ বইয়ে দুইবার দাতাগঞ্জের নাম ও তার বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন।

এ ছাড়াও এ বইটি ইরফান বিষয়ক অনেক নির্ভরযোগ্য বইয়ের নানা আলোচনা ও বর্ণনার উৎস হিসেবে হয়েছে ব্যবহৃত। ফাসলুল খেতাব বইয়ের নানা স্থানে কাশফুল মাহজুব বইয়ের বক্তব্য ব্যবহার করেছেন খাজা মুহাম্মাদ প'রস'য়ি। তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে দাতাগঞ্জের নাম উল্লেখ করেছেন। আলী বিন ওসমান হুযুইরি দাতাগঞ্জ (র) কাশফুল মাহজুব শীর্ষক বইয়ের ভূমিকায় এ বই লিখতে গিয়ে সে সময়কার বইপুস্তক ও গজনিতে তার রেখে-আসা বইপুস্তক হাতে না থাকার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। অবশ্য তিনি কয়েকটি নির্ভরযোগ্য বইকে তথ্যের উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। এসব বইয়ের মধ্যে আবদুর রহমান সুল্লামির তারিখে আহলে সুফ্‌ফাহ বা আহলে সুফ্ফা'র ইতিহাস ও তাবাকাতুস সুফিয়া এবং আবু নাসর্‌ সেরাজের লুমআ ফি তাসাওউফ বইয়ের নাম উল্লেখ করা যায়। আলী বিন ওসমান হুযুইরির তথা দাতাগঞ্জের কাশফুল মাহজুব শীর্ষক বইটি ও আবুল কাসেম কুশাইরি রেসালাতুল কুশাইরিয়া বই দু'টি প্রায় একই সময়ে লেখা হয়েছিল বলে কেউ কেউ মনে করেন দাতাগঞ্জ শেষোক্ত বইটির আলোকেই তার এ বইটি লিখেছিলেন।

তবে তার বইয়ের সম্পাদকরা এ ধারণাকে সঠিক বলে রায় দেননি। এটা ঠিক যে দুজন লেখকই ছিলেন সমসাময়িক যুগের এবং দাতাগঞ্জ কুশাইরির সঙ্গে সাক্ষাৎও করেছিলেন। উর্দু ভাষায় দাতাগঞ্জের বইয়ের অনুবাদক পির মুহাম্মাদ হাসানের মতে দাতাগঞ্জ কুশাইরির বই ব্যবহার করলেও তিনি এমন সব বিষয়ে আলোচনা করেছেন যা কুশাইরির বইয়ে স্থান পায়নি।রুশ প্রাচ্যবিদ ভ্যালেন্তিন অ্যালেক্সিভিচ ঝুকোভস্কির মতে ইমাম কুশাইরি ও দাতাগঞ্জের বইয়ের বিষয়বস্তু এক হলেও বই দুটির কলেবর ও বৈশিষ্টের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। নানা বিষয়ে এ দুই লেখকের বক্তব্য, মতামত ও ব্যাখ্যায়ও রয়েছে পার্থক্য। তার মতে   ইরফান বিষয়ে এ দুটি বই প্রথম শ্রেণীর হলেও কোনো ক্ষেত্রেই অভিন্ন নয়। কেবল মাঝে মধ্যে কয়েকটি পরিভাষার মধ্যে কিছু মিল ছাড়া বই দুটির আলোচনার মধ্যে কোনো মিলই নেই। 

নিরপেক্ষ ভারতীয় গবেষক আবদুল মাজেদের মতে কুশাইরি ও দাতাগঞ্জের আলোচ্য বই দুটির মধ্যে স্টাইল ও রুচির পার্থক্য লক্ষ্যনীয়। কুশাইরি উদ্ধৃতি ও অতীতের কাহিনীগুলো বেশি ব্যবহার করেছেন। অন্যদিতে দাতাগঞ্জ একজন গবেষকের মতই নিজের ও অন্যদের নানা অভিজ্ঞতা এবং উদ্ভাবনকেও যুক্ত করেছেন তার বইয়ে। তিনি খোদাপ্রেম সংক্রান্ত কোনো কোনো বিতর্ক প্রত্যাখ্যান করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা বোধ করেননি। এ দিক থেকে তার কাশফুল মাজহুব বইটি কেবল বর্ণনামূলক বা উদ্ধৃতিবহুল বই নয় বরং একটি প্রামাণ্য ও গবেষণা-সমৃদ্ধ বইও বটে।#

পার্সটুডে/মু.আমির হুসাইন/ মো: আবু সাঈদ/২৮

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।